একদিন রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছি, এমন সময় ঘরের কোণে একটা খসখস শব্দ হলো। অন্ধকারের মধ্যেই চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখি, একটি ছায়ামূর্তি আলমারির লকার ভাঙার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সাধারণ মানুষ হলে হয়তো ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার চেঁচামেচি করে পাড়া মাথায় করতো। কিন্তু আমি যেহেতু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রজ্ঞাবান শিক্ষার্থী, তাই চিৎকার না করে অত্যন্ত সমীহের সাথে চোর বাবাজিকে বললাম, “ভাই, একটু আস্তে সাবধানে কাজটা করুন। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার এত বড় দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এভাবে তাড়াহুড়ো করা কি ঠিক?”
আমার কথা শুনে হতভাগা চোর লকার ভাঙা রেখে পেছনের দিকে দুই পা পিছিয়ে গেলেঅ। তার চোখে-মুখে বিস্ময়! সে হয়তো জীবনে গালমন্দ, গণপিটুনি বা পুলিশের লাঠি খেয়েছে, কিন্তু অর্থনীতির চাকা সচল রাখার মতো এমন গুরুগম্ভীর বাক্য কোনোদিন শোনেনি।
আসলে আমরা চোরদের অবমূল্যায়ন করি। তাদের সমাজচ্যুত ভাবি, চোর অপবাদ দিয়ে কারাগারে পাঠাই। অথচ একটু ঠান্ডা মাথায়, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে দেখা যাবে, চোররা কোনও অভিশাপ নয়, বরং তারা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির এক একজন নিঃশব্দ ও অক্লান্ত যোদ্ধা! দেশের উন্নয়ন, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানে তাদের যে অনন্য ভূমিকা, তা অনেক সময় বড় বড় করপোরেট হাউজকেও হার মানায়।
একটু ভেবে দেখুন,দুনিয়ায় যদি চোর না থাকতো, তবে কি মানুষের মনে চুরির ভয় থাকতো? আর ভয় না থাকলে কি মানুষ সিন্দুক, আলমারি, কিংবা লকার কিনতো? কখনোই না। চোর আছে বলেই আজ বাজারে গোদরেজ, এবাস, ইয়েল কিংবা চীনা ব্রান্ডের বাহারি তালার এত রমরমা ব্যবসা।
চোরদের কল্যাণেই আজ গড়ে উঠেছে শত শত তালা-চাবি তৈরির কারখানা। সেখানে লোহা গলানো থেকে শুরু করে লিভার ফিটিং করা পর্যন্ত হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। চোর আছে বলেই মানুষ বাড়ির দরজা-জানালায় ছিটকিনি লাগাচ্ছে, মজবুত গ্রিল বসাচ্ছে। এই গ্রিল আর ছিটকিনি তৈরি করতে গিয়ে ঝালাই কারখানা বা ওয়েল্ডিং শপের মালিকদের পকেট ভারী হচ্ছে। রাজমিস্ত্রি ও নির্মাণ শ্রমিকেরা অতিরিক্ত পারিশ্রমিক পাচ্ছে শুধু বাড়িতে লোহার সিকিউরিটি গেট বসানোর জন্য। চোর যদি চুরি করা ছেড়ে হিমালয়ে গিয়ে সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করে, তবে এই কোটি কোটি টাকার তালা-চাবি এবং গ্রিল নির্মাণ শিল্পে ধস নামবে। মুহূর্তের মধ্যে বেকার হয়ে পড়বে লাখ লাখ মানুষ।
আমরা এখন আধুনিক যুগে বাস করি। চোরদের কার্যপদ্ধতিও এখন ডিজিটাল ও স্মার্ট হয়েছে। আর তাদের টেক্কা দিতে গিয়ে বাজারে আবির্ভাব ঘটেছে সিসিটিভি ক্যামেরা, মেটাল ডিটেক্টর, বায়োমেট্রিক লক এবং অত্যাধুনিক অ্যালার্ম নসিস্টেমের।
যদি চোরদের উপদ্রব না থাকতো, তবে কি কোনও শপিং মল বা অফিস কোটি টাকা খরচ করে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতো? মেটাল ডিটেক্টর কেনার কোনও প্রয়োজন হতো? একেবারেই হতো না। ফলে এই যে হাই-টেক সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছে এবং লাখ লাখ আইটি ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ানের চাকরি হচ্ছে— তার মূল কৃতিত্ব কার? নিঃসন্দেহে চোর সম্প্রদায়ের। তারা যদি ‘লাইভ ডেমো’র মাধ্যমে আমাদের নিরাপত্তার গলদগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে না দিতো, তবে প্রযুক্তি খাতের এই বিশাল বাজারটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতো।
শুধু কি প্রযুক্তি? যেকোনও বাড়ি, ব্যাংক, স্কুল, কলেজ, অফিস বা কারখানা পাহারা দেওয়ার জন্য যে সিকিউরিটি গার্ড বা নাইট গার্ড নিয়োগ দেওয়া হয়, তার পেছনেও চোরদের অবদান অনস্বীকার্য। একজন নাইট গার্ড রাতে লাঠি ঠুকে ‘কে?
সাবধান!’ বলে যে ডিউটি করে, তার মাসকাবারি বেতনটা কিন্তু পরোক্ষভাবে ওই চোর মহাশয়ের অস্তিত্বের কারণেই নিশ্চিত হয়। চোর না থাকলে নাইট গার্ডের চাকরি থাকতো না, আর চাকরি না থাকলে তার পুরো পরিবারকে না খেয়ে মরতে হতো।
চোরদের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার বিভাগে। চোর আছে বলেই পুলিশ আছে। পুলিশ আছে বলেই গাড়ি আছে, বাইক আছে, ওয়াকিটকি আছে, লাঠি আছে। সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে পুলিশের জন্য গাড়ি কেনে। ফলে গাড়ির কোম্পানির বিক্রি বাড়ে, টায়ারের ব্যবসা বাড়ে, পেট্রোল পাম্পে ভিড় বাড়ে। একজন চোর মূলত পুরো রাষ্ট্রীয় সরবরাহ ব্যবস্থার নীরব চালিকাশক্তি। তারপর ধরা যাক আদালত।
চোর ধরা পড়লে মামলা হয়। মামলা হলে উকিল আসে। উকিল এলে পেশকার আসে। পেশকার এলে টাইপিস্ট আসে। টাইপিস্ট এলে স্ট্যাম্প বিক্রেতা আসে। চোর না থাকলে আদালতপাড়ার অর্ধেক লোক বেকার হয়ে যেত। উকিলরা মক্কেল না পেয়ে আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কবিতা আবৃত্তি করতো।
এমনকি জেলখানাও চোরদের অবদানে সচল। জেলার, কারারক্ষী, কয়েদিদের রান্নার ঠিকাদার—সবার সংসার চলে এই চোরদের কারণে। চোররা জেলে গিয়ে আসলে আত্মত্যাগ করে। তারা নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে অন্যের মাসিক বেতন নিশ্চিত করে।
তাছাড়া চোরদের জন্য রয়েছে আমাদের কারাগার ব্যবস্থা। চোর না থাকলে জেলখানাগুলো শূন্য পড়ে থাকতো। ফলে জেলার, কারারক্ষী এবং জেলের ভেতরে কয়েদিদের জন্য খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারদের ব্যবসা একবারে লাটে উঠতো। চোররা নিজেরা কষ্ট করে জেলে যায় বলেই এতগুলো মানুষের ঘরে নিয়মিত বাজারের টাকা পৌঁছায়।
অর্থনীতিতে একটা তত্ত্ব আছে, যাকে বলা হয় ‘কনসাম্পশন’ বা ভোগ। মানুষ যত বেশি কেনাকাটা করবে, অর্থনীতি তত বেশি চাঙ্গা হবে। এই ভোগবাদকে চাঙ্গা রাখতে চোরদের চেয়ে বড় অনুঘটক আর কেউ নেই।
ধরুন, আপনার সাধের দামি স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা বাইকটি চুরি হয়ে গেল। আপনি প্রথম কয়েকদিন কান্নাকাটি করবেন, ফেসবুক-স্ট্যাটাসে দুঃখ প্রকাশ করবেন—সেটা আবেগের বিষয়। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে কী ঘটবে? আপনি বাধ্য হয়ে আবার বাজারে যাবেন এবং একটি নতুন ফোন বা বাইক কিনবেন। এর ফলে মোবাইল কোম্পানি, বাইকের শোরুম এবং ইলেকট্রনিক্স বিক্রেতাদের লভ্যাংশ বৃদ্ধি পাবে। সরকার পাবে অতিরিক্ত ভ্যাট ও ট্যাক্স।
এমনকি নারীদের পার্স বা প্রিয় লিপস্টিকটি চুরি হলেও কসমেটিক্স দোকানে নতুন করে ভিড় বাড়ে। চোর যদি আপনার পুরোনো জিনিসটি চুরি না করত, তবে আপনি তো আর নতুন মডেলের জিনিস কিনতেন না। ফলে বাজারে ‘মানি সার্কুলেশন’ থমকে যেত। চোররা মূলত পুরোনো ও অলস পড়ে থাকা পণ্যসামগ্রীকে বাজার থেকে সরিয়ে নতুন পণ্যের চাহিদা তৈরি করে। তারা হলো অর্থনীতির ‘রিসাইক্লিং এজেন্ট’!
তবে ছোটখাটো চুরি করতে করতে একসময় অনেক চোরের ভেতর নেতৃত্বের গুণাবলি জেগে ওঠে। তারা বুঝতে পারে—বাসার গ্রিল কেটে লাভ কম, রাষ্ট্রের গ্রিল কাটলে লাভ বেশি।
তখন তারা রাজনীতিতে যোগ দেয়। ছোট চোর ধরা পড়লে জেলে যায়, বড় চোর ধরা পড়লে প্রেস কনফারেন্স করে। বিদেশ চলে যায়। রাজনীতিতে গিয়ে তাদের চুরির স্কেলও আন্তর্জাতিক হয়ে যায়। তখন আর মোবাইল-ল্যাপটপে সীমাবদ্ধ থাকে না। শুরু হয় ব্যাংক লোপাট, মেগা প্রজেক্টের মেগা দুর্নীতি, হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার।
আমরা সাধারণ মানুষ একে দুর্নীতি বলি। কিন্তু অর্থনীতির ভাষায় এটা ‘আন্তর্জাতিক মূলধন স্থানান্তর’। এই বড় বড় চোরদের কারণেই অডিট ফার্মের কাজ বাড়ে, দুদক ব্যস্ত থাকে, সংবাদপত্রে শিরোনাম তৈরি হয়, টকশোতে বুদ্ধিজীবীরা রাত জেগে চিৎকার করেন। অর্থাৎ একজন বড় চোর পুরো মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিকেও সচল রাখে।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে আমি আবার ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা চোরটির দিকে তাকালাম। তার চোখে তখন অদ্ভুত এক আবেগ। আমি নরম গলায় বললাম, ‘‘ভাই, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্বার্থে আপনাকে বাধা দেব না। শুধু একটা অনুরোধ, সিন্দুকে হ্যারল্ড লাস্কির এ গ্রামার অব পলিটিকস বইটা আছে, ওটা রেখে বাকি যা আছে নিয়ে যান।
এই জ্ঞান যদি হারিয়ে যায়, তাহলে দেশের মানুষ চোরদের প্রকৃত অবদান কখনোই বুঝবে না। চোরটি দীর্ঘক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলো— তারপর আর্মি কায়দায় হাত কপালে তুলে স্যালুট দিলো। সে বললো, ‘‘স্যার, জীবনে অনেক বাসায় চুরি করছি। কিন্তু প্রথমবার কেউ আমারে দেশের উন্নয়ন সহযোগী বললো। আপনের জিনিস আমি নেবো না। আমি পাশের বাসায় যাই, উনি বড় আমলা। ওনার ঘরে চুরি করলে জিডিপি আরও বাড়বে।’’ এই বলে লোকটা জানালা দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আর আমি শান্ত মনে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।
কারণ আমি জানতাম—আজ রাতে অন্তত একজন চোর তার পবিত্র অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে বেরিয়েছে। আর যতদিন চোর আছে, ততদিন এই দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, আদালত, মিডিয়া, সিসিটিভি কোম্পানি এবং টকশো—সবই নিরাপদ হাতে আছে!
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট