গোল্ডেন জিপিএ নয়, প্রয়োজন শেখার সক্ষমতা

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে
১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০

শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কখনোই একটি সংখ্যা অর্জন করা নয়; বরং বোঝার ক্ষমতা তৈরি করা, প্রশ্ন করতে শেখা এবং অর্জিত জ্ঞানকে জীবনের বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে পারা। সক্রিয় শিক্ষা, যেখানে শিক্ষার্থী নিজে চিন্তা করে, আলোচনা করে, সমস্যার সমাধান খোঁজে এবং ভুল থেকে শেখে, দীর্ঘমেয়াদে একজন মানুষকে যেভাবে গড়ে তোলে, নিছক ভালো গ্রেড তা কখনো পারে না। একটি সার্টিফিকেটের গ্রেড হয়তো সাময়িক স্বীকৃতি এনে দেয়, কিন্তু প্রকৃত বোঝাপড়া ছাড়া সেই স্বীকৃতি টেকসই হয় না।

এ বছর প্রকাশিত এসএসসি ও সমমানের ফলাফল আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—শিক্ষার্থীরা গ্রেডের পেছনে ছুটছে, সেটি সমস্যা নয়; সমস্যা হলো, গ্রেড অর্জনের এই প্রতিযোগিতা কতটা তাদের শেখার প্রকৃত প্রক্রিয়াকে আড়াল করে দিচ্ছে। সব বোর্ড মিলিয়ে এবারের পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু সংখ্যাগুলো যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, মূল প্রশ্নটি থেকেই যায়: এই ফলাফল কতটা প্রকৃত শেখা, বোঝাপড়া ও জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতাকে প্রতিফলিত করে?

এগুলো শুধু সংখ্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রকৃত শেখা ও বোঝার চেয়ে ফলাফল, গ্রেড পয়েন্ট এবং সার্টিফিকেটকে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল সেই সংস্কৃতির কিছু গভীর সমস্যাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছে, পরীক্ষার ফল এখন কেবল একটি একাডেমিক সূচক নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং শিক্ষার্থীর আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

বাংলাদেশে জিপিএ-৫-এর প্রতি এই আবেশ নতুন নয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি এমন এক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে, যেখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য অনেক সময় শেখার আনন্দ বা জ্ঞান অর্জনের বদলে সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। ফলে একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে: আমরা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছি, নাকি শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য প্রস্তুত করছি?

বর্তমান মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউটর, গাইডবই, মডেল টেস্ট এবং পরীক্ষামুখী অনুশীলনের বিস্তার এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এসব উপাদান শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু যখন এগুলো নিয়মিত শ্রেণিকক্ষের শেখার বিকল্প হয়ে ওঠে, তখন সমস্যা তৈরি হয়। মুখস্থ করে নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দক্ষতা আর কোনো বিষয়কে গভীরভাবে বোঝা, নতুন পরিস্থিতিতে জ্ঞান প্রয়োগ করা কিংবা স্বাধীনভাবে সমস্যা সমাধান করার দক্ষতা এক বিষয় নয়। আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যটি স্বীকার করা।

এবারের ফলাফলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছেলে ও মেয়েদের ফলাফলের পার্থক্য। ৯ লাখ ১১ হাজার ৭৯১ জন ছাত্রীর মধ্যে পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, যেখানে ৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৯৪ জন ছাত্রের মধ্যে পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। একইভাবে, জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রীর সংখ্যাও ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন, যা ছাত্রদের ৫২ হাজার ৭৮০ জনের তুলনায় বেশি। এই প্রবণতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি করে: মেয়েদের তুলনামূলক ভালো ফলাফলের পেছনে কি নিয়মিত পড়াশোনা, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি, পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা এবং শেখার সঙ্গে অধিক সম্পৃক্ততার মতো বিষয় ভূমিকা রাখছে? অন্যদিকে, ছেলেদের একটি অংশ কি পরীক্ষার আগে স্বল্পমেয়াদি প্রস্তুতি, মুখস্থনির্ভরতা বা পরীক্ষামুখী কৌশলের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভর করছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুমানের মাধ্যমে নয়, বরং গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

আঞ্চলিক বৈষম্যও একইভাবে আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৩ হাজার ২৫৩ জন। বিপরীতে, বরিশাল বোর্ডে পাসের হার ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ৭৭৮ জন। এই পার্থক্যকে শুধু শিক্ষার্থীদের মেধা বা পরিশ্রমের পার্থক্য হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার মান, শিক্ষকতার সক্ষমতা, পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা, শিক্ষাসংক্রান্ত সম্পদের প্রাপ্যতা, অতিরিক্ত শিক্ষার সুযোগ এবং স্কুলের সামগ্রিক শেখার পরিবেশ, এসব কারণও ফলাফলের পার্থক্য তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোন কারণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নির্ধারণের জন্য আরও প্রমাণভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই জিপিএ-৫ কতজন পেল বা কতজন পাস করল, এটি নয়। প্রশ্ন হলো, যারা পাস করল তারা আসলে কতটা শিখল? তারা কি কোনো ধারণাকে মুখস্থ না করে ব্যাখ্যা করতে পারে? তারা কি শেখা জ্ঞান নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে পারে? তারা কি কোনো সমস্যার একাধিক সমাধান নিয়ে চিন্তা করতে পারে? তারা কি যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন করতে এবং নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে?

একটি শিক্ষা-ব্যবস্থা যদি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার হলে নির্ভুল উত্তর লিখতে শেখায়, কিন্তু বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যা বিশ্লেষণ, যুক্তি প্রয়োগ, সৃজনশীল চিন্তা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রস্তুত করতে না পারে, তাহলে উচ্চ জিপিএ সেই শিক্ষার পূর্ণ সাফল্যের প্রমাণ হতে পারে না।

তাই ২০২৬ সালের ফলাফলকে শুধু ভালো-মন্দ ফলাফলের হিসাব হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। আমাদের কি এমন একটি ব্যবস্থা দরকার, যেখানে জিপিএ থাকবে, কিন্তু জিপিএ শিক্ষার একমাত্র পরিচয় হবে না? যেখানে পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে একজন শিক্ষার্থী কী শিখেছে, কীভাবে চিন্তা করে এবং সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে কীভাবে প্রয়োগ করতে পারে?

শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য যদি সত্যিই মানুষ তৈরি করা হয়, তাহলে আমাদের সাফল্যের মাপকাঠিও বদলাতে হবে। সার্টিফিকেটের সংখ্যার বাইরে গিয়ে আমাদের জানতে হবে, আমরা কি সত্যিই শিখতে পারে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি?

সক্রিয় শিক্ষা, যেখানে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করে, প্রয়োগ করে, আলোচনা করে, নিজে অনুসন্ধান করে জ্ঞান গঠন করে, শুধু নিষ্ক্রিয়ভাবে তথ্য মুখস্থ করে না, এমন কিছু গড়ে তোলে যা কোনো জিপিএ দিয়ে মাপা যায় না: পরীক্ষার পরও শেখা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা। যে শিক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র মুখস্থ করেছে কিন্তু কেন সেই সূত্র কাজ করে তা বোঝেনি, বাস্তব জীবনের কোনো সমস্যা পাঠ্যবইয়ের ছকের সঙ্গে না মিললেই সে হোঁচট খাবে। কিন্তু যে শিক্ষার্থী কোনো ধারণার পেছনের যুক্তি সত্যিকার অর্থে আয়ত্ত করেছে, সে সেই যুক্তিকে অপরিচিত পরিস্থিতিতেও কাজে লাগাতে পারবে। আর এটাই উচ্চশিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও নাগরিক জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

এবারের পাসের হার কমে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে শিক্ষা কর্তৃপক্ষ কঠোর মূল্যায়ন ও নম্বর দেওয়ায় কড়াকড়ির কথা বলছে। অর্থাৎ, শুধু মুখস্থবিদ্যা দিয়ে ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়া হয়তো আগের মতো সহজ নয়। এটিকে ধাক্কা হিসেবে না দেখে বরং একটি সংকেত হিসেবে দেখা উচিত। মাধ্যমিক শিক্ষার সংস্কৃতিকে গ্রেড-তাড়া থেকে সরিয়ে প্রকৃত দক্ষতা গঠনের দিকে নিয়ে যাওয়ার এটি একটি আমন্ত্রণ, যাতে ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীরা শেরপুরের মতো ঘটনার জন্ম দেওয়া একই উদ্বেগের শিকার না হয়।

অভিভাবকদের উচিত জিপিএ-৫-কে সন্তানের একমাত্র যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা বন্ধ করা। স্কুলগুলোর উচিত কৌতূহল, সমালোচনামূলক চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে পুরস্কৃত করা, শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়। শিক্ষকদের প্রয়োজন প্রশিক্ষণ ও সহায়তা, যাতে তারা মুখস্থনির্ভর পাঠদান থেকে সরে গিয়ে অংশগ্রহণমূলক, অনুসন্ধানভিত্তিক শ্রেণিকক্ষ গড়ে তুলতে পারেন। আর নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা কমে যাওয়া মানেই সংকট নয়। বরং এর অর্থ হতে পারে, ব্যবস্থা এখন শিক্ষার্থীদের সত্যিকার অর্থে চিন্তা করতে বাধ্য করছে।

গোল্ডেন জিপিএ দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার পথ দেখাতে পারে না। সেই কাজ করতে পারে কেবল প্রকৃত, সক্রিয় শিক্ষা। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা তাদের ফলাফলের কাগজের বাইরের জীবনের জন্য প্রস্তুত করে, শুধু সার্টিফিকেট ছাপা হওয়ার মুহূর্তেই যার সমাপ্তি ঘটে না।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর

/ইউএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছয় মাসে প্রতিটি সেক্টরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা: রিজভী 
সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছয় মাসে প্রতিটি সেক্টরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা: রিজভী 
প্রবল বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা, নগরবাসীর দুর্ভোগ
প্রবল বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা, নগরবাসীর দুর্ভোগ
সরকারের প্রতি অভূতপূর্ব জনসমর্থন রয়েছে: মাহদী আমিন
সরকারের প্রতি অভূতপূর্ব জনসমর্থন রয়েছে: মাহদী আমিন
তেলের দাম না বাড়িয়ে সরকার সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রেখেছিল: মাহদী আমিন
তেলের দাম না বাড়িয়ে সরকার সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রেখেছিল: মাহদী আমিন
সর্বশেষসর্বাধিক