বাংলাদেশ এগিয়েছে— এই কথা কেউ অস্বীকার করবে না। রাস্তাঘাট হয়েছে, বিদ্যুৎ পৌঁছেছে প্রত্যন্ত গ্রামে, মানুষের গড় আয় বেড়েছে। কিন্তু এই এগিয়ে চলার গল্পের পাশেই আরেকটা গল্প আছে। সেই গল্প চা-বাগানের শ্রমিকের, দলিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীর, বস্তির নারীর, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষটির। উন্নয়নের ভাগ তাদের কাছে খুব কম পৌঁছায়। বরং সময়ের সাথে সাথে সমাজের নাকি অংশের সাথে তাদের দূরত্ব বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশে বৈষম্যের চিত্রটি এখন বেশ স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের ‘বাংলাদেশ পোভার্টি অ্যান্ড ইক্যুইটি অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আয় বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২২ সালে ৩৫.৫ থাকা আয়-ভিত্তিক গিনি সহগ ২০২৫ সালে ৩৬.১-এ উঠতে পারে। গিনি সহগ যত বাড়ে, আয় বৈষম্যও তত বাড়ে। ২০২৫ সালের শুরুতে বিশ্বব্যাংক ধারণা করেছিল, দেশের দারিদ্র্যের হার ওই বছর ২২.৯ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৯.৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সে সময় বিশ্বব্যাংক আরও আশঙ্কা করেছিল, প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে। তবে পরবর্তীকালে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২১.৪ শতাংশে—২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশের তুলনায় যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
সম্পদের বৈষম্যের চিত্রটি আরও তীব্র। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল মোট সম্পদের ৫৮.৫ শতাংশ। বিপরীতে, সবচেয়ে দরিদ্র ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল মাত্র ৪.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের অর্ধেক মানুষের হাতে যে পরিমাণ সম্পদ আছে, তার তুলনায় দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশের হাতে রয়েছে বহুগুণ বেশি সম্পদ। এই ব্যবধান বাংলাদেশের সামাজিক বৈষম্যের একটি বড় চিত্র তুলে ধরে।
শহরাঞ্চলে বৈষম্যের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের একটি জরিপে দেখা যায়, শহরাঞ্চলে ব্যয়ভিত্তিক গিনি সহগ ছিল ০.৫৩২, যেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ছিল ০.৩৪৭। একই জরিপে দেখা যায়, নিম্ন দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের হার ২০২২ সালের ৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৯.৩৫ শতাংশ হয়েছে। আর উচ্চ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের হার বেড়ে প্রায় ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, শহরাঞ্চলের প্রায় চারজনের একজন উচ্চ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।
এই সংখ্যাগুলোর পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের বাস্তব জীবন। চা-শ্রমিকদের কথাই ধরা যাক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা দেশের চা-শিল্পে কাজ করে আসছেন। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান এখনও অনেক পিছিয়ে। ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের বিভিন্ন চা- বাগানের শ্রমিকেরা দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছেন। সে সময় প্রচলিত দৈনিক মজুরি ছিল ১৮৭ থেকে ১৯৬ টাকার মতো। শ্রমিকেরা বলেছেন, এই মজুরি দিয়ে বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন।
শুধু মজুরিই নয়, চা-শ্রমিকদের অনেক পরিবার এখনও নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন, ভালো আবাসন ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে চা-বাগানের শ্রমিকদের সমস্যা শুধু কম মজুরির সমস্যা নয়; এটি দারিদ্র্য, সামাজিক বঞ্চনা এবং প্রজন্মগত বৈষম্যেরও একটি উদাহরণ। সমাজের আরও একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হলো দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের একটি বড় অংশ পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ও কম মর্যাদার কাজের সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে তাদের কম মজুরি, স্বাস্থ্যঝুঁকি, আবাসন সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের কথা উঠে এসেছে। তাদের অনেকেই এখনও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
বৈষম্যের সবচেয়ে কঠিন দিক হলো— এটি শুধু আয় বা সম্পদের পার্থক্য তৈরি করে না; এটি মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কাজ এবং সামাজিক মর্যাদার সুযোগকেও প্রভাবিত করে। ফলে একজন মানুষ দরিদ্র পরিবারে জন্মালে তার পক্ষে এই বৈষম্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের সামাজিক বৈষম্যের আসল সংকট এখানেই।
স্বাস্থ্যসেবা আর শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা যায়। শহরের একজন সচ্ছল পরিবারের সন্তান অসুখ হলে বড় হাসপাতালে যায়, প্রয়োজনে দেশের বাইরেও চিকিৎসা করায়। কিন্তু প্রান্তিক এলাকার একজন মানুষ জ্বর হলেও অনেক সময় গ্রামের বাজারের ওষুধের দোকান ছাড়া আর কোথাও যেতে পারেন না। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার নেই, বিছানা নেই, ওষুধ নেই। ফলে সামান্য একটা অসুখও তার জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষার ক্ষেত্রেও তা-ই। শহরের স্কুলে ভালো শিক্ষক আছেন, প্রযুক্তির সুযোগ আছে। কিন্তু চর অঞ্চল, হাওর কিংবা পাহাড়ি এলাকার স্কুলে অনেক সময় শিক্ষকই থাকেন না নিয়মিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী শিশুরা নিজের ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ এখনো পুরোপুরি পায় না। ফলে তারা শুরু থেকেই পিছিয়ে থাকে।
নারী ও তরুণদের বেলায় এই বৈষম্যের চেহারা আরেকটু আলাদা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, দেশের প্রতি পাঁচজন তরুণী শ্রমশক্তির একজন এখনো বেকার। শিক্ষিত তরুণীদের মধ্যে প্রতি চারজনে একজন কোনও কাজ পান না। কারখানাগুলোতে নতুন কাজের সুযোগ কমছে, আর যেসব কাজ তৈরি হচ্ছে সেগুলো তুলনামূলক কম উৎপাদনশীল খাতে। এর মাশুল সবচেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে নারী আর তরুণদের।
এই সব পরিসংখ্যান পড়লে মনে হতে পারে, এগুলো শুধু কাগজের সংখ্যা। কিন্তু বাস্তবে এর মানে নহলো, একটা দলিত পরিবারের সন্তান স্কুলে গিয়েও সহপাঠীর পাশে বসতে পারে না। একটা চা- শ্রমিকের মেয়ে বিয়ের আগেই স্কুল ছেড়ে দেয়, কারণ পরিবারের হাতে টাকা নেই। একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ চাকরির দরখাস্ত জমা দিয়েও ডাক পান না। বস্তির একজন মা রাতে সন্তানকে নিয়ে খোলা জায়গায় শৌচকর্ম সারতে বাধ্য হন, কারণ তার এলাকায় শৌচাগার নেই। বৈষম্য তাই শুধু আয়ের হিসাব নয়, এটা মানুষের মর্যাদার প্রশ্নও। যে মানুষ প্রতিদিন এই অবহেলা নিয়ে বাঁচেন, তার কাছে রাষ্ট্রের উন্নয়নের গল্প অনেক সময় দূরের এক গল্প মনে হয়, যা তার নিজের জীবনকে স্পর্শ করে না।
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে প্রথমেই দরকার সঠিক তথ্য। যাদের সংখ্যা এখনো রাষ্ট্রের খাতায় স্পষ্ট নয়, তাদের প্রথমে গোনা দরকার। জনশুমারি আর খানা জরিপগুলোতে দলিত, হরিজন, বেদে, তৃতীয় লিঙ্গ, চা-শ্রমিক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আলাদা করে চিহ্নিত করা গেলে তাদের জন্য নীতি তৈরি করা সহজ হবে।
এরপর দরকার ন্যায্য মজুরি নীতি, যাতে চা-শ্রমিক বা দলিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো মানুষেরাও বেঁচে থাকার মতো মজুরি পান। শিক্ষা আর স্বাস্থ্যসেবা যেন শুধু শহরের সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য না হয়ে প্রান্তিক এলাকার শিশুদের কাছেও পৌঁছায়, তার ব্যবস্থা দরকার। প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলে শিক্ষক নিয়মিত রাখা, উপজেলা হাসপাতালে ডাক্তার ও ওষুধের ব্যবস্থা রাখা— এই কাজগুলো খুব জটিল কিছু নয়, দরকার শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আর দরকার শুধু কাগজে-কলমে না রেখে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করা। ভাতা বা সহায়তার টাকা যেন সত্যিই প্রয়োজনীয় মানুষের হাতে পৌঁছায়, সেটাও নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, এটা সত্যি। কিন্তু অর্থনীতি বড় হওয়া আর সমাজ ন্যায্য হওয়া এক কথা নয়। যতদিন না প্রান্তিক মানুষের ঘরেও এই প্রবৃদ্ধির ছায়া পড়ছে, ততদিন এই উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। রাষ্ট্র আর সমাজ, দুই পক্ষকেই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কেমন বাংলাদেশ চায়— যেখানে কিছু মানুষ এগিয়ে যাবে আর বাকিরা পিছিয়ে থাকবে, নাকি যেখানে উন্নয়নের সুফল সবার ঘরে সমানভাবে পৌঁছাবে। এই সিদ্ধান্ত এখন নিতে দেরি করলে, বৈষম্যের যে ফাটল আজ দেখা যাচ্ছে, তা আরও গভীর হবে। আর সেই ফাটলের মূল্য একদিন পুরো সমাজকেই দিতে হবে।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক