প্রথাগত নিয়মতান্ত্রিকতা থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: যেভাবে বদলাচ্ছে রাষ্ট্রের সত্তা 

বিংশ শতাব্দীর বেশিরভাগ সময়জুড়ে একটি ভালো জনপ্রশাসনের ধারণা ছিল তুলনামূলকভাবে সরল। পেশাদার আমলাতন্ত্র পরিচালিত হবে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধানের ভিত্তিতে, থাকবে সুস্পষ্ট পদসোপান এবং কর্মকর্তা নিয়োগের প্রধান ভিত্তি হবে মেধা ও যোগ্যতা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারকে এখন জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ, জটিল অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা, বিপুল পরিমাণ তথ্যের ব্যবহার এবং বেসরকারি ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা। ফলে এখন প্রশ্নটি শুধু আমলাতন্ত্রকে আরও দক্ষ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মূল প্রশ্ন হচ্ছে— জবাবদিহি, ন্যায্যতা ও জনস্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে জনপ্রশাসন কীভাবে আরও সক্ষম, পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারদর্শী এবং প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠতে পারে?

এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা পাওয়া যায় ম্যাক্স ওয়েবারের আমলাতন্ত্রের ধারণায়। ওয়েবারের দৃষ্টিতে আধুনিক প্রশাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে— সুস্পষ্ট পদসোপান, কাজের বিশেষায়ন, আনুষ্ঠানিক বিধিবিধান, নির্ধারিত এখতিয়ার এবং কারিগরি যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিয়োগ। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল প্রশাসনিক কার্যক্রমে পূর্বানুমানযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা। ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা কোনো কর্মকর্তার নিজস্ব ইচ্ছার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পরিচালিত হওয়ার কথা প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠিত নিয়মের মাধ্যমে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই ধারণার প্রাসঙ্গিকতা এখনও যথেষ্ট। যেসব দেশে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়, সেখানে ওয়েবারের মেধা, যোগ্যতা ও নৈর্ব্যক্তিকতার নীতি কোনোভাবেই সেকেলে ধারণা নয়। বরং এগুলো পেশাদার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাব্যবস্থা। যে প্রতিষ্ঠানে পেশাদারত্বের মৌলিক ভিত্তিই দুর্বল, সেখানে অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রশাসন গড়ে তোলা সহজ নয়।

অবশ্য প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিজস্ব দুর্বলতাও ক্রমে দৃশ্যমান হয়েছে। প্রশাসনিক পদসোপান অনেক ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় অনমনীয় হয়ে উঠেছে। কখনও কখনও কার্যসম্পাদনের চেয়ে প্রক্রিয়া ও বিধি অনুসরণই প্রধান উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে। সমস্যা সমাধানের চেয়ে নিয়ম মেনে চলার বিষয়টি কর্মকর্তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে নাগরিকের প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সেবা সাজানোর পরিবর্তে নাগরিককেই প্রশাসনিক কাঠামোর জটিলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছে।

এই সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে ১৯৮০-এর দশক থেকে জনপ্রশাসনে নিউ পাবলিক ম্যানেজমেন্ট বা এনপিএম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বেসরকারি খাতের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি দ্বারা প্রভাবিত এই ধারণায় কর্মসম্পাদন, লক্ষ্য নির্ধারণ, ব্যবস্থাপকদের স্বাধীনতা, প্রতিযোগিতা, চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। নাগরিককেও ক্রমে সরকারি সেবার গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়। এনপিএম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে— সরকার যে অর্থ ও সম্পদ ব্যবহার করছে, তার বিনিময়ে আসলে কী অর্জন করছে? ফলে প্রশাসনিক উপকরণ ও প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ফলাফল ও কর্মসম্পাদন গুরুত্ব পেতে শুরু করে। কিন্তু বেসরকারি খাতের ব্যবস্থাপনা নীতি সরকারের ওপর প্রয়োগ করতে গিয়ে একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতাও সামনে আসে। তা হলো সরকার কোনও বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়।

সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দক্ষতার পাশাপাশি ন্যায়সংগত সেবা, আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হয়। কোনও বাজারে ব্যবসা লাভজনক না হলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেখান থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে পারে। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা প্রশাসনিক সেবা দেওয়া ব্যয়বহুল বলে সরকার সেই জনগোষ্ঠীকে সেবা দেওয়া বন্ধ করতে পারে না।

দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু রাষ্ট্রের এমন কিছু দায়িত্ব রয়েছে যা বাজারব্যবস্থার ওপর বর্তায় না। পরবর্তী সময়ে জনপ্রশাসনের আলোচনায় গভর্নমেন্ট থেকে গভর্ন্যান্সের দিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। সরকার উপলব্ধি করতে শুরু করে যে অনেক জটিল জন সমস্যা কোনও একটি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। জলবায়ু অভিযোজন, যানজট, অভিবাসন, জনস্বাস্থ্য কিংবা দারিদ্র্যের মতো সমস্যার সঙ্গে একাধিক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক সংস্থা যুক্ত। ফলে জনপ্রশাসকের ভূমিকা শুধু সরকারি নির্দেশ বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তাকে সমন্বয়কারী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়কের ভূমিকাও নিতে হয়েছে।

এই পরিবর্তন থেকেই নিউ পাবলিক গভর্ন্যান্সের ধারণা গুরুত্ব পায়, যেখানে সহযোগিতা, অংশীদারত্ব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত নেটওয়ার্কের ওপর জোর দেওয়া হয়। প্রায় একই সময়ে পাবলিক ভ্যালু বা জনমূল্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি শুধু দক্ষতা দিয়ে সরকারের সাফল্য পরিমাপের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এর পরিবর্তে সামনে আসে আরও গভীর প্রশ্ন— জনপ্রশাসন সমাজের জন্য কী ধরনের মূল্য সৃষ্টি করছে? উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশে সরকারকে প্রায়ই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, এনজিও, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যৌথভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হয়। কিন্তু বহু প্রতিষ্ঠান কোনও কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হলে দায়িত্বের সীমারেখাও অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। সহযোগিতা কখনোই রাষ্ট্রের নিজস্ব সক্ষমতার বিকল্প হতে পারে না। পুরো ব্যবস্থার সমন্বয় এবং ফলাফলের দায় গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় কর্তৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকতে হবে।

এরপর ডিজিটাল প্রযুক্তি জনপ্রশাসনে আরেকটি বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ই-গভর্নমেন্টের প্রাথমিক পর্যায়ে মূল লক্ষ্য ছিল প্রচলিত সরকারি সেবাকে অনলাইনে নিয়ে যাওয়া। আবেদন, লাইসেন্স, কর প্রদান, সরকারি ক্রয় এবং তথ্যসেবা ধীরে ধীরে কাগজ ও সরকারি কাউন্টার থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু ‘ডিজিটাল-এরা গভর্ন্যান্স’ শুধু প্রচলিত ফরম ও সেবা ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল বিষয় হচ্ছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটিকেই নতুনভাবে সাজানো। ধরা যাক, একজন নাগরিককে একই তথ্য পাঁচটি সরকারি দফতরে দিতে হয়। পাঁচটি পৃথক অনলাইন পোর্টাল তৈরি করলে হয়তো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল হবে, কিন্তু নাগরিকের সমস্যাটি থেকেই যাবে। প্রকৃত ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখা এবং সেবা প্রদানের পদ্ধতি নতুনভাবে ভাবতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত আমলাতন্ত্রের একটি ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করা নয়, বরং প্রযুক্তির সহায়তায় আরও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই পরিবর্তনকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিচ্ছে।

সরকার এখন এআই ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, বিভিন্ন প্রবণতা শনাক্ত, ভবিষ্যৎ সেবার চাহিদা অনুমান, অস্বাভাবিকতা শনাক্ত এবং নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। কর প্রশাসন, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, দুর্যোগ প্রস্তুতি কিংবা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে এআই ব্যবহারের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে সামনে আসছে এক ধরনের আলগরিদমিক বুরোক্রেসি বা অ্যালগরিদমনির্ভর আমলাতন্ত্র, যেখানে প্রশাসক, তথ্য এবং কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থার পারস্পরিক ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে।

এর সঙ্গে প্রশাসনিক বিবেচনাবোধ বা ডিসক্রিশনের ধারণাটিও বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত জনপ্রশাসনে প্রশ্ন ছিল, একজন কর্মকর্তা আইন মেনে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিনা এবং তার ওপর অর্পিত বিবেচনামূলক ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ করেছেন কি না।এআই-নির্ভর প্রশাসন আরও কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। অ্যালগরিদমটি কে তৈরি করেছে? কোন তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে? এআই যে সুপারিশ দিয়েছে, তার পেছনের যুক্তি কি ব্যাখ্যা করা সম্ভব? স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে কোনও অন্যায্য সিদ্ধান্ত হলে তার দায় কে নেবে? এগুলো শুধু প্রযুক্তিগত প্রশ্ন নয়। এগুলো জনপ্রশাসনের চিরাচরিত জবাবদিহি, ন্যায়সংগত আচরণ এবং প্রশাসনিক দায়িত্বের প্রশ্ন, যা এখন নতুন রূপে সামনে এসেছে।

উদাহরণ হিসেবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা ধরা যেতে পারে। সরকার যদি এআই-ভিত্তিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কোন পরিবার সহায়তা পাওয়ার যোগ্য তা নির্ধারণ করে, তাহলে কাজটি দ্রুত ও কম খরচে করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে যদি কোনও দরিদ্র পরিবার সহায়তা থেকে বাদ পড়ে, তাহলে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি প্রশাসনিক অন্যায়ও সৃষ্টি হতে পারে। ফলে শুধু কত দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তি হচ্ছে তা দিয়ে সাফল্য পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়। যোগ্য নাগরিক ন্যায়সংগতভাবে সেবা পাচ্ছেন কি না এবং ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নশীল দেশের জন্য এখানেই এআই নিয়ে অতিরিক্ত উৎসাহের বিষয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কাগজনির্ভর প্রশাসন থেকে সরাসরি এআই-নির্ভর সরকারে চলে যাওয়ার আকর্ষণ থাকতে পারে। কিন্তু দুর্বল প্রশাসনিক ভিত্তির ঘাটতি শুধু উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

এআই ব্যবহারের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য, সক্ষম প্রতিষ্ঠান, যথাযথ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, সাইবার নিরাপত্তা, কারিগরি দক্ষতা এবং সুস্পষ্ট জবাবদিহি প্রয়োজন। সরকারি তথ্যভান্ডার যদি বিচ্ছিন্ন বা ত্রুটিপূর্ণ হয়, তাহলে অ্যালগরিদম সেই নিম্নমানের তথ্য হয়তো আরও দ্রুত প্রক্রিয়া করবে, কিন্তু তার ফলে সিদ্ধান্তের মান অবশ্যই উন্নত হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে প্রশাসনিক জবাবদিহি আগে থেকেই অস্পষ্ট হলে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ দায়িত্ব নির্ধারণকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। তাই জনপ্রশাসনের নতুন রূপকে ওয়েবারের পরিবর্তে এআই হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্রশাসনের বিবর্তন সাধারণত একটি ধারণাকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে আরেকটি ধারণা গ্রহণের মাধ্যমে ঘটে না। ওয়েবারীয় আমলাতন্ত্র থেকে মেধাভিত্তিক নিয়োগ, পেশাদারত্ব, পূর্বানুমানযোগ্য বিধিবিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব এখনো প্রয়োজন। এনপিএম আমাদের

কর্মসম্পাদন ও ফলাফলের গুরুত্ব দেখিয়েছে। গভর্ন্যান্স বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। পাবলিক ভ্যালু নাগরিক, সামাজিক ফলাফল ও বৈধতার বিষয়টি পুনরায় গুরুত্বের কেন্দ্রে এনেছে। ডিজিটাল গভর্ন্যান্স সেবা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সমন্বিত পুনর্বিন্যাসের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অ্যাডাপটিভ গভর্ন্যান্স পরীক্ষা, শেখা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আর এআই এখন পূর্বাভাস, স্বয়ংক্রিয়তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কোন নীতিগুলো ধরে রাখতে হবে এবং কোন প্রশাসনিক চর্চাগুলো পরিবর্তন করতে হবে তা নির্ধারণ করা।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে সিভিল সার্ভিসের কাঠামোরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ঘন ঘন বদলির ওপর নির্ভরশীল সাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতাভিত্তিক আমলাতন্ত্র এমন এক সময়ে সমস্যায় পড়তে পারে, যখন সরকারকে জলবায়ু অর্থায়ন, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা গভর্ন্যান্স, অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জটিল প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে গভীর দক্ষতা অর্জন করতে হচ্ছে। সাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতার প্রয়োজন থাকবে, কিন্তু এর পাশাপাশি নির্দিষ্ট খাতে গভীর পেশাগত জ্ঞানও গড়ে তুলতে হবে।

শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সরকার একজন কর্মকর্তার বিশেষায়িত দক্ষতা তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করার পর যদি তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি খাতে বদলি করে, তাহলে একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈপরীত্য তৈরি হয়। রাষ্ট্র জ্ঞান তৈরিতে বিনিয়োগ করছে, কিন্তু ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেই জ্ঞানকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সঞ্চিত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না।

ফলে ভবিষ্যতের জনপ্রশাসকের পেশাগত সক্ষমতার ধরনও বদলাতে হবে। বিধিবিধান ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান অবশ্যই প্রয়োজন হবে। এর পাশাপাশি তথ্য বিশ্লেষণ, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পেশার মানুষের সঙ্গে সমন্বয়ের দক্ষতা এবং এআই-নির্ভর সুপারিশ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেললে সেখানে নিজস্ব পেশাগত বিচারবোধ প্রয়োগের সক্ষমতাও প্রয়োজন হবে।

এআই-এর বিস্তার প্রশাসনিক নৈতিকতার প্রয়োজন কমাবে না, বরং আরও বাড়াবে। নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ, আচরণ অনুমান এবং সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয় করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যত শক্তিশালী হবে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মানবিক পর্যবেক্ষণের সুরক্ষাও তত শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী একটি রাষ্ট্র ভুল কিংবা অন্যায্য সিদ্ধান্ত আরও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করার সক্ষমতাও অর্জন করতে পারে।

তাই ওয়েবারীয় আমলাতন্ত্র থেকে এআই-নির্ভর প্রশাসনে বিবর্তনের অর্থ পুরোনো সরকারব্যবস্থাকে প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা নয়। এটি এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরির ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, যেখানে স্থিতিশীলতার সঙ্গে অভিযোজনক্ষমতা, বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সঙ্গে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতার সঙ্গে ন্যায়সংগততা, ডিজিটাল গতির সঙ্গে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং উদ্ভাবনের সঙ্গে জবাবদিহির সমন্বয় ঘটানো সম্ভব।

উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিকভাবে যে প্রশাসনিক মডেলটি সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, সেটি অনুকরণ করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং নতুন পদ্ধতি কার্যকর করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করতে হবে। যে রাষ্ট্র এখনো মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা, পেশাদারত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি সুসংহত করতে পারেনি, তার জন্য অত্যাধুনিক অ্যালগরিদম ব্যবহারের চেয়ে এসব মৌলিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ওয়েবার থেকে এআই পর্যন্ত জনপ্রশাসনের দীর্ঘ বিবর্তন সম্ভবত আমাদের একটি খুব সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রযুক্তি প্রশাসনের কাজের উপকরণ বদলে দিতে পারে, কিন্তু জনপ্রশাসনের মৌলিক উদ্দেশ্য বদলে দেয় না। রাষ্ট্রকে এখনো সরকারি কর্তৃত্ব ও জনগণের সম্পদ ব্যবহার করে এমন ফলাফল সৃষ্টি করতে হয়, যার ওপর নাগরিক আস্থা রাখতে পারে। এআই হয়তো সেই কাজ সম্পাদনের পদ্ধতি বদলে দেবে। কিন্তু প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থে পরিচালিত হবে, সেই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর কোনো অ্যালগরিদম দিতে পারবে না। সেই উত্তর এখনো নির্ভর করবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, পেশাগত বিচারবোধ এবং জনজবাবদিহির ওপর।

লেখক: জনপ্রশাসন ও জননীতি বিশ্লেষক