বাংলাবিজ: কেবল পোর্টাল নয়, চাই প্রকৃত প্রশাসনিক রূপান্তর 

ড. খালিদুর রহমান
২০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:০০ আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:০০

বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে গিয়ে উদ্যোক্তার বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তা। শিল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কোম্পানি নিবন্ধন, কর শনাক্তকরণ, ব্যবসার অনুমতিপত্র, জমি, পরিবেশ, অগ্নিনিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, পানি, আমদানি ও রফতানিসহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে একই তথ্য ও নথি একাধিকবার জমা দিতে হয়। কোনও অনুমোদন আবার অন্য দফতরের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে। ফলে বিনিয়োগের অর্থ ও উদ্যোক্তার সময় উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হওয়ার পরিবর্তে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আটকে থাকে।

এই বাস্তবতা বদলানোর লক্ষ্যেই বাংলাদেশে বিনিয়োগসেবা ধীরে ধীরে ডিজিটাল করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক দরজার সেবাব্যবস্থা সেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এরই সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে ‘বাংলাবিজ’ তথা ‘BanglaBiz’ বিনিয়োগকারীর সামনে সরকারি সেবার সমন্বিত প্রবেশপথ তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি মৌলিক ধাপ একসঙ্গে আনার পাশাপাশি ব্যবসার ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী কোন কোন অনুমোদন প্রয়োজন, তা নির্ধারণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক দরজার সেবায় ৪৭টি প্রতিষ্ঠানের ১৪২টি সেবা যুক্ত ছিল এবং এর মাধ্যমে ২ লাখ ১৫ হাজারের বেশি আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করা হয়েছে। আরও সাতটি সিটি করপোরেশন ও চারটি ব্যাংককে ব্যবস্থাটির সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় বিনিয়োগসেবার সঙ্গে স্থানীয় সরকার ও ব্যাংকিং সেবার সংযোগও বাড়ছে।

তবে প্রশ্ন হলো, একটি ওয়েব পোর্টালে বহু সেবা একত্র করলেই কি সত্যিকার অর্থে বিনিয়োগের অনুমোদন এক দরজায় চলে আসে?

উত্তর হলো, না। কারণ ডিজিটাল পোর্টাল হচ্ছে দৃশ্যমান প্রবেশপথ; তার পেছনে থাকে আইন, বিধি, সরকারি দফতরের এখতিয়ার, তথ্যভাণ্ডার, পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। আবেদন অনলাইনে নেওয়ার পর যদি সেই আবেদন আবার কাগজে জমা দিতে হয়, একই তথ্য বিভিন্ন দফতরকে আলাদাভাবে দিতে হয় কিংবা পরিদর্শনের জন্য একই প্রতিষ্ঠানে একাধিক দল পাঠানো হয়, তাহলে ডিজিটাল ব্যবস্থা থাকলেও পুরোনো জটিলতা থেকে যায়।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ মূল্যায়নেও বাংলাদেশের এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের বিধিব্যবস্থার মান ৫৩, সরকারি সেবার মান ৪৫ এবং কার্যকর পরিচালনার মান ৫৮। ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মান ৬৩। পরিসংখ্যানগুলো দেখায়, আইন ও নীতিমালার পাশাপাশি সরকারি সেবার বাস্তব দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি।

এখানেই ‘বাংলাবিজ’-এর প্রকৃত পরীক্ষা। একজন উদ্যোক্তা যদি সিলেটে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন করতে চান, তাহলে আদর্শ ব্যবস্থায় তাকে শুধু অনুমোদনের তালিকা দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রস্তাবিত জমি সংশ্লিষ্ট শিল্পের জন্য উপযোগী কিনা, পরিবেশগত কী ধরনের ছাড়পত্র প্রয়োজন, বিদ্যুৎ ও পানির কী ব্যবস্থা লাগবে, ভবন নির্মাণের কী অনুমোদন প্রয়োজন এবং কোন অনুমোদনের পর কোন অনুমোদন নিতে হবে— এসব তথ্যও একই ব্যবস্থায় পাওয়া উচিত। উদ্যোক্তা একবার তথ্য দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরগুলো সেই তথ্য ব্যবহার করবে। একই তথ্য বারবার চাওয়ার প্রয়োজন থাকবে না।

এই ধারণার সফল উদাহরণ রয়েছে বিদেশে। সিঙ্গাপুরের ‘গোবিনেস’ ব্যবস্থায় ১২০টির বেশি সরকারি ব্যবসায়িক সেবা এক জায়গায় দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুর সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় ৬০ লাখের বেশি সরকারি ও ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। উদ্যোক্তারা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কোন সরকারি সেবা প্রয়োজন, সেই নির্দেশনাও পান।

এস্তোনিয়াতেও ব্যবসা নিবন্ধন ও নিয়মিত সরকারি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বড় অংশ অনলাইনে সম্পন্ন হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ৮৫ শতাংশের বেশি নতুন সীমিত দায় কোম্পানি অনলাইনে নিবন্ধিত হয় এবং প্রায় ৯৯ শতাংশ বার্ষিক প্রতিবেদন অনলাইনে জমা পড়ে। এসব উদাহরণ দেখায়, এক দরজার সেবা কেবল বহু সরকারি সেবার তালিকা এক জায়গায় রাখার বিষয় নয়; রাষ্ট্রের ভেতরের কাজের ধারাকেও পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই ‘একবার তথ্য দিন, রাষ্ট্র প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করুক’ নীতি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একজন উদ্যোক্তা কোম্পানি নিবন্ধনের সময় যে মৌলিক তথ্য দেবেন, তা প্রয়োজন অনুযায়ী কর, ব্যবসার অনুমোদন, ব্যাংকিং এবং অন্যান্য সরকারি সেবায় পুনরায় ব্যবহার করা গেলে সময় ও প্রশাসনিক ব্যয় কমবে।

এ জন্য প্রয়োজন সরকারি তথ্যভান্ডারগুলোর মধ্যে নিরাপদ সংযোগ। একইসঙ্গে ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। কে কোন তথ্য কখন এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারবে, তার সুস্পষ্ট নিয়ম থাকা জরুরি।

ডিজিটাল ব্যবস্থার আরেকটি বড় সুবিধা হতে পারে সরকারি জবাবদিহি। কোনও অনুমোদনের জন্য যদি সাত কর্মদিবস নির্ধারিত থাকে, তাহলে অনলাইন ব্যবস্থায় আবেদনকারী দেখতে পারবেন তার আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে। একইসঙ্গে সরকারও জানতে পারবে কোন দফতরে কত আবেদন জমে আছে, কতগুলো নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কোথায় নিয়মিত বিলম্ব হচ্ছে। ফলে ডিজিটাল ব্যবস্থা শুধু সেবা দেওয়ার মাধ্যম নয়, প্রশাসনিক দক্ষতা পরিমাপের মাধ্যমও হতে পারে।

সমন্বিত পরিদর্শনও গুরুত্বপূর্ণ। একই কারখানা পরিদর্শনের জন্য বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের দল পৃথক সময়ে গেলে উদ্যোক্তার সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়। প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিদর্শন সমন্বিত করা গেলে পুনরাবৃত্তি কমবে। তবে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, অগ্নিনিরাপত্তা ও শিল্প নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রয়োজনীয় যাচাই বাদ দেওয়া যাবে না। লক্ষ্য হওয়া উচিত মান কমানো নয়, একই মান বজায় রেখে প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করা।

বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও বিষয়টির গুরুত্ব বোঝায়। ২০২৫ সালে দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়ে ১৭৭ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছায়—যা ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ১২৭ কোটি ডলার। এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তপ্রতিষ্ঠান ঋণ থেকে। ফলে শুধু নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়, বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতাও উন্নত করা প্রয়োজন।

‘বাংলাবিজ’-এর সাফল্য তাই কতটি সেবা অনলাইনে আনা হলো, শুধু সেই হিসাব দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে একজন উদ্যোক্তাকে কতবার সরকারি দফতরে যেতে হলো, কতবার একই তথ্য জমা দিতে হলো, অনুমোদনে মোট কত সময় লাগলো এবং কত আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হলো। বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তি তৈরি করা নয়; রাষ্ট্রীয় কাজের পদ্ধতি পুনর্গঠন করা।

একটি কার্যকর ডিজিটাল রাষ্ট্রে উদ্যোক্তা একবার তথ্য দেবেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে, আবেদন কোথায় আছে তা উদ্যোক্তা দেখতে পারবেন, নির্ধারিত সময় অতিক্রম হলে তার কারণ জানা যাবে এবং পুরো প্রক্রিয়ার একটি নির্ভরযোগ্য নথি থাকবে।

সিঙ্গাপুর ও এস্তোনিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, এই পরিবর্তন সম্ভব। বাংলাদেশও এক দরজার সেবার মাধ্যমে সেই যাত্রা শুরু করেছে। এখন প্রয়োজন পোর্টালের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক ধাপ কমানো, তথ্যের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা, সরকারি তথ্যভাণ্ডারের মধ্যে নিরাপদ সংযোগ তৈরি করা এবং প্রতিটি অনুমোদনের জন্য কার্যকর সময়সীমা নিশ্চিত করা।

‘বাংলাবিজ’ তাই কেবল একটি নতুন সরকারি পোর্টাল নয়; সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের বিনিয়োগ প্রশাসনের রূপান্তরের ভিত্তি হতে পারে। এক দরজায় বিনিয়োগসেবা আনা সম্ভব, তবে সেই দরজার পেছনে থাকা রাষ্ট্রের বহু দপ্তরকেও একই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল রাষ্ট্রের সাফল্য ওয়েবসাইটের সৌন্দর্যে নয়, উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতায় প্রকাশ পাবে। একজন বিনিয়োগকারী যদি সত্যিই বলতে পারেন, ‘রাষ্ট্রের কাছে তথ্য আমাকে একবারই দিতে হয়েছে; বাকিটা রাষ্ট্র নিজেই সমন্বয় করেছে’, তখনই এক দরজার সেবা তার প্রকৃত অর্থে সফল হবে। তখন ‘বাংলাবিজ’ একটি পোর্টালের সীমা ছাড়িয়ে বাংলাদেশে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জামায়াত জুলাইকে ধারণ করে না, বিএনপির এমন অভিযোগ হাস্যকর: গোলাম পরওয়ার
জামায়াত জুলাইকে ধারণ করে না, বিএনপির এমন অভিযোগ হাস্যকর: গোলাম পরওয়ার
রংপুরের রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী, ভক্তদের উচ্ছ্বাস
রংপুরের রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী, ভক্তদের উচ্ছ্বাস
‘লুপাস’ রোগে ভুগছেন সেলেনা গোমেজ, বদলে গেছে কণ্ঠ
‘লুপাস’ রোগে ভুগছেন সেলেনা গোমেজ, বদলে গেছে কণ্ঠ
সরকার চায় ঐক্য, কিন্তু একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি : প্রধানমন্ত্রী
সরকার চায় ঐক্য, কিন্তু একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি : প্রধানমন্ত্রী
সর্বশেষ সর্বাধিক