ছোট্ট শীলার জীবনটা মুহূর্তের মধ্যে শূন্য হয়ে গিয়েছিল, যখন সে দেখলো— মা তাকে আর তার বাবাকে ফেলে চলে গেল। যাওয়ার সময় বলে গেল, শীলার সব খরচ সে বহন করবে। সেই আশ্বাসের পরেও মেয়েটা কষ্টে নীল হয়ে গেল। তার ছোট মনটা ভয়ে, আশঙ্কায়, নিরাপত্তাহীনতায় কুঁকড়ে উঠেছিল। সে বুঝলো, মা অন্য একজন মানুষের কাছে চলে গেল, যে তার বাবা নয়।
দশ বছরের মেয়েটি বাবাকে আকঁড়ে ধরে মায়ের চলে যাওয়ার কষ্ট ভোলার চেষ্টা করেছিল। মা চলে যাওয়ার পর বাবা ছিল তার একমাত্র ভরসা। এভাবেই শিশুটি হয়তো বড় হয়ে উঠতো, যদি না এর মাত্র দুবছর পরে ওর বাবা বিয়ে করে নতুন সংসার সাজাতো। শীলাকে অবশ্য ওর বাবা সঙ্গেই রেখেছিল। সেই নতুন মায়ের আরও একটি সন্তান রয়েছে ওর মতোই। শীলার বয়স যত বাড়তে লাগলো, ওর ততই মনে হতে থাকলো ও একা, বিছিন্ন, নিরাপত্তা এবং ভালোবাসাহীন। ওর নিজের কোনও বাসা নেই, বাবা-মা কেউ ওর একার নয়। তাদের ভালোবাসা, সময় কাটানো সব টুকরো টুকরো হয়ে ভাগ হয়ে গেছে।
শীলার পড়তে ভালো লাগতো না, খেলতে ইচ্ছা করতো না, এমনকী বন্ধুদের কাছেও যেতে ইচ্ছা করতো না। বন্ধুদের বাবা-মাকে দেখলে ওর কান্না আসতো। নিজেকে আরও বঞ্চিত মনে হতো। একা একা ঘরের কোণে কান্না ছাড়া ওর আর কিছু করার ছিলনা।
একটা বয়সে ও মাদক নিতে শুরু করে। বাবা-মা অস্থির হয়ে ওকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। কিন্তু একদিন সব ছেড়ে শীলা চলে যায়, ও আত্মহত্যা করে। ঘটনাটি কয়েকবছর আগের হলেও ভোলা যায় না। যখন কোনও ভেঙে যাওয়া পরিবারের শিশু দেখি, চোখের সামনে শীলার মুখখানি ভেসে ওঠে। এরকমন অসংখ্য শিশু আছে আমাদের চারপাশে।
শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিচ্ছেদ একটি শিশুর শারীরিক ক্ষতি না করলেও, তার নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসের জায়গায় গভীর প্রভাব ফেলে। একটি নিরাপদ পরিবারের কাঠামো যখন ভেঙে যায়, তখন শিশুরা অপরাধবোধ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা এবং মনোযোগের অভাবে ভোগে।
শিশুরা সাধারণত এসব অনুভূতি প্রকাশ করে না, মনের মধ্যেই চাপ চেপে রাখে। এর ফলে তাদের আচরণে পরিবর্তন আসে। দশ বছরের সুমনের বাবা চলে গেলেও মা ছিল মাথার ওপর। মা বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল সুমনকে। কিন্তু এরপরও পরিবারের ভাঙন শিশুটিকে অস্থির করে তুলেছিল। ও অসম্ভব ইমোশনাল হয়ে উঠেছিল, বাবাকে ঘৃণা করতো, ভয় পেতো। আর এই অতিরিক্ত আবেগ থেকে সুমনের জীবন লক্ষ্যহীন হয়ে উঠছিল।
মাদকের হাত থেকে সুমনের মা যুদ্ধ করে ওকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। পাশে মা ছিল বলে সুমন ফিরে আসতে পেরেছে, কিন্তু শীলার পাশে কেউ ছিল না বলে শীলা হারিয়ে গিয়েছিল।
অসংখ্য শিশু শুধু এই পারিবারিক অশান্তির কারণে পথ হারিয়ে ফেলে। যারা শিশুদের মনোজগত নিয়ে কাজ করেন, তারা জানেন, এসব শিশুর বেড়ে ওঠা কতটা চ্যালেঞ্জিং। চারপাশে তাকিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, বাবা-মায়ের ভাঙন শিশুকে কীভাবে ভেঙে টুকরা টুকরা করে দেয়।
