চাকচিক্যময় উন্নয়ন বনাম নগরে মানুষের দৈনন্দিন স্বস্তি 

ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ
২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০

হকার, পোশাকশ্রমিক, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী থেকে শুরু করে ক্লান্ত পথচারী—সবাই মিলে কংক্রিট আর যানজটের এক মহাসমুদ্র পাড়ি দেন প্রতিদিন। সাধারণ মানুষের কাছে এই শহরটি স্রেফ গতির এক চলমান মঞ্চ হলেও, হাজার হাজার মানুষের জন্য, বিশেষ করে নারীর জন্য—এটি এক নীরব ও কঠিন সহনশীলতার পরীক্ষা। যখন জনস্বাস্থ্যকে রাষ্ট্রের এবং সরকারের অগ্রাধিকারের পরিবর্তে নিছক অবহেলার বিষয় হিসেবে দূরে সরিয়ে রাখা হয়, তখন এই শহরটি সাধারণ মানুষের জন্য চরম অসহনীয় হয়ে ওঠে। কোটি কোটি মানুষকে বাধ্য হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শারীরিক কষ্ট সহ্য করতে হয়।

শুধু মৌলিক মর্যাদাটুকু ভাঙা দরজার আড়ালে আটকে থাকায়, কিংবা অর্থের অভাবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায়— তারা মারাত্মক মূত্রনালির সংক্রমণ (ইউটিআই) ও দীর্ঘমেয়াদী কিডনি জটিলতার মতো মরণব্যাধির মুখোমুখি হচ্ছেন। এটি শুধু স্বাস্থ্যগত সংকট নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রকাশ্য লঙ্ঘন। দৈনন্দিন জীবনের এই গভীর দুর্ভোগ মানুষের আত্মবিশ্বাস ও পূর্ণ বিকাশকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দেয়, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং একটি স্বাচ্ছন্দ্যময় নগর জীবনের ন্যূনতম মানবাধিকার কেড়ে নেয়।

নীতি থেকে বাস্তবে: রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ

রাজপথের এই নীরব ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের অবশেষে একটি আইনগত ও প্রশাসনিক মোড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে ‘জাতীয় পাবলিক টয়লেট নীতিমালা ২০২৬’-এর মাধ্যমে—স্যানিটেশনকে কেবল একটি সাধারণ পরিষেবার গণ্ডি থেকে বের করে এনে মানবাধিকার ও জনস্বাস্থ্যের এক অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভে পরিণত করেছে। ঐতিহাসিকভাবে আমাদের জাতীয় স্যানিটেশন কৌশলগুলোতে বাড়ির ভেতরের শৌচাগারকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, দুঃখজনকভাবে নগরীর রাজপথের পাবলিক টয়লেটগুলো তার সিকিভাগও মনোযোগ পায়নি।

২০২৬ সালের এই নতুন নীতিটি একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়নের মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক ব্যবধান ঘুচানোর পথ দেখিয়েছে, যা সব নগর ও জনবহুল এলাকায় পর্যাপ্ত, লিঙ্গ-সংবেদনশীল ও সবার জন্য উন্মুক্ত পাবলিক টয়লেট স্থাপন বাধ্যতামূলক করেছে। রাজপথে চলাচলকারী সবচেয়ে সাধারণ ও দুর্বল মানুষটিকে রাষ্ট্র ও প্রশাসন কতখানি যত্নে আগলে রাখছে—তার ওপরই দেশের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে। এই নীতিটি কেবল একটি কাগজপত্রের দলিল নয়, এটি সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক সুযোগ।

উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মপরিকল্পনায় সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক পদক্ষেপ

ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ এই নীতিকে বাস্তবে রূপ দিতে একটি সুনির্দিষ্ট ওয়াশ (নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি) কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। একটি ব্যাপকভিত্তিক শুমারি থেকে বেরিয়ে এসেছে যে উত্তর সিটি এলাকায় তিন শতাধিক পাবলিক টয়লেট থাকলেও তার একটি ক্ষুদ্র অংশ সরাসরি নাগরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাকিগুলোর বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি ও অদক্ষ হাতের মুঠোয় বন্দি, যেগুলোর বেশিরভাগই বেহাল, তালাবদ্ধ অথবা ড্রেনের সাথে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে সরাসরি অপরিশোধিত বর্জ্য নিষ্কাশন করে পরিবেশ বিষাক্ত করছে।

উত্তর সিটি করপোরেশনের এই নতুন পরিকল্পনাটিতে দুটি অত্যন্ত সাহসী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে— প্রথমত, স্টার রেটিং ও কঠোর পরিচ্ছন্নতার মাপকাঠির সাথে যুক্ত করে বিদ্যমান শৌচাগারগুলোর লিজ ও ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো; দ্বিতীয়ত, সুশৃঙ্খলভাবে নতুন পৌর অবকাঠামোর পরিধি দ্রুত বিস্তার করা। উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চলে উচ্চ ও মধ্যম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।

এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ ও জায়গার তীব্র সংকট রয়েছে এমন এলাকাগুলোতে মোবাইল টয়লেট দ্রুত স্থাপনার কথা ভাবা হয়েছে। পাশাপাশি, বিপণন কেন্দ্র এবং বাজারের মতো জনবহুল স্থানগুলোর শৌচাগারগুলোর ওপর প্রশাসনিক নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও সুশাসনের তাগিদ এরই সমান্তরালে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তাদের হালনাগাদকৃত পাবলিক টয়লেট পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকার মাধ্যমে এই নগর পুনর্জাগরণকে আরও বেগবান করেছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এই রূপরেখাটি বিশেষভাবে আলোকপাত করে শহরের সেই ভাসমান মানুষ এবং দিবালোকের লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষের দুর্দশার ওপর—যারা জীবিকার টানে প্রতিদিন ফুটপাথ, পার্ক, রেলওয়ে স্টেশন ও বাজারে দিন কাটান।

এই নির্দেশিকায় একটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা কাঠামো দাঁড়  করানো হয়েছে—যেখানে শৌচাগার পরিচালনা, আর্থিক স্বচ্ছতা রক্ষা, নারী পরিচারিকা বাধ্যতামূলক করা, চব্বিশ ঘণ্টা পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক মডেলে তাদের জোনভিত্তিক তদারকি কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে দোকানমালিক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকবেন। লিজ নবায়নের শর্ত হিসেবে কঠোর মূল্যায়ন ও নিয়মিত অডিট যুক্ত করার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হয়েছে যে জনগণের করের টাকায় গড়া এই সম্পদ যেন কোনও মধ্যস্বত্বভোগীর পকেট ভারী না করে, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখে।

সহানুভূতির স্থাপত্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর ভাবনা

আধুনিক এই পাবলিক টয়লেটগুলোর স্থাপত্যশৈলী ও নকশায় শৌচাগারকে নিছক একটি অন্ধকার, অস্বাস্থ্যকর ও অবহেলিত ঘর হিসেবে দেখার প্রাচীন ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে স্থান পেয়েছে সর্বজনীন নকশা এবং পরিবেশবান্ধব আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়া। সবগুলোকেই এক একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এগুলোতে সুব্যবস্থা হিসেবে থাকছে হুইলচেয়ার চলাচলের উপযোগী র‍্যাম্প, মজবুত গ্র্যাব বার, ব্রেইল সাইনেজ এবং বয়স্ক, শিশু ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিশেষ চাহিদাপূরণে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা।

নগর জীবনের বাস্তবতায় নারীর চলাচলের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই নীতিমালায় নারী ও কিশোরীদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক, সুরক্ষিত ও নিরাপদ অংশ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মাসিক ব্যবস্থাপনা বা স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন উপকরণ পাওয়ার ব্যবস্থা, প্যাড ভেন্ডিং মেশিন এবং মায়েদের জন্য স্তন্যদানকারী প্রাইভেট কর্নার।

এছাড়া নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ ও বস্তি এলাকার আশপাশে বিশেষ শৌচাগার স্থাপনের মাধ্যমে নারী পোশাকশ্রমিক ও সাধারণ শ্রমিকদের কর্মস্থল ও বাসস্থানের কাছাকাছি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর স্বস্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে।

পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অপরিহার্যতা

বিগত দশকগুলোতে অপরিকল্পিত সেপটিক ট্যাংক এবং অবৈধ সংযোগের কারণে মানববর্জ্য সরাসরি ঢাকার ড্রেন, খাল এবং চারপাশের নদ-নদীতে গিয়ে মিশেছে, যা পুরো নগরীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে।

জাতীয় পাবলিক টয়লেট নীতিমালা এবং স্থানীয় কর্মপরিকল্পনাগুলো বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের কঠোর অনুসরণ, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচল ও সৌরশক্তির ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক পদ্ধতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলার পথ দেখাচ্ছে।

বিশেষায়িত ভ্যাকিউম ট্যাংকারের মাধ্যমে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করে তা আধুনিক শোধনাগারে নিয়ে যাওয়ার এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা নগর স্যানিটেশনকে একটি অদৃশ্য পরিবেশগত হুমকি থেকে রক্ষা করে জনস্বাস্থ্য ও জলাশয় সুরক্ষার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করছে।

নীতিনির্ধারকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান: এখনই সময় পরিবর্তনের

এই দূরদর্শী নীতির সফল ও দৃশ্যমান বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসনের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অংশীদারত্বমূলক কাজের ওপর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তাঁর মন্ত্রিসভা এবং দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশনের মেয়র ও প্রশাসকদের প্রতি আমাদের বিনীত নিবেদন—এই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে কেবল একটি রুটিন ফাইল বা সাধারণ কাজ হিসেবে না দেখে এটিকে একটি ঐতিহাসিক জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করুন। উন্নয়নের চাকচিক্যের চেয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মানবিক কল্যাণকে সবার আগে স্থান দিন।

যখন একটি রাষ্ট্র ও তার নগর কর্তৃপক্ষ রাজধানীর ব্যস্ততম রাস্তার মোড়ে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ শৌচাগার নিশ্চিত করে, তখন তা প্রতিটি নাগরিকের মনে এই বার্তা পৌঁছে দেয়— ‘এই রাষ্ট্রে আপনার নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত, আপনার সম্মান ও মর্যাদার মূল্য রয়েছে।’

বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে; আর এই অগ্রযাত্রাকে প্রকৃত অর্থে অর্থবহ করতে হলে রাজধানীর রাজপথ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জনপদে সাধারণ মানুষের এই মৌলিক ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে অবিলম্বে।

লেখক: একজন উন্নয়ন পেশাজীবী

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনও কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনও কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
দিল্লিতে রাবণ বধ করবেন ইয়ামি, বার্তা দেবেন নারীশক্তির
দিল্লিতে রাবণ বধ করবেন ইয়ামি, বার্তা দেবেন নারীশক্তির
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
সর্বশেষ সর্বাধিক