লালনের গানে ধর্মের দেয়াল, মানুষের মিলন 

ধর্মের নামে মানুষকে ভাগ করা যত সহজ, সেই বিভাজনের দেয়াল ভেঙে মানুষকে মানুষ হিসেবে চিনতে শেখানো তত কঠিন।

ইতিহাসের নানা বাঁকে ধর্ম, জাতপাত, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের পরিচয়কে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়েছে। অথচ বাংলার মাটিতেই এমন এক সাধক জন্মেছিলেন, যিনি তার গান, জীবনাচরণ ও দর্শন দিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন—মানুষের আসল পরিচয় কী? তার ধর্ম, জাত, বর্ণ, নাকি তার মানবসত্তা? তিনি ফকির লালন শাহ। তার গান শুধু আধ্যাত্মিক সাধনার কথা বলে না; ধর্মীয় সংকীর্ণতা, সামাজিক বৈষম্য, জাতপাতের অহংকার এবং মানুষের তৈরি বিভেদের বিরুদ্ধে এক গভীর প্রতিবাদও জানায়।

লালনের জীবন সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্যের চেয়ে কিংবদন্তি বেশি। তার জন্মসাল, জন্মস্থান, পারিবারিক পরিচয়—এসব নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, তিনি অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৯০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার জন্ম হিন্দু পরিবারে, না মুসলমান পরিবারে—এ নিয়েও নানা মত প্রচলিত। কথিত আছে, তীর্থযাত্রার পথে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে সঙ্গীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এক মুসলমান পরিবার তাঁকে আশ্রয় ও সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলে। পরে তিনি সেই পরিবারের সঙ্গে থেকে ফকিরি সাধনায় দীক্ষিত হন। তবে এই কাহিনির সব বিবরণ ইতিহাসসম্মতভাবে প্রমাণিত নয়। লালনের জীবনের এই অনিশ্চয়তাই যেন তার দর্শনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত: তাঁকে কোনও একক ধর্মীয় পরিচয়ের খোপে আটকে রাখার চেষ্টা যতই হোক, তিনি বারবার সেই খোপের সীমানা অতিক্রম করেন।

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আখড়া গড়ে লালন তার সাধনা, সংগীত ও মানবদর্শনের চর্চা করেছেন। তার চারপাশে জড়ো হয়েছিলেন নানা ধর্ম, জাত ও সামাজিক পরিচয়ের মানুষ। সেখানে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হতো না জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে; বরং সাধনা, আচরণ ও মানবিকতার প্রশ্নই ছিল মুখ্য। যে সমাজে জাতপাতের কারণে মানুষ অপমানিত হতো, অস্পৃশ্যতার শিকার হতো, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সামাজিক দূরত্ব তৈরি করা হতো, সেখানে লালনের আখড়া হয়ে উঠেছিল এক বিকল্প পরিসর। সেখানে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার আকাঙ্ক্ষা ছিল মুখ্য।

লালনের বিখ্যাত গান ‘‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’’ শুধু একটি গানের পঙ্‌ক্তি নয়; এটি গোটা সমাজের মুখের ওপর ছুড়ে দেওয়া এক প্রশ্ন। মানুষ তার জাত জানতে চায়, ধর্ম জানতে চায়, জন্মপরিচয় জানতে চায়। কিন্তু লালন পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, জাতের চিহ্ন কোথায়? জন্মের সময় মানুষের শরীরে কি আলাদা কোনও ধর্মীয় ছাপ থাকে? মানুষের শরীর, রক্ত, অশ্রু,ক্ষুধা ও মৃত্যুর মধ্যে কি ধর্মের আলাদা কোনও ব্যবস্থা আছে? সমাজ অবশ্য এসব প্রশ্নে খুব একটা স্বস্তি পায় না। কারণ মানুষকে শ্রেণিবদ্ধ করতে পারলেই তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। পরিচয়ের খোপ যত পাকা, ক্ষমতার হিসাব তত সুবিধাজনক।

লালন আরও সরাসরি প্রশ্ন করেছেন—‘‘জাত গেলো জাত গেলো বলে, এ কী আজব কারখানা!’’ এই পঙ্‌ক্তির ব্যঙ্গ আজও অম্লান। জাত রক্ষার নামে মানুষকে অপমান করা হয়, ধর্ম রক্ষার নামে মানুষকে ঘৃণা করতে শেখানো হয়, পবিত্রতা রক্ষার নামে অন্যকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়। অথচ সেই পবিত্রতার পাহারাদারদের নিজেদের মানবিকতা কতটা অক্ষত, সে প্রশ্ন তোলার লোক কম। মানুষের তৈরি সামাজিক বিধানই তখন ঈশ্বরের বিধান বলে চালানো হয়। লালন সেই ভণ্ডামির পর্দা সরিয়ে দেখিয়েছেন, ধর্মের বাহ্যিক পরিচয় যত জোরালোই হোক, মানুষের ভেতরের সত্যকে তা নিশ্চিত করে না।

তার আরেকটি বহুল পরিচিত গান ‘‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’’ মানুষের শরীর, আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের রহস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই গানের দর্শনকে শুধু ধর্মীয় ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করা যায় না। লালনের কাছে মানুষ নিজেই এক রহস্য; তাকে কোনও একক সংজ্ঞায় সম্পূর্ণ ধরা যায় না। ‘অচিন পাখি’কে খুঁজতে গিয়ে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়। অথচ আমরা অন্যের পরিচয় সম্পর্কে কত দ্রুত সিদ্ধান্ত দিয়ে বসি! কে কোন ধর্মের, কোন জাতের, কোন সম্প্রদায়ের—তা জানলেই যেন মানুষটিকে পুরোপুরি চিনে ফেলা গেল। লালনের গান আমাদের এই আত্মতুষ্টির বিরুদ্ধে সতর্ক করে।

লালনের দর্শনে দেহতত্ত্ব, মনের মানুষ, গুরু, সাধনা ও আত্মঅনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। কিন্তু তার গানকে কেবল দুর্বোধ্য আধ্যাত্মিকতার আবরণে ঢেকে রাখলে এর সামাজিক তাৎপর্য হারিয়ে যায়। তার প্রশ্নের কেন্দ্রে ছিল মানুষের আত্মপরিচয়, আর সেই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সমাজে প্রচলিত বৈষম্য ও বিভাজন। তিনি এমন এক মানবসমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে জন্মের পরিচয় দিয়ে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হবে না। তার কাছে ধর্মের সত্যতা যাচাইয়ের একটি বড় মানদণ্ড ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক—মানুষকে ছোট করা, ঘৃণা করা কিংবা দূরে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যে কোনও মহত্ত্ব নেই।

বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও লালন তাই এক গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার। এ দেশের লোকসংগীত, বাউলধারা, মুর্শিদি, মারফতি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া কিংবা কীর্তনের ভেতর নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান ঘটেছে। এই ধারাগুলোর ইতিহাস এক নয়, তাদের সাধনা ও সংগীতভাষাও আলাদা। তবু বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরে তারা বহুবার পরস্পরের কাছাকাছি এসেছে, একে অন্যের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে, নিজেদের মতো করে নতুন রূপ তৈরি করেছে। লালনের গান সেই বহমান বিনিময়ের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তার সৃষ্টিকে শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সম্পত্তি বানাতে গেলে বাংলার ইতিহাসের একটি বড় অংশকেই অস্বীকার করতে হয়।

তবু আজও লালনকে নিয়ে টানাটানি থামে না। কেউ তাঁকে নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে চান, কেউ তার সাধনাকে একটি নির্দিষ্ট মতবাদের সীমানায় আবদ্ধ করতে চান। কেউ তার গানের আধ্যাত্মিক অংশটুকু গ্রহণ করেন, কিন্তু জাতপাত ও ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যান। অর্থাৎ লালনকে ভালোবাসার ঘোষণা আছে, কিন্তু লালনের প্রশ্নগুলো সহ্য করার প্রস্তুতি সব সময় নেই। তার গান গাওয়া যায় মঞ্চে, তার নামে উৎসব করা যায়, তার ছবি টাঙানো যায়; কিন্তু তার দর্শন নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে গেলেই অনেকের অস্বস্তি শুরু হয়।

