একজন মানুষ অযোগ্য হতে পারেন। জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা কিংবা নেতৃত্বের প্রয়োজনীয় গুণাবলি তার মধ্যে পর্যাপ্ত নাও থাকতে পারে। সমাজে এমন মানুষ থাকবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কারণ যোগ্যতা অর্জন সময়সাপেক্ষ, আর সবার মেধা, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা সমান নয়। কিন্তু অযোগ্যতার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে ওঠে সেই পরিস্থিতি— যখন একজন মানুষ নিজের অযোগ্যতা সম্পর্কে সচেতনই নন। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে না পেরে তিনি যখন বড় দায়িত্ব গ্রহণ করেন, ভুল সিদ্ধান্তকে সঠিক মনে করেন, সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখেন এবং নিজের অজ্ঞতাকে আত্মবিশ্বাস দিয়ে আড়াল করেন, তখন তার ব্যক্তিগত দুর্বলতা আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না— তার প্রভাব পড়ে প্রতিষ্ঠান, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রের ওপরও।
এই কারণেই বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন, শিক্ষা, ব্যবসা, রাজনীতি, গবেষণা, বিচার, গণমাধ্যম, চিকিৎসা কিংবা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে যে ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করেন, তার ব্যক্তিগত যোগ্যতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎও অনেকাংশে যুক্ত থাকে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষাগত সনদ, পদমর্যাদা কিংবা দীর্ঘ চাকরির বয়স বিবেচনা করলেই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আত্মমূল্যায়নের সক্ষমতা, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার মানসিকতা, বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণের ইচ্ছা এবং ভুল হলে তা সংশোধনের সাহস।
তবে অযোগ্যতা আর আত্মঅজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অযোগ্য ব্যক্তি অনেক সময় নিজের অযোগ্যতা উপলব্ধি করতে পারেন। তখন তিনি সহযোগিতা নেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করেন এবং নিজের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেন। ফলে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। বিপদ শুরু হয় যখন অজ্ঞতা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়। মনোবিজ্ঞানে এমন প্রবণতাকে ডানিং ক্রুগার প্রভাবের আলোচনায় ব্যাখ্যা করা হয়। সীমিত জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি অনেক সময় নিজের জ্ঞানের সীমা উপলব্ধি করতে পারেন না। ফলে তিনি নিজের সক্ষমতাকে অতিরঞ্জিতভাবে মূল্যায়ন করেন এবং অন্যের দক্ষতা, সতর্কতা কিংবা সমালোচনাকে গুরুত্বহীন মনে করতে পারেন।
এই আত্মঅজ্ঞতার বাস্তব প্রতিফলন বাংলাদেশের বহু প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়। কোনও ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন বলেই তিনি সব বিষয়ে দক্ষ হয়ে যান না। একজন ভালো শিক্ষক প্রশাসনে দক্ষ নাও হতে পারেন। একজন সফল ব্যবসায়ী গবেষণা পরিচালনায় উপযুক্ত নাও হতে পারেন।
একজন দক্ষ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাকাডেমিক নেতৃত্বের গুণাবলি নাও রাখতে পারেন। আবার দীর্ঘদিন কোনও পদে থাকার অভিজ্ঞতা থাকলেই যে কেউ দূরদর্শী নীতিনির্ধারক হয়ে উঠবেন, এমন নিশ্চয়তাও নেই। কিন্তু আত্মঅজ্ঞতার সমস্যা আরও গভীর— সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে না পারলে তিনি এমন দায়িত্বও গ্রহণ করতে পারেন, যার জন্য তার প্রস্তুতি নেই।
এই বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল প্রশাসনিক ভবন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরীক্ষা ও সনদের সমষ্টি নয়; বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টি করে, গবেষণার পরিবেশ তৈরি করে, নতুন প্রজন্মের চিন্তাশক্তি গড়ে তোলে এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্য মানবসম্পদ প্রস্তুত করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গি, গবেষণার মূল্যবোধ, প্রশাসনিক দক্ষতা, আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে ধারণা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সক্ষমতা প্রত্যাশিত। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকতেই পারে, কিন্তু সেই ঘাটতি সম্পর্কে নেতৃত্বের নিজের সচেতনতা না থাকলে সিদ্ধান্তের ভুলের প্রভাব বহু বছর ধরে প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হতে পারে।
আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও তীব্র। বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পের সঙ্গে সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছ থেকেও ক্রমবর্ধমানভাবে একই ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে নেতৃত্ব যদি গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না রাখে, তাহলে শুধু প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়া কঠিন।
তবু সমস্যাটি কেবল যোগ্যতার ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কি জানেন যে তার কোথায় ঘাটতি রয়েছে? একজন আত্মসচেতন নেতা বলতে পারেন, “এই বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা কম, তাই বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রয়োজন।” কিন্তু আত্মঅজ্ঞ নেতা প্রায়ই এর বিপরীত আচরণ করেন। তিনি মনে করেন, পদ পাওয়াই যোগ্যতার প্রমাণ। ফলে পদমর্যাদা তার কাছে জ্ঞান ও দক্ষতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।
সমালোচনাকে তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে নেন, ভিন্নমতকে অবজ্ঞা করেন, প্রশ্নকে বিরোধিতা হিসেবে দেখেন এবং নিজের সিদ্ধান্তের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেন।
এই মানসিকতার পরিণতি একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। ভুল নিয়োগ, দুর্বল গবেষণা নীতি, অদক্ষ আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প, পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং মেধাবীদের নিরুৎসাহিত করার মতো ঘটনা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিকে দুর্বল করে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় যখন যোগ্য ও সৎ মানুষ কথা বলা থেকে বিরত থাকেন। কারণ তারা বুঝতে পারেন, যুক্তি ও তথ্যের পরিবর্তে ব্যক্তিগত আনুগত্য বেশি মূল্য পাচ্ছে। তখন প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে এমন এক পরিবেশে প্রবেশ করে, যেখানে সত্য বলার চেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করা বেশি নিরাপদ হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে আত্মঅজ্ঞতার বিষয়টি নতুন করে ভাবা জরুরি। আমরা অনেক সময় পদকে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করি। কেউ বড় পদে আছেন, তাই তিনি নিশ্চয়ই বড় যোগ্য, এমন ধারণা তৈরি হয়। অথচ পদ অনেক সময় একজন ব্যক্তির সক্ষমতার প্রমাণ নয়— বরং দায়িত্ব পালনের একটি সুযোগ মাত্র। প্রকৃত যোগ্যতা প্রকাশ পায় সিদ্ধান্তের মান, সংকট মোকাবিলার ক্ষমতা, জ্ঞানচর্চার গভীরতা, সততা, জবাবদিহি এবং নিজের ভুল স্বীকারের সক্ষমতার মাধ্যমে।
তাই আত্মঅজ্ঞতার বিপরীতে আত্মজ্ঞান নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ। নিজের শক্তি সম্পর্কে জানা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিজের দুর্বলতা সম্পর্কেও সচেতন থাকা প্রয়োজন। একজন যোগ্য নেতা জানেন কোথায় সিদ্ধান্ত নিজে নিতে হবে, কোথায় পরামর্শ নিতে হবে এবং কোথায় নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করতে হবে। তিনি জানেন, প্রশ্ন করা দুর্বলতার লক্ষণ নয়— বরং সঠিক প্রশ্ন করতে পারাও জ্ঞানেরই অংশ।
সেই কারণে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু “কে সবচেয়ে যোগ্য” প্রশ্ন করলেই হবে না। পাশাপাশি জানতে হবে, “কে নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি সচেতন?” নেতৃত্বের ক্ষেত্রে আত্মসচেতনতা অনেক সময় অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের চেয়ে বেশি মূল্যবান। যে ব্যক্তি জানেন না তিনি কী জানেন না, তিনি ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন— আর যে ব্যক্তি নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন, তিনি শেখার, পরামর্শ নেওয়ার এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করতে পারেন।
যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও তাই এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন থাকা দরকার। নিয়োগের সময় শুধু ডিগ্রি, পদমর্যাদা, চাকরির বয়স কিংবা আনুষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা নয়, গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক অবদান, নেতৃত্বের সক্ষমতা, নৈতিক মানদণ্ড, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইতিহাস, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জ্ঞাননির্ভর প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হওয়া উচিত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে কোথায় নিয়ে যেতে পারবেন এবং সেই পথ সম্পর্কে তার বাস্তবসম্মত ধারণা কতটা গভীর।
মনে রাখা দরকার, অযোগ্যতা সবসময় অপরাধ নয়। মানুষ অযোগ্যতা নিয়ে শুরু করতে পারেন, আবার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নিজের ঘাটতি পূরণও করতে পারেন। কিন্তু নিজের অযোগ্যতাকে অস্বীকার করা, অজ্ঞতাকে জ্ঞান মনে করা এবং ক্ষমতাকে আত্মমূল্যায়নের বিকল্প বানানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ অযোগ্য মানুষ নিজের সীমা অতিক্রম না করলেও ক্ষতি সীমিত থাকতে পারে; আত্মঅজ্ঞ মানুষ নিজের সীমা কোথায়, সেটাই জানেন না। ফলে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন, ক্ষমতা প্রয়োগ করতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত ভুলকেও সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন।
বাংলাদেশের সামনে যখন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বড় চ্যালেঞ্জ, তখন নেতৃত্ব নির্বাচনে আত্মজ্ঞানকে আর গৌণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ব্যক্তি যত বড় পদেই থাকুন, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতাগুলোর একটি হওয়া উচিত নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা। কারণ যে মানুষ নিজের অজ্ঞতা চিনতে পারেন, তার শেখার সম্ভাবনা থাকে; তিনি পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন এবং ভুল থেকে ফিরে আসার সুযোগও রাখেন।
বিপরীতে, যে মানুষ নিজের অজ্ঞতাকেই জ্ঞান বলে মনে করেন, তার হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তাই সমাজের জন্য অযোগ্যতার চেয়ে বড় সতর্কবার্তা হওয়া উচিত আত্মঅজ্ঞতা। অযোগ্য মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নত করা যায়, কিন্তু নিজের অযোগ্যতাই যে বুঝতে পারে না, তাকে সংশোধনের প্রথম দরজাটিই খুঁজে পাওয়া কঠিন।
লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়