হাসিনার ফেরা না ফেরা নিয়ে পানি ঘোলা অব্যাহত

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বেশ মজার লোক। বিভিন্ন সিরিয়াস বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রায়ই কিছুটা ব্যঙ্গ, কিছুটা বিদ্রূপ দিয়ে একটু হাস্যরস সৃষ্টির চেষ্টা করেন। সাংবাদিক যখন সোজা প্রশ্নের সোজা উত্তর আশা করছেন, তখন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির কিছুটা মশকরা করতে পছন্দ করেন।

সম্প্রতি হুমায়ুন কবিরকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার জন্য পাসপোর্টের আবেদন করেছেন কি না। প্রশ্নটা পুরোপুরি যুক্তিসংগত বলা যায় না। যেহেতু হাসিনা যে আদৌ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন, তেমন কিছু শোনা যায়নি। অর্থাৎ, যার পাসপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে, তিনি নিজেই পাসপোর্ট নিয়ে কোনও কথা বলেননি। যাই হোক, সাংবাদিকের কৌতূহল থাকলে প্রশ্ন অবশ্যই করবেন এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তা তার যথাযথ উত্তর দেবেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানালেন, তিনি পাসপোর্ট সম্পর্কে কিছু জানেন না। অবশ্য না জানারই কথা। কারণ শেখ হাসিনা পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস নিয়ে এখনও কিছুই বলেননি। এ নিয়ে যেটুকু আলোচনা হচ্ছে, সবই ঢাকার গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। হুমায়ুন কবির অবশ্য সেখানেই থেমে যাননি। একটু ঠাট্টা-তামাশা করার এই সুবর্ণ সুযোগ তিনি কীভাবে হাতছাড়া করবেন? বললেন, ‘এখানে কি শ্বশুরবাড়ি রংপুরে বেড়াইতে আসবেন যে, তাকে পাসপোর্ট দেবো, আর পাসপোর্ট দিয়ে আসবেন?’ 

হুমায়ুন কবির বললেন তার স্বভাব-সুলভ হাসি দিয়ে। তিনি বিষয়টাকে ‘হাস্যকর’ বলে আখ্যায়িত করলেন। তারপর তিনি সরকারের অবস্থান নিজ ভাষায় তুলে ধরলেন। ‘শেখ হাসিনা হচ্ছেন পলাতক সন্ত্রাসী। স্বৈরাচার, একটা পালিয়ে যাওয়া টেরোরিস্ট,’ যোগ করলেন তিনি।

টেরোরিস্ট আর ক্রিমিনাল

হুমায়ুন কবিরের শব্দ চয়ন এখানে বেশ ইন্টারেস্টিং। এই প্রতিমন্ত্রী সুযোগ পেলেই হাসিনাকে ‘টেরোরিস্ট’ বলেন। হুমায়ুন কবির ব্রিটেন প্রবাসী, কাজেই তিনি ভালো করে জানেন পশ্চিমা বিশ্বে ‘টেরোরিস্ট’ বলতে কী বোঝায়। সেখানে ‘টেররিস্ট’ বলতে মূলত ইসলামি জঙ্গিদের বোঝায় (যদিও যুক্তরাষ্ট্রে কিছু সশস্ত্র শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীকে ‘ডোমেস্টিক টেরোরিস্ট’ সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়)। এখানে সন্দেহ রয়ে যায় যে, প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির হাসিনাকে ‘টেরোরিস্ট’ আখ্যা দিয়ে পশ্চিমাদের মনে তার সম্পর্কে একটি নতুন চিত্র তৈরি করতে চান কিনা।

ভারত থেকে হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে হুমায়ুন কবির তার আগের অবস্থানে অনড় থাকলেন। ‘আমাদের অ্যাকটিভ এক্সট্রাডিশন ট্রিটি আছে টেরোরিস্টদের ধরার, ক্রিমিনালকে ধরার,’ তিনি বলেন। ‘সন্ত্রাসী আর অপরাধীকে ধরতে পাসপোর্ট লাগে না, এটা হস্তান্তর হয়।’

এই কথাটা তিনি ঠিকই বলেছেন। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে প্রত্যর্পণ চুক্তি বা এক্সট্রাডিশন ট্রিটি আছে, তার উদ্দেশ্যই হচ্ছে একে অপর দেশের ‘টেরোরিস্ট’ আর ‘ক্রিমিনাল’ ধরে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। ভারত কি আদৌ শেখ হাসিনাকে ‘টেরোরিস্ট’ বা ‘ক্রিমিনাল’ হিসেবে দেখে? ঢাকায় ভারতের যে রাষ্ট্রদূত আছেন, জনসমক্ষে তার কথা-বার্তা সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (এবং গোয়েন্দা বিভাগগুলো) নিশ্চয়ই অবগত?

ভারতের হাই কমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের প্রশ্নের যে জবাব দিয়েছেন, তা থেকে কারও কোন সন্দেহ থাকা উচিত নয় যে, ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে সন্ত্রাসী বা অপরাধী ভাবা তো দূরের কথা, তাকে বেশ সমীহ করেই চলে। ত্রিবেদী তার পুরো বক্তব্যের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ‘হাসিনাজি’ হিসেবে সম্বোধন করেন। ভারতের সামাজিক রীতি সম্পর্কে যাদের বিন্দুমাত্র ধারণা আছে, তারা জানবেন— সেদেশে কোনও অপরাধী বা সন্ত্রাসীর নামের সঙ্গে কোনও দায়িত্বশীল ব্যক্তি ‘জি’ যোগ করবেন না।

পাসপোর্ট নাগরিকের অধিকার? 

ত্রিবেদী বলেছিলেন, হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই ভারতে আসেন। তাকে ভারতীয় বিমান বাহিনী ঢাকার গণভবন থেকে ‘উদ্ধার’ করেও নিয়ে আসেনি। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীই তার নিরাপত্তার জন্য তাকে দিল্লিতে নিয়ে যায়। আর প্রত্যর্পণ? সেটা লম্বা আইনি প্রক্রিয়া, সে ব্যাপারে হাইকমিশনার কিছুই বলতে পারলেন না। ভারত যদি হাসিনাকে ‘টেরোরিস্ট’ বা ‘ক্রিমিনাল’ হিসেবে না-ই দেখে, তাহলে এক্সট্রাডিশন ট্রিটি, সেটা যতই অ্যাকটিভ থাকুক, তার বেলায় প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে।

হুমায়ুন কবিরের কথা নিয়ে দ্বিতীয় একটি সমস্যা আছে। সরকারের মুখপাত্র এবং প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশল-বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এক দিন আগে কিছুটা ভিন্ন কথা বলেছেন। তাকে তার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে একই বিষয়ে একাধিক প্রশ্ন করা হলে— তিনি হাসিনাকে পাসপোর্ট দেওয়ার সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করেননি। তিনি জানেন, হাসিনা সেরকম কোনও আবেদন করেননি। তিনি বলেন, সরকার কোনও পরিকল্পনা নিয়ে বসে নেই। ‘যদি এমন হতো যে তিনি (হাসিনা) চেয়েছেন (পাসপোর্ট), তখন সরকার কী করবে, সেটা আমার মনে হয় তখন জবাব দেওয়ার জন্য রেখে দেওয়াই ভালো।’

প্রত্যর্পণ বনাম প্রত্যাবর্তন

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে শত শত মামলা দায়ের করা আছে, দু-একটা মামলা তার অনুপস্থিতে ‘বিচার’ হয়ে গেছে, মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। হাসিনাকে সরকার ‘পলাতক’ হিসেবে গণ্য করে, কাজেই সরকার নিশ্চয়ই চাইবে— তিনি দেশের আইনের আওতায় ফিরে আসুক? যাতে তার বিরুদ্ধে বিচারকার্য প্রহসনমূলক না হয়ে কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারে?

শেখ হাসিনা যেহেতু ডিসেম্বরে স্বেচ্ছায় ফিরে আসতে চেয়েছেন, আপাত দৃষ্টিতে সেটাই সহজ এবং দ্রুততম পথ বলে মনে হয়। অন্যদিকে, হুমায়ুন কবির যে প্রত্যর্পণের কথা বলেছেন, যেটা জাহেদ উর রহমান নাটকীয় ভঙ্গিতে ‘ধরে নিয়ে আসবো’ বলে ব্যাখ্যা দেন। সেটা একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া; প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শেষ হতে কত মাস, এমনকি কত বছর লাগতে পারে, তা কেউ বলতে পারে না। প্রক্রিয়া শেষে ভারত সরকার যে আদৌ শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়ার জন্য ফেরত দেবে, তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই।

এই পটভূমিতে সরকার যদি দীর্ঘ প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকেই একমাত্র রাস্তা হিসেবে বেছে নেয় এবং ‘পাসপোর্ট দেবো কেন’ ধরনের কথা বলে দ্রুত প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নাকচ করে দেয়; তাহলে শেখ হাসিনা দেশে ফিরুক, সেটা সরকার আদতে চায় কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ থেকে যায়। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহিদ উর রহমান একাধিকবারই জানিয়েছেন, সরকার হাসিনাকে ফেরাতে চায় না, একথা সঠিক নয়। 

সরকারের ভাবনা যাই হোক, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন হলে দেশে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে; তার মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি কতটা রয়েছে, তা নিয়ে ভাবতে হবে। অন্যদিকে এরফলে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগও একদিকে পুনরুজ্জীবিত হবে; অন্যদিকে বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির ক্ষোভ চরমে পৌঁছাবে। এই দ্বিমুখী রাজনৈতিক টানাপোড়েন মোকাবিলা করাই বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। 

লেখক: সাংবাদিক এবং পডকাস্টার

ইমেইল: sabir.mustafa@gmail.com