এই অস্বস্তির কারণও স্পষ্ট। লালনকে সত্যিকার অর্থে গ্রহণ করা মানে শুধু কয়েকটি গান গাওয়া নয়; নিজের ভেতরের বিদ্বেষ, অহংকার ও পরিচয়কেন্দ্রিক গোঁড়ামির মুখোমুখি হওয়া। যে মানুষ ধর্মের নামে অন্যকে অপমান করে, জাতের নামে কাউকে নিচু মনে করে, কিংবা ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের অধিকার অস্বীকার করে, সে লালনের গান গাইলেই লালনের অনুসারী হয়ে যায় না। গান মুখস্থ করা সহজ; গানের মর্ম ধারণ করা কঠিন। বিশেষ করে সেই মর্ম যদি নিজের সুবিধাজনক বিশ্বাস ও সামাজিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় লালনের উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আরও বেশি। ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সন্দেহ, বিদ্বেষ ও বিভাজন ছড়ানোর চেষ্টা যখন দেখা যায়, তখন লালনের গান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষকে ছোট করে কোনও ধর্ম বড় হয় না, অন্যের পরিচয় মুছে দিয়ে নিজের পরিচয় মহিমান্বিত করা যায় না। ধর্ম পালনের স্বাধীনতা যেমন মানুষের অধিকার, তেমনই ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাস করা, ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে নিজেকে ভাবা কিংবা নিজের মতো করে জীবনযাপনের অধিকারও মানুষেরই। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব এসব অধিকার রক্ষা করা, কোনও একটির পরিচয়কে সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়।

লালন কোনও আধুনিক রাজনৈতিক সংবিধান রচনা করেননি। তার গানকে আজকের সব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হিসেবেও ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু তার মানবমুখী দর্শন আমাদের একটি জরুরি নৈতিক দিশা দেয়—মানুষের পরিচয় সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার আগে মানুষটিকে বুঝতে শেখা, বিশ্বাসের পার্থক্যকে শত্রুতায় পরিণত না করা, আর জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে হেয় করার প্রবণতাকে প্রত্যাখ্যান করা। এই শিক্ষা কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে নয়; বরং ধর্মের নামে মানুষের প্রতি অবিচার করার বিরুদ্ধে।

লালনের জীবনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো এই যে তিনি পরিচয়ের প্রশ্নকে এড়িয়ে যাননি; বরং সেই প্রশ্নের অসারতা উন্মোচন করেছেন। সমাজ যখন জানতে চায়, ‘‘তুমি কোন জাতের?’’, তখন তিনি প্রশ্ন করেন, ‘‘জাতের চিহ্ন কোথায়?’’ সমাজ যখন মানুষকে ধর্মের খোপে আটকে রাখতে চায়, তখন তার গান মানুষকে সেই খোপের বাইরের সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়। তার গান তাই শুধু অতীতের স্মারক নয়, বর্তমানেরও আয়না। সেই আয়নায় নিজের মুখ দেখতে গেলে আমাদের অস্বস্তি হতে পারে। কারণ সেখানে শুধু লালনের মুখ নয়, আমাদের নিজেদের সংকীর্ণতাও ধরা পড়ে।

লালনকে স্মরণ করার সবচেয়ে ভালো উপায় তার নামে উৎসবের সংখ্যা বাড়ানো নয়, তার গানকে কেবল সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর উপকরণ বানানোও নয়। বরং তার প্রশ্নগুলোকে জীবন্ত রাখা, তার মানবিকতার বোধকে সামাজিক আচরণে প্রতিফলিত করা এবং ধর্ম-জাত-বর্ণের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদাকে স্বীকার করা। লালন আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষকে চেনার আগে তার গায়ে পরিচয়ের সিল মেরে দেওয়া জ্ঞানের লক্ষণ নয়, অজ্ঞতারই প্রকাশ। তার গান আজও তাই আমাদের সামনে এক সহজ অথচ কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়: আমরা কি লালনের গান শুধু গাইবো, নাকি তার দেখানো পথে মানুষকেও চিনতে শিখবো?

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট