সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধনী বিল: কেন বিরোধী দলের আপত্তি

ঘটনাটি অপরিচিত কারও নয়, আমাদের পরিবারের এক বোন তাঁর বাড়ি ও জমি মেয়েকে হেবা করে লিখে দিয়েছিলেন। কারণ বৃদ্ধ বয়সে উনি মেয়ে-জামাইয়ের কাছে থাকতেন। হেবার বিধান অনুযায়ী, জীবিত অবস্থায় দাতা তাঁর সম্পত্তি সন্তানকে দিতে পারেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে তিনি দেখলেন, মেয়ে জামাইয়ের চেহারা পাল্টে গেছে। তারা মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করেছে।

এই অবস্থায় বোনটি হেবার ঘোষণা বাতিল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আইনগতভাবে তা তিনি পারেননি। তাই বাধ্য হয়ে পরবর্তীকালে এর-ওর বাড়িতে থেকে একপ্রকার উদ্বাস্তু জীবন যাপন করেছেন।

এটাতো শুধু একটা ঘটনা। এরকম আরও বহু ঘটনা ঘটছে সমাজের সবস্তরে। ঢাকার বিচারিক আদালতগুলোতে এই ধরনের অনেক মামলাও দেখা যায়। প্রচলিত আইনের অধীনে বাবা-মা তাঁদের জীবদ্দশায় উত্তরাধিকারদের মধ্যে কোনও কারণে সম্পত্তি লিখে দিলে, সেটি সাথে সাথেই হস্তান্তর হয়ে যায়।

এতে প্রায়ই দেখা যায়, তাঁরা নিজেরাই অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছেন। কেননা, দানকৃত এই সম্পত্তি আর ফেরত নেয়া যায় না, যেমনটি ঘটেছে আমাদের সেই বোনের ক্ষেত্রে। অনেক মা-বাবা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর অবহেলা ও নির্যাতিত হন। কাউকে কাউকে বাড়ি থেকেও বের করে দেওয়া হয়। বিশেষ করে যেসব পরিবারে পুত্র সন্তান নেই, শুধু কন্যা সন্তান, তাঁরা সবসময় সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে এক ধরনের দোটানায় থাকেন।

একদিকে জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দান করার পর অবহেলার শিকার হওয়ার ভয়, অন্যদিকে সম্পত্তি হেবা করে দিয়ে না গেলে কন্যা সন্তানের বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা এইবার যে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল,২০২৬  সংসদে পাস হয়েছে, তাতে এমন বিধান রেখে সংশোধনী আনা হয়েছে, যেন বাবা-মা বা দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত দানকৃত সম্পত্তি ভোগ করতে পারেন। আইনমন্ত্রী বিল উত্থাপন করে সংশোধনীর উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে যে বিবৃতি দিয়েছেন, যা খুব ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২, তে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিধান থাকলেও, আমৃত্যু দাতার সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দান করার বিষয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট বিধান ছিল না।

আইনজীবিরা মনে করেন, এই সংশোধনীর ফলে এখন একজন দাতা তার মৃত্যুর আগে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। একইসঙ্গে তিনি বুঝতে পারবেন— মৃত্যুর পরে তার অর্জিত সম্পত্তি যথাযথ ব্যক্তির হাতেই থাকছে। সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে এই আইনে যে সংশোধনী এসেছে, সেটি বাংলাদেশের সব ধর্মের সব নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য। বহু বছর ধরে মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনগুলো বলে আসছে— সব ধর্মের মানুষের জন্য দেশে একটি ‘ইউনিফর্ম ফ্যামিলি আইন’ হওয়া দরকার।

বিভিন্ন ধর্মের নাগরিকদের জন্য এমন সুযোগ থাকবে, যে কেউ চাইলে তার জীবদ্দশায় লিখিত ইচ্ছাপ্রকাশের মাধ্যমে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নিজ নিজ ধর্মীয় নীতি বেছে নিতে পারেন।

বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এই সংশোধনীকে কোরআন- সুন্নাহবিরোধী এবং মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রতিবাদ করেছেন। অথচ সংশোধনীতে মুসলিম আইনের অধীন প্রচলিত ‘হেবা’ বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়নি। আইনজীবীরা বলছেন, ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনটি বাতিল করে নয়, বরং আগের আইনেই একটি বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন ধর্মের পারসোনাল আইনে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। তাহলে কেন সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী নিয়ে বিরোধী দলের এই আপত্তি?

বিরোধী দল মনে করছে, এটা কোরআনে বর্ণিত অছিয়ত যেটাকে উইল বলা হয়েছে, তার পরিপন্থী। কিন্তু বাস্তবে উইল এবং হেবার বিধান বহাল আছে, যে কেউ ইচ্ছা করলে সেই বিধান প্রতিপালন করতে পারবেন। আর এটা হলো একটা সর্বজনীন বিকল্প হস্তান্তর পদ্ধতি মাত্র, যার মাধ্যমে জীবন স্বত্বে ভোগাধিকার রেখে নিকটজনকে সম্পত্তি দান করা যাবে। (বিবিসি বাংলা, অ্যাডভোকেট খাদেমুল ইসলাম) কোনও মুসলিম দাতা চাইলে হেবার প্রচলিত নিয়মে সম্পত্তি দান করতে পারবেন। সম্পত্তি দান করার সময় নিজের জীবনকালীন ভোগের অধিকারও রেখে দিতে পারবেন। অর্থাৎ নতুন বিধানটি কাউকে ধর্মীয় পদ্ধতি বাদ দিতে বাধ্য করছে না।

একইসঙ্গে, এই সংশোধনী বর্তমানে বলবৎ অন্য কোনও আইনের অধীনে স্বীকৃত কোনও দান, হেবা বা অন্য কোনও হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতাকে কোনোভাবে প্রভাবিত বা ক্ষুণ্ন করবে না। ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত কোন্র বিষয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম যুক্ত করাও নতুন ঘটনা নয়। যেমন মুসলিম বিয়ের ধর্মীয় বৈধতার জন্য নিবন্ধন আবশ্যক নয়।

কিন্তু নাগরিক অধিকার রক্ষা, বিয়ের প্রমাণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্র বিয়ে নিবন্ধনের বিধান করেছে। এ কারণে নতুন একটি দেওয়ানি পদ্ধতি চালু করাকে সরাসরি ধর্মবিরোধী বলা যুক্তি সঙ্গত নয়। (প্রথম আলো) ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া ১৯৩৭ সালের মুসলিম পারসোনাল আইন (শরিয়া আইন) পাকিস্তান আমলে, সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে পরিবর্তন করা হয়েছে। যেমন দাদা বা নানার সস্পত্তিতে, নাবালক সন্তানের সম্পত্তি পাওয়ার অধিকার কার্যকর হয়েছে।

এখন চাইলেই কোনও মুসলিম পুরুষ একসাথে চারটি বিয়ে করতে পারেন না। তাকে নিয়মের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। হিলা বিয়েও অনেক কঠিন করা হয়েছে এবং সর্বোপরি মুসলিম নারী তার স্বামীকে কারণ উল্লেখ করে এবং চারবছর নিরুদ্দেশ থাকলে তালাক দিতে পারেন। কাজেই নতুন এই সংশোধনীর সামাজিক প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বিশ্বের কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মুসলিম নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়গুলো যেমন- বিয়ে, তালাক, সন্তান লালন-পালন ও উত্তরাধিকার ইসলামি শরিয়াহ আইন অনুযায়ী না করে, সম্পূর্ণরূপে ধর্মনিরপেক্ষ বা দেওয়ানি সিভিল আইন দ্বারা পরিচালনা করা হয়।

যেমন- তুরস্কে ‘তুর্কি সিভিল কোড’ গ্রহণ করা হয়।

উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তিউনিসিয়া নারী অধিকার ও পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রগতিশীল এবং ধর্মনিরপেক্ষ দেওয়ানি কাঠামো অনুসরণ করে। এমনকি উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রেও সিভিল কোডের মাধ্যমে সংস্কার আনা হয়েছে।

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগাল, এবং মধ্য এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর আইনি ব্যবস্থা ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক আইন সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ সিভিল ল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যেমন- কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও আজারবাইজান।

মুসলিম নাগরিকরা চাইলে কেবল ব্যক্তিগত বা আধ্যাত্মিক সন্তুষ্টির জন্য ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে (নিকাহ) করতে পারেন, তবে আইনি সুরক্ষার জন্য সিভিল ম্যারেজ করা বাধ্যতামূলক। মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনগুলো উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলে আসছে বহু বছর ধরে। মুসলিম পরিবারে যে বাবা- মায়ের শুধু কন্যা সন্তান রয়েছেন, তারা জানেন নিজের আত্মজাকে সম্পত্তি দিয়ে যেতে কতটা ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

বাবা-মায়ের জন্য বিপজ্জনক হলেও, জীবদ্দশায় হেবা করে দিয়ে যেতে হয় বা উইল করে দিতে বাধ্য হন। নয়তো কন্যা সন্তান কখনোই বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তির শতভাগের মালিক হতে পারবে না।

এই সমস্যার কথা ভেবেই ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিউল হক ফয়সাল বলেছেন, ‘‘বর্তমান উত্তরাধিকার আইনে, শরিয়াহ ল অনুসরণ করা হয়, যাদের শুধুমাত্র কন্যা সন্তান ছিল— তারা পুরো সম্পত্তির মালিক হতে পারতেন না। এখন এই সংশোধনীর ফলে পুরো সম্পত্তির মালিক হতে পারবেন তারা।’’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী গণমাধ্যমকে বলেছেন, সরকার ব্রিটিশদের করা আইনে একটি সংশোধনী এনেছে। অন্য কোনও আইনে, ইসলামি হেবায় হস্তক্ষেপ করেনি।

প্রবীর নিয়োগী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, হিন্দু আইনানুযায়ী, মেয়েরা জীবনসত্ত্বে সম্পত্তি শুধু ভোগ দখলের অধিকার ছাড়া কিছুই পান না। তাই এখন ডিড করে হিন্দু ধর্মের পারসোনাল ল অনুযায়ী আমাদের দিতে হয়। এই আইনের কারণে এখন যাদের শুধুমাত্র কন্যা সন্তান, তাদের ওই সন্তানকে সম্পত্তি দানের অধিকার এবং সারা জীবনের কষ্টার্জিত সম্পদ দান করলেও জীবদ্দশায় ভোগ করার অধিকার রক্ষা হয়েছে।

এদেশের নারী সমাজ সবসময় চেয়ে আসছে— আইনের নাম ব্যবহার করে নারীকে কেউ স্বামী ও পিতার সম্পত্তি থেকে যেন বঞ্চিত করতে না পারে। সরকার বলে দুই সন্তানই যথেষ্ট। সেখানে কারও যদি দুটিই বা একটি কন্যা সন্তান হয়, তখন সেই পরিবার কী করবেন? কাজেই সবকিছুই বাস্তবতার নিরিখে ভাবতে হবে।

কোনও আইন পরিবর্তন না করে, শুধু দুটি সংশোধনী এনে যদি ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন আসে, তাহলে সেটাই অনেক। তবে আইনের উদ্দেশ্য ভালো হলেই তা সুষ্ঠুভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। তাই সংশোধনীর দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে একটা সুষ্ঠু পথ খুঁজে বের করতে হবে।

ধন্যবাদ বর্তমান আইনমন্ত্রীকে যুগোপযোগী এই সংশোধনী আনার জন্য।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট