গত ২৬ আগস্ট, বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় যা ঘটেছে, তাকে নিছক ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। রাসুওয়া ও নুওয়াকোট জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ত্রিশূলী নদীর ৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশজুড়ে আকস্মিক বন্যা আছড়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে যায় দশ-দশটি জনবসতি।
ঘটনার সূত্রপাত হিমালয়ের গভীরে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থাসহ (ইউএসজিএস) বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নেপাল-চীন সীমান্তসংলগ্ন উচ্চ হিমালয় অঞ্চলে একটি বৃহৎ হিমবাহ-বরফ ও শিলার অংশ ধসে পড়ে। এই ‘আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ’ থেকে সৃষ্ট বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও পানি নদীপথে নেমে আসে। প্রথমে ল্হেন্দে খোলা এবং পরে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় সৃষ্টি হয় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা।
ধসের ফলে সৃষ্ট ভূকম্পন-সদৃশ কম্পন ইউএসজিএসের হিসাবে ৫ দশমিক ২ মাত্রার একটি ‘ল্যান্ডস্লাইড সিসমিক ইভেন্ট’ হিসেবে রেকর্ড হয়। এটি কোনো স্বাভাবিক টেকটনিক ভূমিকম্প ছিল না। বন্যার স্রোত দ্রুত নিচের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং সীমান্তবন্দরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংখ্যাগুলোই এই দুর্যোগের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনডিআরআরএমএ)-এর ২৯ আগস্ট সকাল ১০টা পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ৬২৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ২ হাজার ৪২৬ জন এখনও নিখোঁজ এবং ৪ হাজার ৪৫১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
নিখোঁজদের মধ্যে অনেক বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। এমনকি নিখোঁজদের মধ্যে পুলিশের ২৭ সদস্যও রয়েছেন। এই নিখোঁজ ব্যক্তিরা আকস্মিক বন্যার সময় নেপালে অবস্থান করছিলেন। ২৮ আগস্ট পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সময় চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গিরং এলাকায় ৫৫৮ জন নিখোঁজ এবং অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ফলে দুই দেশের সরকারি তথ্য মিলিয়েও বিপর্যয়ের প্রকৃত মানবিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তখনো পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না।
নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ২৭ আগস্ট নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ বা যোগাযোগের বাইরে থাকা ৫৯০ পর্যটকের মধ্যে ৪৭৬ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। তাঁদের মধ্যে ভারতীয়, মার্কিন, ইউক্রেনীয়, অস্ট্রেলীয় ও ব্রিটিশ নাগরিকের উল্লেখযোগ্য সংখ্যা ছিল।
কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রায় যাওয়া ইন্ডিয়ান-অরিজিন ইউএস কাপল দীপক অ্যান্ড মধু আহুজার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি এই দুর্যোগের মানবিক মাত্রাকে আরও স্পষ্ট করে। তাঁরা ২৬ আগস্ট বন্যার সময় নেপাল-তিব্বত সীমান্তের দিকে যাত্রাপথে ছিলেন। পরে তাঁদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে ছিল রাসুওয়া জেলার তিমুরে ও শ্যাফ্রুবেশি। সেখানে বন্যার আকস্মিকতা ছিল ভয়াবহ। নেপালি কর্মকর্তাদের হিসাবে, ত্রিশূলী নদীর পানি মাত্র ৩০ মিনিটে প্রায় ৯ মিটার বা ৩০ ফুট বেড়ে যায়।
এই বিপর্যয়কে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবলে ভুল হবে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-ডোহার্টি আর্থ অবজারভেটরির অধ্যাপক গোরান একস্ট্রম এবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে বরফ ও হিমবাহ গলনের গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও এই ধরনের ধস জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও ঘটতে পারত, তবে জলবায়ু পরিবর্তন এই ঘটনাগুলোকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
তার ভাষায়, পার্বত্য অঞ্চলে এ ধরনের ধসের ঘটনা ক্রমেই ঘন ঘন ঘটছে এবং তা হিমবাহ গলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে প্রমাণিত হয়েছে।
এটি নতুন কোনো তত্ত্ব নয়; এটি একটি প্যাটার্ন। ২০১৬ সালে তিব্বতের পোইকু অববাহিকায় গংবাতোংশা হ্রদ থেকে হিমবাহী হ্রদ বিস্ফোরণ বা জিএলওএফ ঘটে। এতে নেপালের আর্নিকো মহাসড়ক ও একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়েছিল। ২০২৩ সালে ভারতের সিকিমে লোনাক হ্রদ ফেটে অন্তত ৬০ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও নেপালে একাধিক ছোট-বড় হিমবাহী বন্যা রেকর্ড হয়েছে।
গবেষকেরা হিসাব করে দেখিয়েছেন, হিমালয় অঞ্চলে ২০০টিরও বেশি হিমবাহী হ্রদ এখন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এগুলো ভারত, নেপাল, চীন, পাকিস্তান ও ভুটানের লাখো মানুষের জন্য সময়-বোমার মতো ঝুলে আছে।
এবার এই বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন হুমকি। ধসের ফলে চীনের গিরং কাউন্টিতে একটি ‘ব্যারিয়ার লেক’ বা বাঁধ-হ্রদ তৈরি হয়েছে। এটি যেকোনো সময় ফেটে নিচের দিকে আবারও ভয়াবহ বন্যা ঘটাতে পারে বলে চীনা কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে।
অর্থাৎ বিপদ এখনও কাটেনি। এটি একটি চলমান সংকট। সবচেয়ে দুঃখজনক দিক হলো, এই অঞ্চলে হিমবাহী বন্যার আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা একেবারে অনুপস্থিত ছিল না। উইকিপিডিয়ার তথ্যানুযায়ী, চীন ও নেপালের বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে একটি ফ্ল্যাশ ফ্লাড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম চালু রেখেছিলেন। অতীতে বহু প্রাণহানি ঠেকিয়েছে বলে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টও এই ব্যবস্থার প্রশংসা করেছিল।
কিন্তু এবার সেই ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়। কারণ, এটি মূলত পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণনির্ভর প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। এই ধরনের আকস্মিক হিমবাহ-ধসচালিত বিপর্যয় শনাক্ত করার মতো যথেষ্ট উন্নত ছিল না সেটি।
এটাই আসল সমস্যা। দক্ষিণ এশিয়ার পার্বত্য দেশগুলো এখনো এমন এক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে, যা ‘ধীরে বাড়া’ বন্যা শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু হিমবাহ ধসের মতো আকস্মিক ঘটনায় সতর্কতার সময় থাকে মাত্র কয়েক মিনিট। কখনো কখনো মাত্র পাঁচ থেকে ১১ মিনিট।
গবেষকদের হিসাবমতে, সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় সতর্কতার সময় মেলে মাত্র আধঘণ্টা। লাখো মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য এই সময় একেবারেই অপ্রতুল।
ভারতের সিকিমেও ২০২৩ সালে একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। লোনাক হ্রদের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বসানোর কথা ছিল। কিন্তু তহবিল সংকট ও জটিল অভিযান পরিকল্পনার কারণে তা এক বছর পিছিয়ে যায়। সেই বিলম্বের মূল্য চুকাতে হয় মানুষের জীবন দিয়ে।
আমরা যারা গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার নিচের প্রান্তে বাস করি, তাদের জন্য এই ঘটনা কোনো দূরের গল্প নয়। ত্রিশূলী নদীর এই বন্যার পানি শেষ পর্যন্ত গঙ্গা হয়ে বাংলাদেশের দিকেই প্রবাহিত হবে।
হিমালয়ের হিমবাহ গলন ও হ্রদ বিস্ফোরণ কেবল নেপাল বা ভুটানের সমস্যা নয়। এটি পুরো অববাহিকার সমস্যা, যার শেষ বিন্দুতে আমরা দাঁড়িয়ে।
আমাদের করণীয়ও স্পষ্ট। প্রথমত, আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি সমন্বিত হিমবাহী হ্রদ পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। সেখানে নেপাল, ভুটান, চীন, ভারত ও বাংলাদেশ তথ্য আদান-প্রদান করবে। রাজনৈতিক সীমানা এখানে বাধা হতে পারে না। কারণ পানি সীমানা মানে না।
দ্বিতীয়ত, শুধু পানির উচ্চতা নয়; স্যাটেলাইট চিত্র, ভূকম্পন সংবেদক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল ব্যবহার করে দ্রুততর সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ পার্বত্য জনপদগুলোতে নিয়মিত মহড়া ও সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকতে হবে। কারণ প্রযুক্তি যত ভালোই হোক, মানুষ যদি না জানে কী করতে হবে, তাহলে কয়েক মিনিটের সতর্কতাও কাজে আসবে না।
শেষ কথা হলো, নেপালের এই বিপর্যয় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল; জলবায়ু পরিবর্তন আর ‘ভবিষ্যতের হুমকি’ নয়। এটি এখন বর্তমানের বাস্তবতা।
হিমালয় গলছে। আর তার প্রভাব কেবল পাহাড়ের গ্রামগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকবে না—তা নেমে আসবে সমতলেও। আমরা যদি এখনই আঞ্চলিক প্রস্তুতি ও সহযোগিতা নিয়ে সিরিয়াস না হই, তাহলে আগামী দিনে এমন আরেকটি বিপর্যয়ের খবর আমাদেরও চমকে দেবে না।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর।




