বিশ্বব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন: কীভাবে করতে হবে অভিযোজন? 

ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসান
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৪৭

বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একদিকে পুরোনো শক্তির প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা, অপরদিকে নতুন শক্তির উত্থান, এই টানাপড়েনের মধ্যে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের ভূ-রাজনৈতিক চাপ। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বরং অর্থনৈতিক অগ্রগতি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং বঙ্গোপসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বের কারণে দেশটি এখন বড় শক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্ন হলো— কীভাবে উন্নয়নের সুযোগ কাজে লাগিয়ে, সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে এবং কোনও একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষা করা যায়?

গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। একসময় যে দেশটি বহুলাংশে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেটি এখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তৈরি পোশাক রফতানি, প্রবাসী আয়, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অগ্রগতি কোনও দেশকে ভূ-রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত করে না। অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৌশলগত চাপও বাড়ে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির ক্রমবর্ধমান আগ্রহ তারই প্রতিফলন।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে আর একক কোনও শক্তির আধিপত্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিশ্ব ক্রমেই বহুমেরুকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার দিকে এগোচ্ছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল সবকিছুরই প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায় এসে মিলেছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কাছে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন শক্তির কাছে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

এই বাস্তবতায় অবকাঠামো বিনিয়োগ, বাণিজ্য চুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কিংবা উন্নয়ন অংশীদারত্বকে শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ কমে আসছে। এগুলোর সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ বা কৌশলগত সহযোগিতা গ্রহণের সময় বাংলাদেশকে শুধু তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুবিধা নয়, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো— জাতীয় উন্নয়ন অব্যাহত রেখে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছে। সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যোগাযোগ অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে এই সহযোগিতা শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার ফলে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থান, অভিন্ন সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

এই বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য কার্যকর পথ হতে পারে বাস্তববাদী কূটনীতি, যেখানে অর্থনৈতিক সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু কোনও একটি শক্তির রাজনৈতিক বলয়ে অতিরিক্তভাবে আবদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে চলা হবে।

তবে সমস্যা হলো, বর্তমান বিশ্বে নিরপেক্ষ থাকা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠছে। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক শাসন, সমুদ্র নিরাপত্তা কিংবা আন্তর্জাতিক সংঘাতসহ বিভিন্ন ইস্যুতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছ থেকে স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিকে গুরুত্ব দিয়েছে। এই নীতি দেশটিকে কূটনৈতিক নমনীয়তা দিয়েছে। কিন্তু যখন বাণিজ্য সুবিধা, উন্নয়ন সহায়তা বা কৌশলগত অংশীদারত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রত্যাশা যুক্ত হয়, তখন সেই নমনীয়তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। মূল্যস্ফীতি, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, জ্বালানি আমদানির ব্যয়, মহামারি-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও রফতানি বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীলতায় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখাও জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তোলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ও সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে বৈশ্বিক দরকষাকষিতেও উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যকার ক্ষমতার বৈষম্য দৃশ্যমান। ফলে অর্থনীতি, কূটনীতি এবং জলবায়ু নিরাপত্তা তিনটি বিষয়ই এখন অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তবে এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে শুধু চাপের মুখে থাকা একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

একুশ শতকের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলো আর নিছক দর্শক নয়। সঠিক কৌশল গ্রহণ করতে পারলে তারাও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারে। বাংলাদেশের লক্ষ্য তাই শুধু ভূ-রাজনৈতিক চাপ সামলানো নয়, বরং সেই প্রতিযোগিতা থেকে উন্নয়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা।

এক্ষেত্রে প্রাথমিক ভাবে প্রয়োজন স্মার্ট ও নমনীয় কূটনীতি। বাংলাদেশকে আরও সক্রিয়, বাস্তববাদী ও নমনীয় কূটনৈতিক কৌশল অনুসরণ করতে হবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কোনও একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগের সুবিধা নেওয়া সম্ভব হবে, অপরদিকে পশ্চিমা বাজারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং ভারতসহ প্রতিবেশী ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতাও শক্তিশালী করা যাবে। অংশীদারত্বের বৈচিত্র্য বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কোনও একটি দেশ, অঞ্চল বা অর্থায়নের উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনই বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষার সুযোগ তৈরি করে।

সেইসঙ্গে একমুখী রফতানি নির্ভরতা কমাতে হবে। বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও কাঠামোগত রূপান্তরের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের রফতানি এখনও তৈরি পোশাক খাতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সীমিত রফতানি পণ্য ও কয়েকটি প্রধান বাজারের ওপর নির্ভরতা বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামা এবং বড় বাণিজ্য অংশীদারদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপের মুখে দেশকে দুর্বল করে দিতে পারে।

তাই তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, জাহাজ নির্মাণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অন্যান্য উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাত সম্প্রসারণ করতে হবে। দেশীয় শিল্প, গবেষণা ও উদ্ভাবন শক্তিশালী হলে বৈদেশিক নির্ভরতা কমবে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে তুলনামূলক শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনা করা সম্ভব হবে। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা মানে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়—বরং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হওয়া, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকে।

পাশাপাশি আঞ্চলিক সংযোগকে সুযোগে পরিণত করতে হবে। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া এখনও বিশ্বের সবচেয়ে কম অর্থনৈতিকভাবে সংযুক্ত অঞ্চলগুলোর একটি। অথচ বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

বিমসটেকসহ আঞ্চলিক উদ্যোগ এবং উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় বাংলাদেশ আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। সড়ক, রেল, বন্দর, জ্বালানি নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল সংযোগ উন্নত করা গেলে বাংলাদেশ শুধু একটি বাজার নয়, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। এতে দূরবর্তী বাজারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে এবং প্রতিবেশী অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক শক্তিশালী হবে।

সেইসঙ্গে এটা মনে রাখতে হবে যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাই রাষ্ট্রের শক্তি। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন ও স্বচ্ছতা এখন শুধু অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের বিষয় নয়—এগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের সক্ষমতারও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে আইনের শাসন, জবাবদিহি, নীতির ধারাবাহিকতা এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দুর্বল প্রতিষ্ঠান শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করে না—আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতেও রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। বিপরীতে, দক্ষ ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়, দুর্নীতির সুযোগ কমায় এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে তাই জাতীয় শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখতে হবে।

সর্বোপরি, মানুষের দক্ষতায় বিনিয়োগ জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তার জনসম্পদ। তরুণ জনগোষ্ঠী বড় সম্পদ, কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে না পারলে এই জনমিতিক সুবিধাই একসময় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। উচ্চশিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হলে কম মজুরিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে প্রযুক্তি, গবেষণা এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে প্রবেশ করা সহজ হবে। ফলে মানবসম্পদ উন্নয়নকে শুধু সামাজিক নীতি নয়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জনের কৌশল হিসেবেও দেখতে হবে।

একইসঙ্গে বহুপক্ষীয় কূটনীতি ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ অবস্থান বিশ্ববাণিজ্য, জলবায়ু অর্থায়ন এবং উন্নয়ন অর্থায়নের আলোচনায় বাংলাদেশের দরকষাকষির শক্তি বাড়াতে পারে। বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব এবং অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দাবিতেও বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। এখানে কৌশলগত নিরপেক্ষতাকে নিষ্ক্রিয়তা হিসেবে দেখলে চলবে না। নিরপেক্ষতার অর্থ বৈশ্বিক ঘটনা থেকে দূরে থাকা নয়। বরং বাণিজ্য, নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়ন প্রশ্নে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা, অথচ বৃহৎ শক্তিগুলোর সংঘাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জড়িয়ে না পড়াই হতে পারে কার্যকর কৌশল।

পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা বাংলাদেশের সামনে তাই একই সঙ্গে ঝুঁকি ও সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং জলবায়ু ঝুঁকি বাস্তব। কিন্তু এগুলো অনতিক্রম্য নয়। বিচক্ষণ কূটনীতি, রফতানি ও অর্থনীতির বৈচিত্র্য, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং মানবসম্পদে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই চাপকে সুযোগে রূপান্তর করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু বাংলাদেশ কোন শক্তির কতটা কাছে থাকবে, সেটি নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কতটা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করতে পারবে। বড় শক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশ বন্ধ করতে পারবে না, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজের অবস্থান কী হবে, তা অনেকটাই বাংলাদেশ নিজেই নির্ধারণ করতে পারে।

পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ধরে রেখে এগিয়ে যেতে পারলে বাংলাদেশ কেবল চাপের মুখে থাকা একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে না, বরং আত্মবিশ্বাসী ও প্রভাবশালী একটি মধ্যম আয়ের রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারবে।

লেখক: জনপ্রশাসন ও জননীতি বিশ্লেষক

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যায় ছাড় নয়, প্রয়োজনে লংমার্চ: আখতার হোসেন
পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যায় ছাড় নয়, প্রয়োজনে লংমার্চ: আখতার হোসেন
নিউ গিনি প্রোপার্টিজে ভাঙচুর-হামলা: গ্রেফতার ১৪
নিউ গিনি প্রোপার্টিজে ভাঙচুর-হামলা: গ্রেফতার ১৪
সেতু ভব‌নে কক‌টেল বি‌স্ফোরণ
সেতু ভব‌নে কক‌টেল বি‌স্ফোরণ
মূল্যস্ফীতির চাপে কেনাকাটায় কাটছাঁট, চাপে খুচরা ব্যবসা
মূল্যস্ফীতির চাপে কেনাকাটায় কাটছাঁট, চাপে খুচরা ব্যবসা
সর্বশেষ সর্বাধিক