ভেঙে যাওয়া পরিবারের শিশুদের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় দ্বিগুণ— ২০২৬ সালে প্রকাশিত কার্টিন ইউনিভার্সিটির একটি বৈশ্বিক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, মৃত্যু বা আইনি জটিলতার কারণে আলাদা থাকা পরিবারের ২১.৪ শতাংশ শিশু বিষণ্নতা, উদ্বেগ, এবং এডিএইচডি-এর মতো মানসিক সমস্যায় ভুগছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য অনুসারে, ভাঙা পরিবারের শিশুদের তীব্র মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু ক্লিনিক্যাল বিষণ্নতার শিকার হয়। বাংলাদেশেও এ সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিবাহবিচ্ছেদ বা মা-বাবার দূরত্বের কারণে সবচেয়ে বেশি মানসিক ও সামাজিক ঝুঁকিতে পড়ছে সেই পরিবারের শিশুরা।
খুলনা শহরের জরিপে অংশ নেওয়া ‘ভেঙে যাওয়া পরিবারের’ শিশুদের মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ শিশু তীব্র মানসিক হতাশা ও একাকীত্বে ভুগছে। মানসিক চাপের পাশাপাশি প্রায় ৭৭ শতাংশ শিশু নিয়মিত কোনও না কোনও শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা দেখিয়েছে, ঢাকার এসব পরিবারের শিশুরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, যার ফলে অনেকের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ, অবাধ্যতা এবং আগ্রাসী আচরণ দেখা যায়। এই শিশুরা প্রতিবেশী বা বিদ্যালয়ের সমবয়সীদের কাছ থেকে অনেক সময় নেতিবাচক আচরণের শিকার হয়, যা তাদের হীনম্মন্যতা বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন বলছে, বিয়ে বিচ্ছেদের ক্রমবর্ধমান হার বাড়ছে। আর এই বিচ্ছেদের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে এক বা একাধিক মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত শিশু। বিচ্ছেদের ফলে শিশুরা প্রত্যক্ষ কোনও শারীরিক আঘাত না পেলেও, তাদের নিরাপত্তাবোধ এবং আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সমাজবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া শিশুদের একটি বড় অংশের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড ব্রোকেন ফ্যামিলি। মা-বাবার সঠিক তদারকি ও পারিবারিক স্নেহের অভাবে এই শিশুরা সহজেই বিপথগামী হচ্ছে (ঢাকা ট্রিবিউন)।
নবম শ্রেণির ছাত্র অনীকেরও খুব ইচ্ছে করতো বন্ধুদের সাথে বাবা-মায়ের গল্প করতে। কিন্তু ওদের মতো তার তো কোনও গল্প নেই, আনন্দময় কোনও স্মৃতি নেই। অথচ অনীকের চাওয়া ছিল খুব সাধারণ একটা জীবন। সে-ও বাবা-মায়ের মাঝখানে থেকে সুখী হতে চেয়েছিল। ছোটবেলায় সমবয়সী ছেলেমেয়েরা ওকে খেলায় নিতো না। ওদের বাবা-মায়ের কঠোর নিষেধ উপেক্ষা করে, বাবা-ছাড়া ছেলের সঙ্গে মেশার সাহস হতো না বন্ধুদের। ওইসব পরিবারের ধারণা দুদিন পরেই এই ছেলে গোল্লায় যাবে।
এই সমাজে ব্রোকেন ফ্যামিলির বাচ্চাদের প্রতি মানুষের মনোভাব মোটামুটি এইরকমই। অনেকেই মনে করেন, বিচ্ছিন্ন পরিবারের বাচ্চাদের কাছ থেকে ইতিবাচক কিছু প্রত্যাশা করা যায় না। অথচ এমন পরিবারের অনেক ছেলেমেয়ে প্রতিকূলতা পার হয়ে নিজ যোগ্যতায় ভালো অবস্থানে আছে।
পরিবার বিচ্ছিন্ন শিশুদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই ‘পরিবার’ নামক আস্থা আর ভালোবাসার জায়গাটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তার ওপর সমাজ, প্রতিবেশি যখন তাদের প্রতি বিরূপ আচরণ করে, তখন শিশুটি বাঁচে কীভাবে। সমাজ একটু সংবেদনশীল হলেই এই মানসিক চাপ থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া যায়।
অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দীন আহমদ বলেন, ‘‘বিচ্ছেদ কেবল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হয়, সন্তানের ক্ষেত্রে নয়।’’ তাই শিশুদের এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি থেকে বাঁচাতে মা-বাবা আলাদা হলেও সন্তানের মানসিক ও শারীরিক সুরক্ষায় দুজনকেই সমানভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা দরকার। কারণ এই অবস্থায় থাকা শিশুরা যখন চুপ হয়ে যায়, তখন বাবা-মা, শিক্ষক এবং থেরাপিস্ট কেউ কোনও সাহায্য করতে পারেন না। এই ছেলেমেয়েগুলো মানসিকভাবে এতটাই ভাঙচুরের ভেতর দিয়ে যেতে থাকে যে, তারা নিজেদের একটা খোলসের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলে।
নানা কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ এখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে বিয়ের পর যখন স্বামী স্ত্রীর বনিবনা হয় না, তখন পরিবারের মুরব্বিরা পরামর্শ দেন— যেন দম্পতি বাচ্চা নেয়, কারণ বাচ্চা হলে সম্পর্কটা টিকে যাবে। এর চাইতে ভুল পরামর্শ আর হয় না। বরং এই ঝামেলা বছর গড়ানোর মাধ্যমে বাড়তে থাকে, আর সেই শিশু ভাঙা সংসারের মধ্যে পড়ে নিজেও ভেঙে যেতে থাকে।
এ ধরনের শিশুরা খুব স্পর্শকাতর হয় বলে মায়া, সহানুভূতি এবং খুব যত্ন দিয়ে এদের পাশে দাঁড়াতে হয়। শিশু যে বাসাতে বড় হয়, খেলাধূলা ও পড়াশোনা করে, পরিবারের সাথে সময় কাটায়— সেই স্মৃতি তার জন্য ভোলা খুব কঠিন হয়।
সেই পরিবেশ থেকে যখন একটি শিশু ছিটকে পড়ে, তখন সে চরম ধাক্কা খায়। প্যারেন্টিং নিয়ে ব্রিটিশ লেখক জিন লিডলফ বলেছেন,‘‘শিশুর জন্মের পর টানা কয়েক বছর তার প্রয়োজন মা ও বাবার শরীরের সাথে সেঁটে থাকা। এর ফলে শিশুর ভেতর যে শারীরিক বন্ধন তৈরি হয়, সেটা তার মধ্যে ব্যক্তিক ও সামাজিক নিরাপত্তাবোধ তৈরি— যা তাকে করে তোলে মানবিক, প্রেমময়, সমাজ ও পরিবারের প্রতি ত্যাগী। তার মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরি হয় না (দি কন্টিনিউয়াম কনসেপ্ট গ্রন্থ)।
এই ভয়াবহ ক্ষতি থেকে বাঁচার কী উপায় হতে পারে? বাবা-মা যখন আলাদা হয়ে যায়, তখন শিশুর মনে নিরাপত্তা ও ভালোবাসা হারানোর ভয়টা সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয়। তাই শিশু মনোচিকিৎসকরা বলেন, এই ভাঙনের দুঃখ শিশু ভুলতে পারবে তখনই, যখন মা-বাবা সন্তানকে বোঝাতে পারবেন যে, তারা ওকে ঠিক আগের মতোই ভালবাসেন এবং তাদের জীবনে ওই প্রথম প্রায়োরিটিই।
বাবা-মা কেন আলাদা হয়ে যাচ্ছে, ছোট শিশুরা তা সহজে বুঝতে না পারলেও, জীবনযাত্রা যে বদলে যাচ্ছে সেটা ঠিকই অনুভব করতে পারে। সঠিক সহায়তা, ভালোবাসা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেলে তারাও হতে পারে আত্মবিশ্বাসী ও সফল মানুষ।
শুধু প্রয়োজন সহমর্মিতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ, কো-প্যারেন্টিং, স্কুল কাউন্সিলিং ও কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক




