নদী নষ্ট, দেশ ধ্বংস 

বিশ্ব নদী দিবসে খবরের কাগজের রিপোর্টগুলো পড়ে নিজেদেরকে খুব ছোট ও নিচ মনে হয়েছে, ব্যর্থ মনে হয়েছে। কিছু বিষয় আজ সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।

দেশকে আমরা নদীমাতৃক আক্ষ্যা দিয়ে, কথার খই ফোটাতে ফোটাতে, বইয়ে ও পলিটিক্যাল রেটোরিকে ‘নদী আমাদের জীবন’, ‘নদী আমাদের সভ্যতা’, ‘নদী আমাদের অর্থনীতি’ কপচাতে কপচাতে— নদীগুলোর তেরোটা বাজিয়ে, জিডিপির তুমুল ইনডেক্স দেখিয়ে হাততালি দিচ্ছি। নদীতে মাটি ভরাট করে ঘরবাড়ি বানাচ্ছি, কল-কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল নদীর পানিতে উগরে দিচ্ছি। পয়োঃবর্জ্যের কথা বাদই দিলাম, এই বর্জ্য বিষাক্ত নয়। প্লাস্টিক-সহ অন্যান্য বর্জ্য কতটা নদীতে যাচ্ছে তার হিসাব না করে, বছরে একবার ‘নদী-নদী’ হাহাকার করে নদী দিবস পালন করে বলছি– ওরে নদী, তোকে বাঁচতে হবে। নাহলে আমরাই মরে যাবো।

রিপোর্টগুলোতে ভীতিকর সব তথ্য লেখা হয়েছে, কিন্তু আমরা কেউ ভয় পাচ্ছি না। সরকারি হিসেবে বাংলাদেশে নদনদীর সংখ্যা এখন ১ হাজার ৪১৫। অথচ প্রতিবেদনগুলোতে বলা হচ্ছে যে, এই ১৪১৫ নদীর দুই-তৃতীয়াংশের অস্তিত্ব আসলে নেই। অনেক নদী দখল হয়েছে, অনেকগুলো দূষিত হয়েছে, বাকিগুলো সরু হয়ে খাল, ড্রেন কিংবা চাষের জমিতে পরিণত হয়েছে। যেগুলো এখনও আছে, সেগুলোর অনেকগুলোতেই পানি নেই, দূষণ আর দখলদারদের কারণের মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে।

তাহলে আমরা কী বুঝবো? বা কী জানবো? আমরা কি নদীগুলোকে রক্ষা করতে পারবো? আমাদেরকে আসলে এই-ই বুঝতে হবে যে, নদীর মৃত্যু কোনও ব্যাপার না। নদীকে জীবন্ত হিসাবে দেখার আমাদের দরকার নেই। এখনও যেগুলো আছে, তা ভরাট করে দিলেও কিছু আসে যায় না।

আমরা এত নির্লিপ্ত কেন?

নদীর পানি দূষণকে আমরা সব সময় পরিবেশের সমস্যা বলে বয়ান তৈরি করেছি। আসলে এটি যে জনস্বাস্থ্যের সমস্যা, তা আমাদের মাথায় আসেনি। আসলেও আমরা তা পাত্তা দেইনি। ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যায় ৪২৪টি বর্জ্য নির্গমন- মুখ চিহ্নিত হয়েছে। এসব পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৩০ টন তরল ও কঠিন বর্জ্য নদীতে পড়ছে। নদীতে যাওয়া বর্জ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ শিল্পবর্জ্য বলে খবরের কাগজে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসায়নিক, রঙ, তেল, হেভি-মেটালসহ নানা বিষাক্ত পদার্থ ড্রেন ও খাল হয়ে নদীতে পৌঁছাচ্ছে।

বুড়িগঙ্গার পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাশাপাশি, ক্যাডমিয়াম ও পারদের মতো ধাতু পাওয়া যাচ্ছে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা এত নিচে নেমেছে যে, অনেক জায়গায় মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার পরিবেশই নেই।

নরসিংদীর হাড়িধোয়া নদীর চিত্র আরও প্রকট। একসময় যে নদী মানুষের জীবিকার উৎস ছিল, তার পানি এখন কালো ও দুর্গন্ধময়। স্থানীয় মানুষের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই পানিতে নামলে শরীরে চুলকানি-পাঁচড়ার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

খবরে বলা হচ্ছে যে, নদীর পানির এই বিষ খাবারে প্রবেশ করছে। এই দূষিত পানি কৃষিতে ব্যবহৃত হয়ে তার প্রভাব মাটি ও ফসল পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। আমরা নদীতে যেই বিষ ঢালছি, তা আমাদের খাবারের টেবিলেই ফিরে আসছে।

আমাদের নদীগুলো এখন ডাস্টবিন। আমরা যেসব বর্জ্য ফেলছি, প্রকৃতি সেগুলো আমাদেরকেই আবার ফিরিয়ে দিচ্ছে। কেমিক্যাল, প্লাস্টিক-তো আমরাই তৈরি করছি এবং নদীতে পাঠাচ্ছি।

আমরা সবাই একসঙ্গে নদী হত্যা করছি। শুধু দখলদারদেরকে দোষ দিলে সত্যের অর্ধেক বলা হবে। নদী ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত অবৈধ দখলদার, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নিয়ম না মানা শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বালু-পাথর উত্তোলনকারী, নদীর ধারে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারী এবং নদীতে ময়লা ফেলা সাধারণ মানুষও। সরকারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অসংগতি এবং কর্মকাণ্ডও সংকটকে বাড়িয়েছে।

একটা উদাহরণ দেই। ২০০৫ সালের সরকারি দলিলে বুড়িগঙ্গার দৈর্ঘ্য ছিল ৪৫ কিলোমিটার। ২০১১ সালের হিসাবে সেটা ২৯ কিলোমিটার। অর্থাৎ সরকারি হিসাবেই ১৬ কিলোমিটার নদী অদৃশ্য হয়ে গেছে।

রংপুর অঞ্চলের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, কোথাও নদীর সংযোগপথ বা শাখানদীর মুখ বন্ধ করার ফলে একের পর এক নদী মরে গেছে। কুড়িগ্রামের গিরাই নদের প্রায় ৮০ একরের মধ্যে প্রায় ৪০ একর ব্যক্তিমালিকানায় চলে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে।

তাহলে, রক্ষা করবে কে? কারা?

নদী রক্ষা করার দায়িত্বে আছে প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। নদী রক্ষা কমিশনসহ ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নদীর প্রবাহ, দখল ও দূষণ রোধের সঙ্গে কোনও না কোনোভাবে যুক্ত। অনেক কাজও হচ্ছে। ২০১০ সাল থেকে বিআইডব্লিউটিএ ২৮ হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদও করেছে। তারপরও নদীর দুর্দশা কাটেনি।

তাহলে সমস্যা কোথায়? নদী বাঁচাতে পারছি না কেন?

আমার মনে হয়, সমস্যা সম্ভবত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে, জবাবদিহির ক্ষেত্রে। একজন বিশেষজ্ঞকে বলতে শুনলাম, নদীগুলোর দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন- নদী কমিশন, বিআইডব্লিউটিএ, ওয়াসা, জেলা প্রশাসনসহ নানা কর্তৃপক্ষের হাতে থাকায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় কাজ করা যাচ্ছে না।

নদী রক্ষা বলতে আমরা বুঝি, বছরে একবার অভিযান-অভিযান ভান করে নদীর তীরে কয়েকটা স্থাপনা ভেঙে ফেলা। ভেঙে ফেলার পরই সেখানে আবার স্থাপনা গড়ে উঠলে সেটাকে নদী উদ্ধার বলা যায় কিনা, আমরা জানি না। কয়েক কিলোমিটার ড্রেজিং করে, ছবি তুলে পত্রিকায় ছাপিয়ে প্রকল্প শেষ করাকেও নদী ব্যবস্থাপনা বলা যায় কিনা, আমরা তাও বুঝি না।

আমাদের নদীগুলো নিয়ে অনেক সমস্যা। সীমানা নির্ধারণ, প্রবাহ নিশ্চিত করা, দখলদারদের উচ্ছেদ করা, পুনর্দখল ঠেকানো, শিল্পবর্জ্যের উৎসমুখ বন্ধ করা, ইটিপি সারাক্ষণ চালু আছে কিনা নিশ্চিত করা, পয়োঃবর্জ্য নদীতে যাওয়ার পথ বন্ধ করা এবং নদীকে নদীর মতো বাঁচতে দেওয়া।

আসলে আমাদের নদীগুলোর কোনও অভিভাবক নেই। অভিভাবক দরকার। যে নদী বাঁচাতে পারবে না তার ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহিও দরকার। জবাবদিহি নেই। দেশের দক্ষিণে, বরিশালের নদীগুলোর কথাও প্রতিবেদনগুলোতে এসেছে। যেসব নদীতে একসময় বড়-বড় লঞ্চ চলতো, সেগুলোর অনেকগুলো এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। কোথাও সেতু নির্মাণ হয়েছে, পলি পড়েছে, দখল হয়েছে। কিন্তু নদী বাঁচাতে কেউ কিছু করছে না।

ধরে নেই যে, নদী ধ্বংসের এই প্রবণতা আমরা কেউই থামালাম না, বা থামাতে পারলাম না। ২০৩৫, ২০৫০, ২০৭৫ বা ২১০০ সালে বাংলাদেশের নদীর চিত্র কী হবে? সেই চিত্র কল্পনা করতে রকেট সায়েন্সের প্রয়োজন হয় না। আমরা যারা নদী দখল বা দূষণকারী, তারা কি জানি না যে, আমরা নিজের দেশকেই ধ্বংস করছি? জানি। কারণ নদীকে আমরা দেশের সম্পদ ভাবতে শিখিনি। নদী নষ্টের পেছনে রয়েছে আমাদের লোভ, দূরদৃষ্টির অভাব, সামষ্টিক দায়িত্ববোধের সংকট এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক অদ্ভুত উদাসীনতা।

ইকরাম কবীর: কথা সাহিত্যিক

ekabir@gmail.com