ধানের ক্ষেতে মিথেন নিঃসরণ কমাতে বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশ: সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

রিয়াজ আহমেদ
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০

গত সপ্তাহে ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। আমার বিশ্বাস, দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ, ওই দিন বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে মিথেন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে, যার অন্যতম লক্ষ্য কৃষি খাত থেকে নির্গত মিথেনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে আনা।

জাতিসংঘের পরবর্তী জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই সম্মেলনের আগে বাংলাদেশের এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের (জিএইচজি) নিঃসরণ কমাতে নিজেদের অঙ্গীকার ও বাস্তব পদক্ষেপের প্রমাণ নিয়ে বৈশ্বিক মঞ্চে হাজির হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অ্যাকসেলার’ (অ্যাকসেলারেটিং স্কেলিং অব লো-এমিশনস রাইস ইন সাউথইস্ট এশিয়া) উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো—মিথেন নিঃসরণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে দেশগুলোকে সহায়তা করা।

উপযোগিতা নির্ধারণে মানচিত্র তৈরি, কার্যকর পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, দূর অনুধাবন প্রযুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সমন্বয়ে পরিচালিত এই কর্মসূচি থেকে ইতোমধ্যে এশিয়ার বেশ কয়েকটি প্রধান ধান উৎপাদনকারী দেশ উপকৃত হচ্ছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে— থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো বাংলাদেশ। লক্ষ্য, দেশের ধানক্ষেত থেকে সৃষ্ট জলবায়ু দূষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা।

চ্যালেঞ্জের ব্যাপ্তি

বাংলাদেশের মোট আবাদি জমির প্রায় তিন-চতুর্থাংশজুড়ে রয়েছে ধানের চাষ। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের জীবিকার সঙ্গে এই ফসলের সম্পর্ক গভীর।

সেচনির্ভর বোরো ধান দেশের সবচেয়ে উৎপাদনশীল কৃষিব্যবস্থা। ডিসেম্বর থেকে মে মাসের মধ্যে দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে এই মৌসুম থেকে। তবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা এবং জমিতে দীর্ঘ সময় পানি ধরে রাখার কারণে এই চাষাবাদ মিথেন নিঃসরণের অন্যতম বড় উৎস হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে ধান চাষ থেকে বছরে আনুমানিক ৩২ দশমিক ৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য (এমটি সিওটু-ই) মিথেন নিঃসরণ হয়। দেশের মিথেন নিঃসরণের অন্যতম প্রধান উৎস এই ধান চাষ।

পরিমাণটি কতটা বড়, তা বোঝাতে কয়েকটি তুলনা করা যেতে পারে। ৩২ দশমিক ৪ এমটি সিওটু-ই প্রায় ৭৭ লাখ পেট্রলচালিত যাত্রীবাহী গাড়ির এক বছরের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের সমান। অথবা ৬৩ লাখ পরিবারের এক বছরের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমপরিমাণ। কিংবা ১০ বছর ধরে বেড়ে ওঠা ৫৩ কোটি ৫০ লাখ গাছের চারা যে পরিমাণ কার্বন শোষণ করতে পারে, তার সমান।

মিথেন অত্যন্ত শক্তিশালী একটি দূষক গ্যাস। ২০ বছর মেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে এর ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় ৮৬ গুণ বেশি। ফলে মিথেন নিঃসরণ কমাতে পারলে বিপর্যয়কর জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ঠেকাতে বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব।

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রায় ৩০ শতাংশের জন্য দায়ী মিথেন। এ ছাড়া এই গ্যাস ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি ওজোন তৈরিতে ভূমিকা রাখে, যা মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির গতি কমানোর সবচেয়ে দ্রুত ও কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো মিথেন নিঃসরণ হ্রাস।

পুরোনো চাষাবাদ পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসা

ধানক্ষেতে মিথেন নিঃসরণের প্রধান কারণ হলো জমিতে দীর্ঘ সময় ধরে সেচের পানি জমিয়ে রাখা। কয়েক দশক ধরে সেচের পানি সরবরাহে খাল খনন এবং গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পানি সরবরাহের মতো উদ্যোগ কৃষকদের এমন চাষাবাদে অভ্যস্ত করেছে, যেখানে জমি দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। শুষ্ক বোরো মৌসুমে এভাবে জমিতে সারাক্ষণ পানি ধরে রাখার পরিবেশগত মূল্য এখন চোকাতে হচ্ছে।

বর্তমানে এই কৃষিব্যবস্থা একাধিক সংকটের মুখে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নামছে, সেচের ব্যয় বাড়ছে, জ্বালানি ব্যবহার বেড়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও তীব্র হচ্ছে।

তবে এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার বাস্তবসম্মত উপায় রয়েছে। পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানোর পদ্ধতি (অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং-এডব্লিউডি), সার গভীরে প্রয়োগের মতো উন্নত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, সরাসরি বীজ বপন পদ্ধতি (ডাইরেক্ট সিডেড রাইস-ডিএসআর) এবং স্বল্পমেয়াদি জীবনকালসম্পন্ন ধানের জাত ব্যবহার করে মিথেন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

এসব পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো জমিতে দীর্ঘ সময় অক্সিজেনশূন্য পরিবেশ তৈরি হতে না দেওয়া। কারণ, এমন পরিবেশেই মিথেন উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম বাড়ে।

এডব্লিউডি পদ্ধতিতে জমি সব সময় পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয় না। নির্দিষ্ট সময় পরপর জমির পানি শুকিয়ে মাটিকে বাতাসের সংস্পর্শে আসার সুযোগ দেওয়া হয়। এতে মাটিতে অক্সিজেন প্রবেশ করে এবং মিথেন উৎপাদন কমে আসে। একই সঙ্গে ক্রমেই নিঃশেষ হয়ে আসা ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারও সাশ্রয় হয়।

তথ্য, প্রযুক্তি ও সামনে এগোনোর পথ

একসময় মিথেন নিঃসরণ পরিমাপ করা কঠিন ছিল। ফলে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও সরকারের জন্য সহজ ছিল না। বর্তমানে উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তির কারণে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। এসব প্রযুক্তি নিঃসরণের উৎস আরও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সহায়তা করছে এবং তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়াচ্ছে।

মিথেন নিঃসরণের প্রায় ৬০ শতাংশই মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে আসে। তাই নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে উন্মুক্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের সুযোগ থাকা জরুরি।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইআরআরআই) সম্প্রতি ঢাকায় সরকারি সংস্থা, গবেষক ও উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়ে একটি সভার আয়োজন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল কৃষি খাতের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ পরিমাপ, প্রতিবেদন তৈরি এবং যাচাইয়ের (এমআরভি) ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানো।

বাংলাদেশে আইআরআরআইয়ের কার্যক্রমের দীর্ঘদিনের প্রধান ড. হুমনাথ ভান্ডারি ডিজিটাল এমআরভিকে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের একটি সম্ভাবনাময়, সাশ্রয়ী ও নির্ভুল পদ্ধতি হিসেবে তুলে ধরেছেন। কোন এলাকার কতজন কৃষক কম মিথেন নিঃসরণকারী প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন, তা মানচিত্রের মাধ্যমে চিহ্নিত করা গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারবে।

প্রতিবেশীদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ

এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কাজে আসতে পারে। ঢাকার অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে আইআরআরআইয়ের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন দলের প্রধান এবং থাইল্যান্ডে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা ড. বিয়র্ন ওলে স্যান্ডার তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

তিনি জানান, থাইল্যান্ডের ছয়টি প্রদেশের এক লাখ হেক্টর জমিতে কম নিঃসরণকারী ধান উৎপাদন পদ্ধতিতে কৃষকদের যুক্ত করতে আইআরআরআই সহায়তা করেছে। এর ফলে দেশটির লাখ লাখ কৃষক এই পদ্ধতিতে ধান উৎপাদনের সুযোগ পেয়েছেন।

থাইল্যান্ড ধান রফতানিকারক দেশ হলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশকে প্রায়ই চাল আমদানি করতে হয়। এর পেছনে রয়েছে মাথাপিছু চালের উচ্চ ব্যবহার এবং প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ মানুষের জনসংখ্যা বৃদ্ধি। বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানির কারণে এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

বিজ্ঞানভিত্তিক, স্বচ্ছ ও কম নিঃসরণকারী কৃষিপদ্ধতির বিস্তার এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়। দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করতে এটি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

অ্যাকসেলার উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশের সামনে বেশ কিছু সম্ভাবনা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশের অঙ্গীকারের প্রমাণ দেওয়া সম্ভব হবে। জাতীয় মিথেন নিঃসরণ হ্রাসের রূপরেখা বাস্তবায়নে অগ্রগতি আসবে। কৃষিতে পানির ব্যবহার আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করা যাবে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

পাশাপাশি জলবায়ু তহবিল পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এই অর্থ কৃষকদের উদীয়মান বৈশ্বিক কার্বন বাজারে অংশগ্রহণে সহায়তা করতে পারে।

পরিচ্ছন্ন কৃষিপদ্ধতিতে রূপান্তরের সুফল দেশের শহরগুলোর বসবাসযোগ্যতা বাড়ানো এবং আরও সুস্থ ও দুর্যোগসহনশীল জনপদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি রয়েছে, উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাঠামোও তৈরি হয়েছে। সময়টিও অনুকূলে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিশ্চিত করা, যাতে এসব পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি গবেষণাগারের গণ্ডি পেরিয়ে কৃষকের মাঠে পৌঁছাতে পারে।

রিয়াজ আহমেদ: ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ময়মনসিংহ বোর্ডে ১৯ প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস, ব্যবস্থা নেবে বোর্ড
ময়মনসিংহ বোর্ডে ১৯ প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস, ব্যবস্থা নেবে বোর্ড
উইকেট ফেলতে পারছে না বাংলাদেশ
উইকেট ফেলতে পারছে না বাংলাদেশ
২০০ কোটির প্রতারণা মামলা, আদালতে তলব নোরা ফাতেহিকে
২০০ কোটির প্রতারণা মামলা, আদালতে তলব নোরা ফাতেহিকে
১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাস, জিপিএ-৫ ও কমেছে চট্টগ্রাম বোর্ডে
১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাস, জিপিএ-৫ ও কমেছে চট্টগ্রাম বোর্ডে
সর্বশেষ সর্বাধিক