শিক্ষক সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়বেন, তাঁদের সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়বে কে? 

প্রতিদিন সকালে দেশের লাখ লাখ শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে অন্যের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজ করেন। তাঁরা পড়ান, স্বপ্ন দেখতে শেখান, ভুল শুধরে দেন। তাঁদের হাত ধরেই এই শিশুদের কেউ বড় হয়ে হয় চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ আবার শিক্ষকই হয়। অথচ সেই শিক্ষকই অনেক সময় নিজের সন্তানের ভালো পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা একটু সচ্ছল জীবন নিশ্চিত করতে গিয়ে আর্থিক টানাপড়েনে পড়েন। এই বৈপরীত্যটি নিয়ে আমরা কতটা ভাবি?

এক দশক পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো এসেছে। এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় বেতন কাঠামো পরিবর্তন না হলে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে প্রকৃত আয় কমে যায়। নতুন কাঠামোর আওতায় এমপিওভুক্ত প্রায় ৩১ হাজার প্রতিষ্ঠানের ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারীও আসছেন। মাধ্যমিকের দশম গ্রেডের একজন শিক্ষকের মূল বেতন ধাপে ধাপে ১৬ হাজার টাকা থেকে ৩২ হাজার টাকায় উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে। এটি স্বস্তির খবর। কিন্তু এখানেই কি আমাদের থেমে থাকা উচিত?

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত— বাংলাদেশে শিক্ষকতা কি এমন একটি পেশা, যেখানে একজন মেধাবী তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ নিরাপদ মনে করে প্রবেশ করতে চাইবেন এবং একজন দক্ষ শিক্ষক সারা কর্মজীবন পেশাটিতে থেকে আরও ভালো শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পাবেন?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষকদের আন্দোলন আমাদের সামনে সমস্যাটিকে খুব স্পষ্ট করে দিয়েছে। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা কিংবা বেতন-ভাতার দাবিতে শিক্ষকদের রাস্তায় নামতে হয়েছে।

কোথাও কর্মবিরতি হয়েছে, কোথাও অনশন। এসব আন্দোলনকে শুধু বেতন বাড়ানোর দাবি হিসেবে দেখলে সমস্যাটির গভীরতা বোঝা যাবে না। একজন শিক্ষক যখন নিজের পরিবারের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তার জন্য শ্রেণিকক্ষের বাইরে দাঁড়াতে বাধ্য হন, তখন সেটি আসলে আমাদেরই কোনও না কোনও অব্যবস্থাপনার সংকেত।

শিক্ষকদের আমরা বলি, ‘আপনারাই জাতির ভবিষ্যৎ গড়ছেন।’ কিন্তু একইসঙ্গে যদি তাঁদের নিজেদের সন্তানের স্কুলের বেতন, বই, চিকিৎসা কিংবা উচ্চশিক্ষার খরচ নিয়ে প্রতিদিন দুশ্চিন্তা করতে হয়, তাহলে কথাটি কতটা অর্থবহ? এখানে বিষয়টি শুধু শিক্ষকদের প্রতি সহানুভূতির নয়। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে শিক্ষার মান এবং বৈষম্য।

একটি সচ্ছল পরিবার হয়তো সন্তানের দুর্বল শিক্ষার ঘাটতি পূরণ করতে পারে। সন্তানকে প্রাইভেট টিউটর দিতে পারে, কোচিংয়ে পাঠাতে পারে, অতিরিক্ত বই কিনে দিতে পারে, অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে।

দরিদ্র বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সেই সুযোগ অনেক কম। ফলে শ্রেণিকক্ষে একজন ভালো শিক্ষক পাওয়া তাদের জন্য শুধু ভালো শিক্ষার বিষয় নয়— এটি সামাজিক গতিশীলতারও একটি বড় সুযোগ। বাংলাদেশের শিক্ষার বর্তমান চিত্রও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ দেয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার বয়সী শিশুদের প্রায় ৫১ শতাংশ বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পাঠ দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। অর্থাৎ শুধু শিশুকে স্কুলে নিয়ে আসাই যথেষ্ট নয়— স্কুলে গিয়ে সে কী শিখছে, সেটিই বড় প্রশ্ন। এই জায়গায় শিক্ষকের বেতন এবং শিক্ষকের সক্ষমতা— দুটিকে আলাদা করে দেখলে চলবে না।

শিক্ষকদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু শুধু বেতন বাড়ালেই শিক্ষার মান রাতারাতি বদলে যাবে না। আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, শর্তহীন বেতন বৃদ্ধি শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শেখার ফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে না। অর্থাৎ ভালো বেতন দরকার, কিন্তু তার সঙ্গে ভালো শিক্ষক তৈরির ব্যবস্থাও দরকার।

বাংলাদেশের জন্য আশাব্যঞ্জক একটি উদাহরণও আছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের ষষ্ঠ শ্রেণির গণিত শিক্ষকদের অনলাইন প্রশিক্ষণের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বাড়িয়েছে। আর প্রশিক্ষণের সঙ্গে মাঝারি মাত্রার আর্থিক প্রণোদনা যুক্ত হলে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রভাব আরও বড় হয়েছে। শিক্ষকদের পাঠদানের পদ্ধতিতেও উন্নতি দেখা গেছে। এখানেই আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপের জায়গা।

শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ মানে শুধু বছরে একবার কোনও কর্মশালায় গিয়ে সার্টিফিকেট নেওয়া নয়। একজন প্রাথমিক শিক্ষককে জানতে হবে— কীভাবে একটি শিশু পড়তে গিয়ে কোথায় আটকে যাচ্ছে এবং কীভাবে তাকে দ্রুত সহায়তা করা যায়। একজন গণিত শিক্ষককে শুধু গণিত জানলেই হবে না; কঠিন একটি ধারণা কীভাবে ভিন্ন সক্ষমতার শিক্ষার্থীদের বোঝানো যায়, সেটিও জানতে হবে। নতুন শিক্ষকদের জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষকের মেন্টরশিপ দরকার। অভিজ্ঞ শিক্ষকদের জন্য দরকার শ্রেণিকক্ষভিত্তিক কোচিং এবং নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষক উন্নয়নের সাফল্য মাপতে হবে প্রশিক্ষণে কতজন গেলেন তা দিয়ে নয়— প্রশিক্ষণের পর শ্রেণিকক্ষে কী কী পরিবর্তন হলো, শিক্ষার্থীরা কী শিখলো, সম্মিলিত ফলাফল আগের চাইতে ভালো হলো কিনা, তা দিয়ে।

শিক্ষকতার পেশাটিকে আরও আকর্ষণীয় করতেও আমাদের ভাবতে হবে। একজন তরুণ মেধাবী গ্র্যাজুয়েট কেন শিক্ষকতা বেছে নেবেন? শুধু ‘দেশ গড়া’ আহ্বানে? নিশ্চয়ই নয়। তাঁকে একটি সম্মানজনক বেতন, পরিষ্কার ক্যারিয়ার পথ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পেশাগত স্বীকৃতি এবং নিজের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ দিতে হবে।

শিক্ষকতা যেন অন্য কোথাও সুযোগ না পাওয়া মানুষের শেষ আশ্রয় না হয়— বরং মেধাবীদের প্রথম পছন্দের পেশাগুলোর একটি হয়।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শিক্ষকদের ফুল, শুভেচ্ছা কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পাশাপাশি আমাদের আরও বড় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। আমরা যদি চাই, আমাদের সন্তানরা ভালো শিক্ষা পাক, তাহলে তাঁদের শিক্ষকদেরও ভালোভাবে বাঁচার এবং আরও ভালো শিক্ষক হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।

একজন শিক্ষককে শুধু বেশি বেতন দেওয়ার প্রশ্ন নয় এটি। প্রশ্ন হলো, আমরা কেমন শিক্ষক চাই, তাঁদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করি এবং সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সত্য আমরা যত দ্রুত বুঝবো, ততই ভালো—আমরা যখন শিক্ষকের হাতে আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ তুলে দিই, তখন সেই শিক্ষকের নিজের ভবিষ্যৎটিও নিরাপদ করার দায়িত্ব আমাদের।

লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত