পর্যটন অর্থনীতি-১০: বিশ্বের দরবারে ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার সময় এখনই

বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতায় পর্যটন আর কেবল অবসরযাপনের একটি খাত নয়; এটি এখন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং একটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নির্মাণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। একবিংশ শতাব্দীতে অনেক দেশ শিল্প কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়েও পর্যটনকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান ১১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হওয়ার কথা এবং বিশ্বের প্রতি ১০টি চাকরির মধ্যে প্রায় একটি এই খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, অসংখ্য নদী, পাহাড়, হাওর, দ্বীপ, সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং অনন্য আতিথেয়তার মতো সম্পদ আমাদের রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটনের মানচিত্রে বাংলাদেশ এখনও কেন প্রান্তিক অবস্থানে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নিরাপত্তা, অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা কিংবা বিনিয়োগের প্রসঙ্গ অবশ্যই সামনে আসে। কিন্তু এসবের পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যা নিয়ে আমাদের দেশে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়। সেটি হলো ব্র্যান্ডিং।

একজন বিদেশি পর্যটক যখন ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তখন তিনি প্রথমে কোনো দেশের হোটেল বা সড়কব্যবস্থা দেখেন না। তিনি দেখেন সেই দেশের পরিচয়, ভাবমূর্তি এবং বিশ্বজুড়ে প্রচারিত গল্প। অর্থাৎ তিনি প্রথমে একটি ‘ব্র্যান্ড’ দেখেন, পরে সেই দেশকে দেখেন।

এই কারণেই আধুনিক পর্যটন অর্থনীতিতে ব্র্যান্ডিং একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক বিষয়। ব্র্যান্ড শুধু একটি লোগো বা আকর্ষণীয় স্লোগান নয়; এটি একটি প্রতিশ্রুতি। এটি পর্যটককে জানায়, এই দেশ নিরাপদ, অতিথিপরায়ণ, বৈচিত্র্যময় এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতা প্রদান করতে সক্ষম।

বিশ্বের সফল পর্যটন গন্তব্যগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। থাইল্যান্ড বহু বছর ধরে ‘অ্যামেজিং থাইল্যান্ড’ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে নিজেকে বিশ্ব পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শুধু তাই নয়, দেশটি আজও সেই ব্র্যান্ডকে নতুন প্রজন্মের পর্যটকের কাছে পৌঁছে দিতে ডিজিটাল প্রচারণা, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক বিপণন ব্যবহার করছে। সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত শিল্পী লিসাকে ‘অ্যামেজিং থাইল্যান্ড’ প্রচারণার দূত হিসেবে যুক্ত করার সিদ্ধান্তও সেই দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ড কৌশলের অংশ।

সিঙ্গাপুরও একই পথ অনুসরণ করেছে। ‘প্যাশন মেড পসিবল’ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে তারা শুধু পর্যটন নয়, পুরো জাতীয় পরিচয়কে আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করেছে। নিরাপত্তা, দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং অভিজ্ঞতাকে একত্র করে একটি অভিন্ন ব্র্যান্ড তৈরি করেছে, যা পর্যটন ও বিনিয়োগ, দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বাংলাদেশের জন্যও এখন সময় এসেছে একটি সুস্পষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পর্যটন ব্র্যান্ড গড়ে তোলার। ‘ভিজিট বাংলাদেশ’ সেই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। তবে ‘ভিজিট বাংলাদেশ’ কেবল একটি প্রচারণামূলক স্লোগান হলে চলবে না। এটি হতে হবে একটি জাতীয় প্রতিশ্রুতি। এই ব্র্যান্ডের মাধ্যমে বিশ্বকে বলতে হবে, বাংলাদেশ শুধু একটি দেশ নয়, এটি প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মানুষের গল্পের এক অসাধারণ মিলনভূমি।

একটি সফল পর্যটন ব্র্যান্ডের চারটি মৌলিক উপাদান রয়েছে। প্রথমত, বিশ্বাসযোগ্যতা। পর্যটককে নিশ্চিত হতে হবে যে তিনি একটি নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে ভ্রমণ করবেন। দ্বিতীয়ত, স্বাতন্ত্র্য। বাংলাদেশকে এমন কিছু তুলে ধরতে হবে, যা অন্য কোথাও নেই। সুন্দরবন, নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা, বাউল সংস্কৃতি, বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কিংবা বৈচিত্র্যময় লোকঐতিহ্য আমাদের সেই স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তি হতে পারে।

তৃতীয়ত, অভিজ্ঞতা। আধুনিক পর্যটক শুধু ছবি তুলতে আসে না; সে স্মৃতি নিয়ে ফিরতে চায়। ফলে পরিবহন, আবাসন, খাবার, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং মানুষের আচরণ, সবকিছুই ব্র্যান্ডের অংশ হয়ে যায়। আর চতুর্থত, ধারাবাহিকতা। আজ এক ধরনের বার্তা এবং আগামীকাল আরেক ধরনের বার্তা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠিত হয় না। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী ডিজিটাল কৌশলও জরুরি। ‘ভিজিট বাংলাদেশ’ নামে একটি বহুভাষিক আন্তর্জাতিক পোর্টাল, সমন্বিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারণা, আন্তর্জাতিক ট্রাভেল ব্লগার ও ভ্লগারদের সম্পৃক্ততা, ভার্চুয়াল ট্যুর, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন এবং নির্দিষ্ট বাজারভিত্তিক প্রচারণা এখন সময়ের দাবি।

বিশ্বের পর্যটন বাজারে প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর কিংবা মালদ্বীপ কেউই তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর করে বসে নেই। তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের নতুনভাবে উপস্থাপন করছে, নতুন গল্প বলছে এবং নতুন অভিজ্ঞতা বিক্রি করছে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত সম্পদের অভাব নয়; বরং পরিচয়ের অভাব। পৃথিবীর বহু মানুষ এখনও জানেই না বাংলাদেশে কী কী দেখার আছে। এই অদৃশ্যতাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। সুতরাং পর্যটন অর্থনীতিকে জাতীয় উন্নয়নের একটি কৌশলগত খাত হিসেবে দেখতে হলে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিতে হবে ব্র্যান্ড নির্মাণেও। কারণ পর্যটন শিল্পে প্রথমে আসে পরিচয়, তারপর আগ্রহ, এরপর ভ্রমণ।

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। যদি আমরা নিরাপত্তা, অবকাঠামো, সেবার মান এবং আন্তর্জাতিক বিপণনকে একসূত্রে গাঁথতে পারি, তাহলে ‘ভিজিট বাংলাদেশ’ কেবল একটি স্লোগান হবে না; এটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিশ্বজনীন পরিচয়। আর সেই কারণেই বিশ্বের দরবারে ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার সময় এখনই।

লেখক: সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি