অপতথ্য এবং গুজবের মহামারি, নির্লিপ্ততার সমাজ

একটি মিথ্যা খবর লিখতে যতটুকু সময় লাগে, তার চেয়ে অনেক বেশি গুণ সময় লাগে সেই খবরের ক্ষত সারাতে। কখনও সেই ক্ষত আর সারেই না। একটি পরিবার স্বজন হারায়, একটি সম্প্রদায় নিরাপত্তাবোধ হারায়, একজন নারী হারান সামাজিক মর্যাদা। অথচ যিনি খবরটি ছড়িয়েছিলেন, তিনি দায় এড়ানোর সুযোগ পান নানানভাবে। আইন প্রয়োগের অভাবে দোষীজনের এই নীর্লিপ্ততা, গুজব এবং অপতথ্যের মহামারিকে দিনের পর দিন যেন নতুন নতুন সংজ্ঞা দ্বারা সংজ্ঞায়িত করছে।

২০১৯ সালের জুলাইয়ে ছেলেধরা গুজবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে অন্তত আটজন মানুষ গণপিটুনিতে নিহত হন বলে পুলিশ জানিয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাসলিমা বেগম রেণু, যাঁকে ঢাকার একটি বিদ্যালয়ের সামনে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা প্রয়োজন—এমন ভিত্তিহীন প্রচার তখন আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। ঘটনাটি দেখিয়েছে, ডিজিটাল পরিসরের সায়েন্স ফিকশনের  মতো অবিশ্বাস্য গল্পও বাস্তবের হত্যাকাণ্ডের পটভূমি তৈরি করতে পারে।

আলোচনার শুরুতে কয়েকটি ধারণা পরিষ্কার করা দরকার। গুজব হলো এমন প্রচলিত দাবি, যার সত্যতা তখনও নিশ্চিত হয়নি; সব গুজব শেষ পর্যন্ত মিথ্যা প্রমাণিত হয় না। ভুল তথ্য কেউ না বুঝেও ছড়াতে পারেন। কিন্তু জেনেশুনে মানুষকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে তথ্য তৈরি বা বিকৃত করলে সেটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য।

আবার সত্য ঘটনার পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার নামে প্রচার করেও মিথ্যা ধারণা তৈরি করা যায়। ফলে প্রতিকারের ক্ষেত্রেও ভুল করা ব্যক্তি, অসতর্ক সংবাদমাধ্যম এবং পরিকল্পিত প্রতারণার সংগঠককে একই পাল্লায় মাপাও যুক্তিসংগত নয়।

বাংলাদেশে রিউমর স্ক্যানার ২০২৩ সালে ১ হাজার ৯১৫টি, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৯১৯টি এবং ২০২৫ সালে ৪ হাজার ১৯৫টি ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। প্রকাশিত সংখ্যাগুলোর সরল হিসাবে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালে শনাক্তের সংখ্যা প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে এগুলো প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণে পাওয়া দাবি; দেশের সব অপতথ্যের পূর্ণাঙ্গ গণনা নয়। পর্যবেক্ষণের পরিধি, কর্মীর সংখ্যা ও যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়লে শনাক্তের সংখ্যাও বাড়তে পারে। এবং এদের অধিকাংশই সরাসরি রাজনৈতিক কিংবা রাজনীতি সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কিত। 

একই প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে রাজনৈতিক বিষয়ে ২ হাজার ২৮১টি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারযুক্ত ৬০৬টি অপতথ্য শনাক্তের কথা রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের পরিচয় ও নকল ফটোকার্ড ব্যবহার করেও শত শত বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়িয়েছে। এখানে উদ্বেগ কেবল সংখ্যার নয়, বিশ্বাসযোগ্যতার মাপকাঠিতেও রয়েছে। পরিচিত সংবাদপত্রের লোগো, টেলিভিশনের পর্দার অনুকরণ কিংবা নেতার কণ্ঠের মতো শোনানো অডিও মানুষকে দ্রুত বিশ্বাস করাতে পারে।

বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবনে এই ঝুঁকির বহু ক্ষেত্র আছে। ধরুন, পুরোনো বন্যার ভিডিও দিয়ে দাবি করা হলো, একটি বাঁধ এইমাত্র ভেঙেছে। আতঙ্কে মানুষ ভুল পথে ছুটতে পারেন। কোনও ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে ভিত্তিহীন বার্তা ছড়ালে আমানতকারীরা অস্থির হয়ে উঠতে পারেন। পরীক্ষার সময়সূচির নকল বিজ্ঞপ্তি শিক্ষার্থীদের বিপদে ফেলতে পারে। ভুয়া নিয়োগপত্র অর্থ হাতিয়ে নিতে পারে বেকার তরুণের কাছ থেকে। এসব উদাহরণ মনে করিয়ে দেয়, তথ্যের নির্ভুলতা মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা ও দৈনন্দিন সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

তবে সব অপতথ্যের সম্ভাব্য ক্ষতি সমান নয়। একজন খেলোয়াড়ের দলবদলের ভুল খবর এবং কোনও ধর্মীয় সম্প্রদায়কে আক্রমণের উসকানিমূলক মিথ্যা একই স্কেলে মোকাবিলা করা যায় না। জীবনহানি, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, চিকিৎসাজনিত বিপদ ও আর্থিক প্রতারণার আশঙ্কাযুক্ত দাবিকে অনেক বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিটি দাবির স্বতন্ত্র যাচাই প্রয়োজন। অতিরঞ্জন প্রতিহত করতে গিয়ে প্রকৃত ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা অস্বীকার করাও গুরুতর অন্যায়।

গুজবের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি হয় অনেক সময় তথ্যের শূন্যতার কারণে। কোনও ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ নীরব থাকলে, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিলে কিংবা দৃশ্যমান প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে মানুষ বিকল্প ব্যাখ্যা খোঁজেন। সেই ব্যাখ্যা নির্ভরযোগ্য না হলেও পরিচিত কারও কাছ থেকে এলে গ্রহণযোগ্য মনে হয়। আবার দলীয় আনুগত্যের কারণে নিজের পক্ষের সুবিধাজনক দাবির ক্ষেত্রে আমাদের সংশয় কমে যায়। প্রতিপক্ষ সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু শুনলে প্রমাণের প্রয়োজন যেন আরও কম অনুভূত হয়। তাই তথ্য সাক্ষরতার সঙ্গে নিজের পক্ষপাত শনাক্ত করার শিক্ষাও প্রয়োজন।

নির্লিপ্ততারও বিভিন্ন চেহারা রয়েছে। কেউ ভাবেন, প্রতিবাদ করে ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। কেউ মনে করেন, নিজের রাজনৈতিক পক্ষ লাভবান হলে সামান্য অসত্য সহ্য করা যায়। কেউ আবার এত পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেখেন যে, শেষ পর্যন্ত বলেন, ‘কাউকেই বিশ্বাস করি না।’ এই সর্বব্যাপী অবিশ্বাস বিশেষ বিপজ্জনক। তখন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও বানানো পোস্ট, গবেষণা ও মনগড়া ব্যাখ্যা একই কাতারে দাঁড়ায়। মানুষ যখন সত্য যাচাইয়ের চেষ্টাই ছেড়ে দেন, তখন সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ ও সংগঠিত প্রচারক সুবিধা পান।

তবে সাধারণ নাগরিকের নীরবতাকে সব সময় নৈতিক ব্যর্থতা বলা অন্যায্য। প্রকাশ্যে ভুল ধরিয়ে দিলে অনলাইন আক্রমণ, সামাজিক বিরোধ কিংবা নিরাপত্তার ঝুঁকি হতে পারে। বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু ও

স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা বিবেচনা জরুরি। দায়িত্বশীল আচরণ মানেই সবাইকে প্রকাশ্য বিতর্কে নামতে হবে, এমন নয়। যাচাইহীন পোস্ট না ছড়ানো, নিরাপদে অভিযোগ জানানো, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সহায়তা করা এবং বিশ্বাসযোগ্য সংশোধনী পৌঁছে দেওয়াও কার্যকর নাগরিক ভূমিকা।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই ব্যক্তিগত দায়িত্বের চেয়ে অনেক বড়। বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগও হয়েছে। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের ‘বাংলাফ্যাক্ট’ বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর দাবি যাচাই করছে; রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসেও ফ্যাক্টচেক প্রকাশিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগ কাজে আসতে পারে, যদি যাচাইয়ের পদ্ধতি, ব্যবহৃত প্রমাণ ও সংশোধনের সুযোগ উন্মুক্ত থাকে। সরকারি বক্তব্য যাচাইয়ের বাইরে থাকবে—এমন ব্যবস্থা আস্থা তৈরি করতে পারে না। সরকারপক্ষের ভুল এবং সরকারবিরোধী ভুলের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগই বিশ্বাসযোগ্যতার প্রকৃত ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

আইনি ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর পর সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩; এরপর সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ এসেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের তালিকায় ২০২৬ সালের সংশোধনী আইনও রয়েছে। অতএব, আলোচনা শুধু পুরোনো আইনে আটকে রাখা ঠিক হবে না। কিন্তু নাম ও বিধান পরিবর্তনের পাশাপাশি দেখতে হবে প্রয়োগের ফল: মানুষ কি প্রতারণা ও সহিংসতা থেকে সুরক্ষা পাচ্ছেন, সাংবাদিক কি নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারছেন, ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার মিলছে কি?

আবার সমালোচনা, ব্যঙ্গ, অজনপ্রিয় মতামত কিংবা সদিচ্ছাপ্রসূত ভুলকে পরিকল্পিত প্রতারণার সঙ্গে মেলানো যাবে না। সহিংসতায় উসকানি ও অপরাধের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ প্রয়োজন; তবে অপরাধের সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট, ব্যবস্থা আনুপাতিক এবং সিদ্ধান্ত পর্যালোচনাযোগ্য হতে হবে। ‘গুজব দমন’ কথাটি যেন ক্ষমতাবানকে অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকে রক্ষার ঢাল না হয়।

সবাইকে মিডিয়া লিটারেসি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের প্রেক্ষাপটে নিতে হবে সরকারকে| ফিনল্যান্ডের জাতীয় গণমাধ্যমশিক্ষা নীতি তথ্য বোঝা ও বিচার করার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের জন্য এর শিক্ষা হলো, কেবল প্রযুক্তি ব্যবহার শেখালেই নাগরিক প্রস্তুত হন না। বিদ্যালয়ের পাঠে বিজ্ঞাপনের কৌশল, ছবির প্রেক্ষাপট, তথ্যের উৎস এবং সংখ্যার ব্যাখ্যা যুক্ত করা যায়। শিক্ষার্থীকে একটি দাবি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে— কে বলছেন, কী প্রমাণ দিচ্ছেন, অন্য স্বাধীন উৎসে কি পাওয়া যাচ্ছে? পরীক্ষার মুখস্থ উত্তরের বাইরে এ ধরনের অনুশীলন দরকার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ঝুঁকি মূল্যায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৫ সালে অপতথ্যবিষয়ক স্বেচ্ছামূলক আচরণবিধিকেও এর কাঠামোয় যুক্ত করা হয়। 

উন্নয়নশীল বিশ্বের উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিল প্রাসঙ্গিক। দেশটির নির্বাচনি আদালত ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারে ডিপফেক নিষিদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি নির্দিষ্ট প্রচারসামগ্রী শনাক্তযোগ্য করার বিধান নেয়। অপতথ্য মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্ল্যাটফর্মের সহযোগিতার ব্যবস্থাও করা হয়। বাংলাদেশের জন্য নির্বাচনকেন্দ্রিক স্পষ্ট বিধি, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং প্রচারের উৎস প্রকাশের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলাদেশে কার্যকর উদ্যোগের শুরু হতে পারে সময়মতো তথ্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে। দুর্ঘটনা, সংঘাত, রোগের প্রাদুর্ভাব কিংবা পরীক্ষাসংক্রান্ত বিভ্রান্তির ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান দ্রুত জানাবে— কী নিশ্চিত, কী এখনও অজানা এবং পরবর্তী হালনাগাদ কখন পাওয়া যাবে। অসম্পূর্ণ তথ্যকে সম্পূর্ণ বলে উপস্থাপন করার চেয়ে সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা বিশ্বাসযোগ্য। একটি সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক বক্তব্যের পর নিয়মিত হালনাগাদ, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের সংযোগ এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। তথ্যের শূন্যতা দীর্ঘায়িত করে পরে নাগরিককে গুজবে বিশ্বাস করার জন্য দোষারোপ করা চলে না।

এর সঙ্গে প্রয়োজন স্বাধীন তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়ানো। বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে বাংলা ভাষার ছবি, ভিডিও এবং অডিও যাচাইয়ের প্রশিক্ষণ দিতে পারে। সহায়তার অর্থ কে দিচ্ছেন, কোন দাবি যাচাইয়ের জন্য বেছে নেওয়া হচ্ছে এবং ভুল হলে কীভাবে সংশোধন করা হচ্ছে—এসব প্রকাশ্য থাকা জরুরি। সরকারি অর্থায়ন থাকলেও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখার প্রয়োজন নেই; তাদের কাজও একই প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়নের আওতায় থাকবে।

গণমাধ্যমের দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানা গেছে’ কোনও দাবির সত্যতার নিশ্চয়তা নয়। উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম দেওয়ার আগে মূল উৎস, সময়, স্থান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। ভুল প্রকাশিত হলে নীরবে মুছে ফেলাই যথেষ্ট নয়; সংশোধনটি পাঠকের চোখে পড়তে হবে। সংবাদমাধ্যমের পরিচয় নকল করে প্রচার ঠেকাতে প্রতিটি ফটোকার্ডে মূল প্রতিবেদন সহজে যাচাইযোগ্য সংযোগ রাখা যেতে পারে। দ্রুত প্রকাশের প্রতিযোগিতায় নির্ভুলতা হারালে সংবাদমাধ্যম নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—আস্থা ক্ষয় করে।

রাজনৈতিক দলগুলোকেও সুস্পষ্ট দায় নিতে হবে। নিজেদের আনুষ্ঠানিক পেজ ও প্রচারদলের জন্য যাচাইয়ের নিয়ম, প্রকাশ্য সংশোধননীতি এবং নকল পরিচয়ে প্রচার না করার অঙ্গীকার প্রয়োজন। বিরোধীপক্ষের অপতথ্যে ক্ষুব্ধ হওয়া অথচ নিজের সমর্থকের অপপ্রচারে নীরব থাকা দায়িত্বশীল রাজনীতি নয়। নির্বাচনি জরিপ প্রকাশের ক্ষেত্রেও নমুনা, তথ্য সংগ্রহের সময়, পদ্ধতি ও অর্থায়ন জানাতে হবে। বৈজ্ঞানিক জরিপ এবং উন্মুক্ত অনলাইন ভোটের পার্থক্য স্পষ্ট না করলে সংখ্যার পোশাকে জনমত বিকৃত হওয়ার সুযোগ থাকে।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে বাংলাদেশের দাবি হওয়া উচিত বাংলা ভাষায় দক্ষ পর্যালোচক, স্থানীয় পরিস্থিতি বোঝার সক্ষমতা এবং জরুরি অভিযোগে দ্রুত সাড়া। পাশাপাশি অপসারণের কারণ, ভুল সিদ্ধান্তের হার ও আপিলের ফল প্রকাশ করা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সন্দেহজনক উপাদান শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু তার সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রযুক্তিগত পরীক্ষার সঙ্গে মূল কাগজপত্র, প্রত্যক্ষ তথ্য ও মানবিক বিচার যুক্ত করতে হবে। অন্যথায় ব্যঙ্গ, আঞ্চলিক ভাষা বা প্রকৃত ঘটনার কাগজপত্রও ভুলভাবে চিহ্নিত হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে তথ্য সাক্ষরতা পৌঁছাতে হবে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও। শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় সাংবাদিক এবং পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের উপযোগী প্রশিক্ষণ দরকার। বাস্তব উদাহরণ দিয়ে শেখানো যেতে পারে কীভাবে পুরোনো ছবি নতুন নামে আসে, কীভাবে নকল ওয়েবসাইট আসলের মতো দেখায় এবং আবেগ উসকে দিয়ে দ্রুত শেয়ার করতে বলা হয়। 

এসব উদ্যোগের ফলও মাপতে হবে। কতটি কর্মশালা হলো কিংবা কতটি পোস্ট সরানো হলো, তার পাশাপাশি দেখতে হবে ক্ষতিকর দাবি কত মানুষের কাছে পৌঁছাল, সংশোধনী পৌঁছাতে কত সময় লাগলো এবং আক্রান্ত ব্যক্তি কত দ্রুত সহায়তা পেলেন। নিয়মিত প্রতিনিধিত্বশীল জরিপে মানুষের যাচাইয়ের অভ্যাস ও তথ্যের ওপর আস্থা বোঝা যেতে পারে। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের শনাক্ত তালিকা গুরুত্বপূর্ণ সূচক, কিন্তু তা দিয়ে পুরো জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস বা আচরণ নির্ধারণ করা যাবে না। নীতির সাফল্য ঘোষণা করতে হলে

মূল্যায়নের পদ্ধতিও প্রকাশ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত গুজবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ একটি সামাজিক চুক্তির বিষয়। রাষ্ট্র সময়মতো সত্য জানাবে এবং নিজের ভুল স্বীকার করবে, সংবাদমাধ্যম যাচাই করবে, রাজনৈতিক দল অসত্যের সুবিধা নেওয়া থেকে বিরত থাকবে, প্ল্যাটফর্ম ক্ষতিকর প্রচারের দায় নেবে, নাগরিক শেয়ার করার আগে থামবেন। এই দায়িত্বগুলোর কোনও একটি অনুপস্থিত থাকলে অন্যগুলোর শক্তিও কমে যায়। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সাহস প্রয়োজন, কিন্তু সেই সাহসের নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়ও প্রয়োজন। একটি সমাজের পরিণতি শুধু কত মানুষ

মিথ্যা বলছেন, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না— কত মানুষ সত্য জানার চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছেন, তা দিয়েও হতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড স্ট্যাটিস্টিক্স অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়