আওয়ামী লীগকে নিয়ে জামায়াত-বিএনপির টানাহেঁচড়া

সাবির মুস্তাফা
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৪৪ আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৪৪

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার স্বঘোষিত দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগ নিয়ে আলোচনা ততই বেড়ে চলেছে। যে আওয়ামী লীগ ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হয়ে গেছে বলে ক্ষমতাসীনরা ঘোষণা দিয়েছেন, সেই দল নিয়েই এখন তারা টানা-হেঁচড়া শুরু করেছেন। এক দিকে বিএনপি অভিযোগ করছে জামায়াত ইসলামী ক্ষমতাচ্যুত লীগের সাথে আঁতাত করছে; অন্যদিকে, জামায়াত পাল্টা অভিযোগ করছে যে, বিএনপি আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার পাঁয়তারা করছে।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ২০২৫ সালে এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করলেও, দলকে ঘিরে, বিশেষ করে শেখ হাসিনা নিয়ে আলোচনা কখনোই থেমে যায়নি। ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া হলেও, তাদের সমর্থকরা কাকে ভোট দেবে, কেন দেবে বা আদৌ দেবে কিনা, এসব নিয়ে আলোচনায় মাঠ গরম থাকতো।

এমনকি ভোট গ্রহণের পরেও সেই আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচনে জয়ী বিএনপির নেতারা বলতে পছন্দ করেন যে, আওয়ামী লীগের সমর্থকরা জামায়াতকে ভোট দিয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে, অনেক আসনে জামায়াত প্রার্থীকে আটকানোর জন্য আওয়ামী ঘারানার লোকজন বিএনপিকে ভোট দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ নিয়ে পারস্পরিক আঙ্গুল উঁচানোর সর্ব সাম্প্রতিক অধ্যায়ের সূচনা করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অক্টোবর মাসের ১৯ তারিখ রাজশাহীতে এক জনসভায় তিনি নাম না উল্লেখ করে জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাথে যোগসাজশে কাজ করার অভিযোগ আনেন।

“পরিষ্কার গোয়েন্দাদের খবর আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে, তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে।এই অর্থ সরবরাহ করে কাদের সাহায্য করছে? এই যে কতগুলা লোক আছে, একটি দল আছে, যারা ভ্রান্তি ছড়ায় দেশের মধ্যে। যারা বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল নির্বাচনের আগে জনগণের মাঝে, মিথ্যা কথা বলে। এই দুই পক্ষ এক হয়েছে, তারেক রহমান বলেন।

‘স্বৈরাচার’ আর ‘টিকিট বিক্রেতা’

বলাই বাহুল্য, প্রধানমন্ত্রী ‘স্বৈরাচার’ বলতে আওয়ামী লীগ, আর নির্বাচনের আগে ‘টিকিট বিক্রি’ করা দল বলতে জামায়াতে ইসলামীকে বুঝিয়েছেন। জামায়াত এই অভিযোগ শুধু প্রত্যাখ্যানই করেনি, তারা উল্টো অভিযোগ করেছে যে, বিএনপি আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করেই ক্ষমতায় এসেছে। তবে এখানে বলে নেওয়া ভাল যে, বিএনপি সরকারের আট মাস পার হলেও, আওয়ামী লীগের সাথে তাদের এই কথিত সমঝোতার কোনও ফলাফল এখনো দেখা যাচ্ছে না।

এই দুই দলের কথায় যে বিশাল শূন্যতা আছে, তা সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে ঘাটা-ঘাঁটি করলেই  বোঝা যাবে। এই দুই দলই নিজেদের ২০২৪ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনের ধারক-বাহক বলে দাবি করে, এবং সকাল-বিকাল রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফিরে আসা প্রতিহত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। কিন্তু তাদের সাম্প্রতিক কথা-বার্তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, তাদের রাজনীতির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত দলটি।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, তারা বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি, কোনও দলের সাথেই সহযোগিতা করবেন না। তারা বোঝাতে চান যে, আওয়ামী লীগের সাথে এই দলগুলোর আদর্শগত ব্যবধান এত বেশি যে, তাদের মধ্যে সমঝোতার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রাজনীতির পটভূমিতে, আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াত বা বিএনপি, কোনও দলের ‘আঁতাত’ -এর সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতীতের দিকে একটু তাকালে দেখা যায়, জামায়াত বেঁচে থাকার জন্য যেমন নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছে, ঠিক একইভাবে  বড় দুই দল একে অপরকে ঘায়েল করার জন্য জামায়াতকে ব্যবহার করেছে।

একথা অনস্বীকার্য যে, জামায়াত স্বাধীন বাংলাদেশে পুনর্বাসিত হয়েছে জেনেরাল জিয়াউর রহমান এবং তাঁর দল বিএনপির সহযোগিতায়। কিন্তু পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগও জামায়াতের সাথে সহযোগিতা করতে পিছপা হয়নি। যেমন, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে লীগ এবং জামায়াত অংশগ্রহণ করে, যখন বিএনপিসহ অন্যান্য এরশাদ-বিরোধী দল ভোট বর্জন করে। দুই বড় দল তাদের এরশাদবিরোধী আন্দোলন জামায়াতের সাথে সমন্বয় করেই পরিচালনা করে, যদিও তারা জামায়াতকে নিজেদের প্লাটফর্মে স্থান দেওয়া থেকে বিরত থাকে। দেশের রাজনীতিতে তখনও চক্ষুলজ্জা বলে কিছু একটা ছিল।

খালেদার মন্ত্রিসভায় জামায়াত

বিএনপির সাথে জামায়াতের সম্পর্ক এরশাদের পতনের পর থেকেই ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। বিএনপি যদিও ১৯৯১ সালের নির্বাচনে একক ভাবে অংশ নেয়, সে সময় অনেকের সন্দেহ ছিল যে জামায়াতের সাথে তাদের কয়েকটি আসনে অলিখিত ‘সমঝোতা’ হয়েছিল। বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন পায়নি। জামায়াতের ১৮ জন এমপি সমর্থন জানানোর পর বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রথম মন্ত্রিসভার এক দশক পরে বিএনপি এবং জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে জোট গঠন করে একযোগে ২০০১ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। আশি আর নব্বই দশকের চক্ষুলজ্জা ততদিনে দেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে আলবদর বাহিনীর দুই সাবেক কমান্ডার, মতিউর রহমান নিজামি এবং আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদ খালেদা জিয়ার নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পান। বিএনপির সাথে জামায়াতের সম্পর্ক ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যে ঘনিষ্ঠ ছিল, তা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়।

আওয়ামী লীগও বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলতে জামায়াতের সাথে এক যোগে কাজ করেছে। যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে ১৯৯৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দুই দলের এক যোগে সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘটনা। দুই দল বিএনপিবিরোধী আন্দোলন এক সাথেই করেছে, যদিও সংসদের বাইরে তারা কখনো এক মঞ্চে আসে নাই। আওয়ামী লীগের চক্ষুলজ্জা তখনও বজায় ছিল।

বিএনপির সাথে জামায়াতের সম্পর্ক গভীর; তারা এক জোটে নির্বাচন করেছে, এক সাথে সরকার গঠন করেছে; তারা এক যোগে আন্দোলন করেছে, নির্বাচন প্রতিহত করার নামে সারা দেশে জ্বালাও-পোড়াওসহ সহিংসতা চালিয়েছে। আওয়ামী লীগ জামায়াতের সাথে কৌশলগত কারণে বিশেষ কোনও সময়ে সহযোগিতা করেছে, কিন্তু নির্বাচনে বা রাজপথে এই দুলের নেতা-কর্মীদের এক সাথে দেখা যায়নি। এখন প্রশ্ন হলো, রাজনীতির বর্তমান পটভূমিতে আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের ‘আঁতাত’ এর সম্ভাবনা কতটুকু?   

আওয়ামীবিরোধী ঐক্য

প্রধানমন্ত্রী ‘গোয়েন্দা’ তথ্যের কথা বলেছেন। তাঁর এই কথার মাধ্যমে জানা গেল, গোয়েন্দারা আবার রাজনৈতিক অঙ্গনে তৎপর হয়েছে, বিরোধী দলগুলোর ওপর তথ্য সংগ্রহ করছে। কিন্তু গোয়েন্দারা কি আসলেই এই তথ্য দিয়েছে? আর দিয়ে থাকলে,তারা কি সঠিক তথ্য সরবরাহ করেছে, নাকি সরকারের বর্তমান এজেন্ডা সার্ভ করার জন্য তারা তাদের ব্রিফ সাজাচ্ছে? এখানে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে কোনও সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করেননি; কিন্তু শুধু ‘গোয়েন্দাদের কাছে খবর আছে’ বলাও যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে যখন, ২০০১ সালের পর থেকে জামায়াতের সাথে শুধু বিএনপির নাম যোগ হয়ে ‘বিএনপি-জামায়াত’ বলা হচ্ছিল। তবে ২০২৪ সালের পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াত নিজেকে ক্ষমতার জন্য বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে। বিএনপি নিজেও ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই দুই দলের কোনোটাই চায় না আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসুক। নিজেদের স্বার্থেই তারা সেটা চায় না। আওয়ামীবিরোধিতা এই দুই দলকে এক ধরনের ঐক্যে ধরে রেখেছে।

জামায়াত সম্ভবত শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণাকে পর্দার আড়ালে কোন সমঝোতার লক্ষণ হিসেবে দেখছে। তাদের সাথে এনসিপির তরুণ নেতারাও আওয়ামী লীগ প্রশ্নে কিছুটা অস্থির হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জামায়াত এবং এনসিপির লং মার্চ-সহ বিক্ষোভ যেমন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের ব্যাপারে সরকার যাতে নমনীয় না হয়— সেই লক্ষ্যে চাপ অব্যাহত রাখাও এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য বলে ধারণা করা যায়।

আওয়ামী লীগের চ্যালেঞ্জ

বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপির মধ্যে বাক-বিতণ্ডা এখন মুষ্টিযুদ্ধের ‘ছায়া লড়াই’ এর পর্যায়ে আছে। দুপক্ষ একে ওপরের চার-পাশ দিয়ে ঘুরছে, কিন্তু কোনও আঘাত হানার চেষ্টা করছে না। এই ছায়া-লড়াই-এ দুপক্ষই আওয়ামী লীগকে বেছে নিয়েছে ‘অজুহাত’ হিসেবে। আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত প্রমাণিত হলে সেটা হবে ২০২৪-এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে তারা আবার প্রমাণ করছে— বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ কতটা প্রাসঙ্গিক।

আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দলকে ধরে রাখা এবং নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করা। তাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য এখন তিনটি। প্রথমত, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কীভাবে সফল করা যায়; দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং তৃতীয়ত, তাদের নেতাকর্মীদের জেল থেকে মুক্ত করা এবং দায়ের করা মামলার নিষ্পত্তি করা।

এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য আওয়ামী লীগ কেন জামায়াতের সাথে আঁতাত করবে? এই লক্ষ্যগুলোর কোনোটাই জামায়াতের সহায়তায় অর্জন করা সম্ভব বলে মনে হয় না। জামায়াত আওয়ামী লীগকে তাদের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে, সেকথা ভাবাও বোকামি। তবে বিএনপি হয়তো মনে করতে পারে এবং গোয়েন্দারা হয়তো সেই চিন্তায় খোরাক জুগিয়েছে— আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে সরকারকে বিপদে ফেলা এবং তারেক রহমানের হাত দুর্বল করে আওয়ামী লীগের প্রতি নমনীয় হতে বাধ্য করা। কিন্তু সেখানেও আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের আঁতাতের সম্ভাবনা ক্ষীণ। 

আওয়ামী লীগের প্রয়োজন সরকারের সাথে বোঝাপড়া করা, কারণ এই সমঝোতার মাধ্যমেই শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন সম্ভব  এবং নিরাপদ হতে পারে; তেমনি সরকারের সাথে সমঝোতার মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ সুগম হতে পারে। সরকারের সাথে সমঝোতার ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনও শক্তির মধ্যস্ততার প্রয়োজন হবে, যেহেতু বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ একে অপরের মুখ দেখা বন্ধ করে দিয়েছে।

লেখক একজন সাংবাদিক এবং পডকাস্টার

ইমেইল: [email protected]

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে পরীক্ষা, ‘এ গ্রেড’ পেলেন আফিয়া
বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে পরীক্ষা, ‘এ গ্রেড’ পেলেন আফিয়া
বাড়ি কিনতে চায় এক্সএআই, আছে বিশেষ শর্ত!
বাড়ি কিনতে চায় এক্সএআই, আছে বিশেষ শর্ত!
যে দুই বিষয়ে বেশি ফেল করায় খারাপ হয়েছে ফল 
যে দুই বিষয়ে বেশি ফেল করায় খারাপ হয়েছে ফল 
ব্যালন ডি’অরে পঞ্চম, তবু ছয় দেশের পছন্দের শীর্ষে মেসি
ব্যালন ডি’অরে পঞ্চম, তবু ছয় দেশের পছন্দের শীর্ষে মেসি
সর্বশেষ সর্বাধিক