নিরাপত্তাহীনতার কারণে সহিংসতা মেনে নেওয়ার প্রবণতা খুবই বিপজ্জনক 

রবীন্দ্রনাথ, লালন, হাসনরাজা থেকে শুরু করে রাধারমণের গানও বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে এই বাংলার মাটিতে। চরম এক বৈরী ও অসহিষ্ণুতার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের শিল্প-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সুনামগঞ্জে রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থল এলাকায় গানবাজনা বন্ধের দাবিতে একটি সংগঠন উপজেলা প্রশাসনের কাছেও লিখিত আবেদন করেছে। তারা এই সংগীতানুষ্ঠানকে তাদের ভাষায় ‘অনৈসলামিক’ আখ্যা দিয়ে কবরস্থানের পবিত্রতা ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তি দেখিয়েছে।

কয়েকদিন আগে একই অঞ্চলে আরও দুটি ঘটনা ঘটেছে। নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণসহ একটি বাউল গানের আসর বন্ধের দাবি উঠেছিল। ‘ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’র বাধার মুখে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বাতিল করা হয়।

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এইভাবে অযৌক্তিক কিছু ইস্যু তুলে ধরে ঐতিহ্যবাহী সব চর্চা বন্ধের দাবি দিন দিন বাড়ছেই। সেইসাথে বাড়ছে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে মারা, বসতবাড়ি ভাঙচুর করার মতো ঘটনা। এই অক্টোবর মাসেই সুনামগঞ্জে কৃপেশ রায় নামে এক যুবককে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। রংপুরের পীরগঞ্জে একই অভিযোগকে হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

এর কিছুদিন আগে সাতক্ষীরার দেবহাটায় এক ব্যক্তি ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হন। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও একদল লোক হাসপাতালে ঢুকে তাঁকে আবার মারধর করে এবং তাঁর মৃত্যু হয়।

এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কিশোরগঞ্জের কনসার্ট এবং সিলেটের নৌকাবাইচে বাধা দেওয়া, উৎসব ও শিল্পচর্চার ওপর নিয়ন্ত্রণ, এবং কিশোরী ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতে না দেওয়ার যে ঘটনা ঘটেছে, এগুলোর মধ্যেও সম্পৃক্ততা আছে।

তবে মব সহিংসতার পেছনে কেবল ধর্ম অবমাননার অভিযোগ নয়— চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণের অভিযোগ, ব্যক্তিগত বিরোধ এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের মতো নানা কারণও আছে। অভিযোগ উঠেছে এগুলোর নামে উসকানি, গণপিটুনি, বাড়িঘর ভাঙচুরের মতো ঘটনা যে হারে বাড়ছে, তা দমণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা সেভাবে সক্রিয় নয়।

অনুভব করছি ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সহিংসতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে না দেওয়া, নারীর প্রতি সহিংসতা ও নিয়ন্ত্রণ এবং মব সন্ত্রাসের মতো অপরাধগুলো সব একসূত্রে গাঁথা। আপাতদৃষ্টিতে আলাদা হলেও এগুলোর পেছনে কিছু অভিন্ন সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া কাজ করছে।

এই অভিন্ন সূত্র হলো অন্যের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, ভিন্নমত ও ভিন্ন পরিচয়ের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষ করছি সহিংসতার শিকার ব্যক্তির কথা শোনা হচ্ছে না বা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ধর্ম অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক কর্মী, সহিংসতার শিকার নারী; কেউই নিজেদের পক্ষে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না।

প্রতিনিয়ত অন্য মানুষের শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। নারীর পোশাক, চলাফেরা, শিক্ষা, কাজ বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা কাজ করছে।

কাউকে আক্রমণ করার সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারকেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাঁর বক্তব্য মূল্যহীন হয়ে পড়ে, বরং সহিংস জনতাকেই আশকারা দেওয়া হয়। এইভাবেই দেশে মব সন্ত্রাস কায়েম হচ্ছে। কিছু মানুষ, ‘তৌহিদি জনতা’ নামে এই মব সন্ত্রাসকে ‘কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা’র একটি সহিংস পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করছে। এরা দেশের আইন-আদালতকে তোয়াক্কা না করে, এবং নিজেদের প্রয়োজনে, নিজেদেরকে বিচারক ও শাস্তিদাতা হিসেবে দাঁড় করছে।

হয়তো সব ঘটনার কারণ এক নয়, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরাও এক নয়, কিন্তু সবার মধ্যে যে, প্রায় একইধরনের নেতিবাচক চিন্তা বা স্বার্থ কাজ করছে, তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। এখানে ধর্মীয় উগ্রবাদ, পিতৃতন্ত্র, রাজনৈতিক স্বার্থ, স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, গুজব, সোশ্যাল মিডিয়ার কুপ্রভাব বা মিথ্যাচার এবং বিচারহীনতা ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায়, ভিন্ন মাত্রায় ভূমিকা রাখছে।

প্রথমেই মব সন্ত্রাসের কথা বলি, কারণ এর সঙ্গে বাকি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণগুলো জড়িত। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে মব সহিংসতায় ১৭১ জন নিহত হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এই তথ্য সরকারের দেওয়া তথ্যের চেয়ে চারগুণেরও বেশি। মব সহিংসতার প্রতিটি ঘটনা মূলত ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি ও জনতাকে সংগঠিত করার মাধ্যমে।

এক শ্রেণির মানুষ ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক শালীনতার ব্যাখ্যাকে ব্যবহার করে অন্যের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। অন্যভাবে বলা যায়, তারা তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করার চেষ্টা করছে। এরা এই সমাজের অন্য সবাইকে তাদের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করতে চায়, একেই বলে পরিবারিক ও সামাজিক কর্তৃত্ববাদ।

এই নিয়ন্ত্রণ মূলত হয়, নৈতিকতার নামে নিয়ন্ত্রণ। যখন কোনও ব্যক্তি ধর্মীয় বিশ্বাস বা রক্ষণশীল আচরণ নিজের জীবনে পালন করেন, তখন সেটা সমস্যা হয় না, কারণ তখন কেউ সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েন না। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের বিশ্বাস অন্যের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চায় এবং তা প্রতিষ্ঠার জন্য হুমকি বা সহিংস আচরণ করে। যা এখন দেশে অহরহ ঘটছে।

যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তা শুধু ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কারণে ঘটছে, তা নয়, ঘটছে নানাধরণের অসহিষ্ণুতা থেকে। একজন নারী নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কিনা, নারী কেমন পোশাক পরবেন, মানুষ কার গান শুনবেন, কোথায় বেড়াতে যাবেন, কিভাবে আনন্দ করবেন, একজন শিল্পী গান গাইতে পারবেন কিনা, বা কেউ নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করতে পারবেন কিনা ইত্যাদিপ্রতিটি ক্ষেত্রেই চরম অসহিষ্ণু আচরণ লক্ষ করছি।

সবচেয়ে ভয়াবহ প্রবণতা হচ্ছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনের হাতে তুলে না দিয়ে নিজেরা তাঁর বিচারের ভার গ্রহণ করা। এমনকি আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতেও রাজি নয় এই মব বা তৌহিদী জনতা।

এক কথায় বলা যায়, ধর্ম অবমাননা থেকে গণপিটুনি, নারীর প্রতি বিদ্বেষ থেকে নারী নির্যাতন, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড দমন, অন্য ধর্মের প্রতি বিষোদগার, উসকানি, ব্যক্তিগত বিরোধের অভিযোগ তুলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপেক্ষাকৃত নীরব ভূমিকা— সবই কিছু উগ্রবাদী মানুষের অসহিষ্ণুতা ও নিয়ন্ত্রণমূলক মনোভাবের প্রকাশ।

এসব ঘটনার মধ্যে কিছু উদ্বেগজনক মিল রয়েছে। যেমন- অন্যের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, নিজের বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য মানদ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া, মত ও পথের ভিন্নতাকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা এবং আইনের পরিবর্তে গোষ্ঠীগত শক্তিকে ব্যবহার করা।

এখানে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের কোনও বোধ কাজ করে না। শুধু ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা, নিয়ন্ত্রণ, ও সহিংসতার মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাকে বোঝায়। যেকোনও একটি অভিযোগ এনে নেতিবাচক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করাই যেন এই দুষ্কৃতকারীদের উদ্দেশ্য।

গোষ্ঠীটি বিভিন্ন কিছুর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, আপত্তি জানিয়ে, হুমকি দিয়ে বা হামলা করে চরম নিরাপত্তাহীন পরিবেশ তৈরি করে। এরা এমন পরিবেশ তৈরি করে, যেন মানুষ প্রতিবাদ জানানোর সাহস না পায়। মানুষের মধ্যে যেন একধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক নীরবতা বা মেনে নেয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়।

আমাদের জন্য উদ্বেগজনক ব্যাপারটি হলো, মানুষ কখনও কখনও এইসব ক্ষতিকর আচরণকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে যুক্তি দাঁড় করাতে পারে বা যুক্তি দাঁড় করায়। ধরেই নেয়া হয়, যখন একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী কোনও ধর্ম, ব্যক্তি, নারীর আচরণ, শিল্প, গান, লেখা, খেলা, উৎসব বা সাহিত্য নিয়ে বিরোধিতা করছে, তাহলে হয়তো এর কোনও কার্যকরণ আছে।

এই ক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে না দেখে, সমাজ রক্ষার দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা। তখন সহিংসতার শিকার মানুষটিকে অপরাধী, বিপজ্জনক বা সমাজের শত্রু হিসেবে দেখানো হতে পারে। ফলে তাঁর প্রতি অন্যান্য সাধারণ মানুষের সহানুভূতি কমে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি হয় বা কমার আশংকা আছে।

আমরা দেখছি, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হত্যা, ভাঙচুর, বিভিন্ন কারণে গণপিটুনি, নারীর ওপর শাস্তিমূলক নির্যাতন কিংবা শিল্প- সংস্কৃতির বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাজে যুক্তি দেখানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন না বা করতে পারছেন না। তাঁরা যে সবকিছু মেনে নিয়েছেন—এমনও নয়, কিন্তু নিজের বা পরিবারের নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক সহিংসতা মেনে নিতে বাধ্য হন; আর এটাই একটি সমাজ ও দেশের জন্য বিপজ্জনক।

শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক