জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে সবার প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে

শফিক আর. ভূইয়া
০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:০০ আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক পরিসরে সোচ্চার। জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা--এসব বিষয় নিয়ে আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনেও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থাকবে। এই আলোচনায় আমাদের উচিত একটি মৌলিক প্রশ্ন আরও গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় আমরা যে

অবকাঠামো, সতর্কবার্তা ও সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করছি, সেগুলো কি দেশের সব মানুষের জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য?

ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা হয়তো একটি গ্রামের সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি যদি সেই বার্তা বুঝতে না পারেন, কিংবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি যদি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা গ্রহণ করতে না পারেন, তাহলে সেই সতর্কবার্তাকে সর্বজনীন বলা যায় না।

একইভাবে, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মিত হলেও সেখানে যাওয়ার পথ বা প্রবেশপথ হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর জন্য উপযোগী না হলে— সেই অবকাঠামো সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। অর্থাৎ, দুর্যোগের কারণ প্রাকৃতিক হলেও এর পরিণতিতে যে বৈষম্য তৈরি হয়, তার অনেকটাই আমাদের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার ফল।

এ কারণেই জলবায়ু সহনশীলতা নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিকে জলবায়ু প্রকল্পের একটি অতিরিক্ত সামাজিক বিবেচনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং কোনও অভিযোজন প্রকল্প কতটা কার্যকর, তা যাচাইয়ের অন্যতম মানদণ্ড হওয়া উচিত সেটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কতটা প্রবেশগম্য।

জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনডিআরআর) ২০২৩ সালের বৈশ্বিক জরিপে ১৩২টি দেশের ৬ হাজার ৩৪২ জন অংশগ্রহণকারীর মতামত নেওয়া হয়েছিল। জরিপে মাত্র ৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাঁদের স্থানীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস পরিকল্পনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিশেষ প্রয়োজন বিবেচনা করা হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো— ৮৬ শতাংশ জানিয়েছেন, স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ পরিকল্পনা প্রণয়নে তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। জরিপে আরও উঠে এসেছে, কিছু দুর্যোগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি অন্যদের তুলনায় দুই থেকে চারগুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।

বাংলাদেশের বাস্তবতাও উদ্বেগজনক। সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) একটি

গবেষণায় বরগুনার পাথরঘাটা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ৬ থেকে ২৫ বছর বয়সী ৩০০ প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯৩ শতাংশ মনে করেছেন, গত পাঁচ বছরে চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা বেড়েছে। ৮০ শতাংশের ধারণা, অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা দুর্যোগে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা তাঁদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চলাচল ও জীবিকার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। জলবায়ু দুর্যোগ শুধু আগে থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; দুর্যোগ নতুন প্রতিবন্ধিতাও তৈরি করতে পারে। দুর্ঘটনায় আঘাত, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ক্ষতি, মানসিক ট্রমা, চিকিৎসাসেবায় বিঘ্ন এবং পুনর্বাসনের অভাব একজন মানুষকে আজীবনের জন্য নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সহায়ক উপকরণ না পেলে দুর্যোগের ক্ষতি অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক জলবায়ু কার্যক্রমের পরিধিতে দুর্যোগ প্রতিরোধ, জরুরি সাড়া, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও পুনরুদ্ধার— সবকিছুই থাকতে হবে।

৫ নভেম্বর কপ-৩১ সামনে রেখে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিমূলক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জলবায়ু অভিযোজনবিষয়ক জাতীয় প্ল্যাটফর্ম সাতটি সুপারিশ তুলে ধরেছে। সিডিডির কারিগরি সহায়তায় প্রণীত এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে প্রবেশগম্য আগাম সতর্কবার্তা ও আশ্রয়কেন্দ্র, নির্দিষ্ট জলবায়ু অর্থায়ন, পুনর্বাসনসেবা, নীতিনির্ধারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ এবং প্রতিবন্ধিতা-ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ। এটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে সুপারিশ প্রকাশের পর সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সেগুলোকে বাজেট, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ও বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করা।

প্রথমত, জলবায়ু অবকাঠামো নির্মাণের শুরু থেকেই প্রবেশগম্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, সরিয়ে নেওয়ার পথ, জরুরি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র এবং সতর্কবার্তা প্রচারের ব্যবস্থা—

সবকিছুর ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট প্রবেশগম্যতার মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। একটি আশ্রয়কেন্দ্রে অনেক মানুষ অবস্থান করতে পারলেই সেটিকে সফল বলা যায় না। সেখানে প্রবেশের উপযোগী পথ, ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার, নিরাপদ থাকার জায়গা, নির্দেশনামূলক চিহ্ন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সতর্কবার্তাও শুধু একটি মাধ্যমে প্রচার করলে চলবে না। অডিও, দৃশ্যমান সংকেত, লিখিত বার্তা ও ইশারা ভাষাসহ একাধিক মাধ্যমে তা পৌঁছাতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়নে অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য বড় অংকের অর্থায়ন চাইছে। একইসঙ্গে দেশের নিজস্ব জলবায়ু বাজেটেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিতে হবে। সহায়ক প্রযুক্তি, প্রবেশগম্য অবকাঠামো, জরুরি সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা, পুনর্বাসন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় প্রকল্পের শুরুতেই অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ থেকে প্রবেশগম্যতার ব্যবস্থা করার চিন্তা কোনো কার্যকর পরিকল্পনা হতে পারে না।

তৃতীয়ত, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শুধু প্রকল্পের সুবিধাভোগী হিসেবে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবেও দেখতে হবে। স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা এবং প্রকল্পের মূল্যায়নে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব ও মতামত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রকল্প তৈরি হয়ে যাওয়ার পর পরামর্শ নেওয়া প্রকৃত অংশগ্রহণ নয়। কী নির্মাণ করা হবে, কোথায় হবে এবং সেটি কতটা কার্যকর— এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের শুরু থেকেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিতে হবে।

নারী ও কন্যাশিশু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানো, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, সহিংসতা থেকে সুরক্ষা এবং জীবিকার সুযোগ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁদের বাড়তি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। তাই নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আলাদা দুটি শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা না করে তাঁদের সম্মিলিত বাস্তবতাকে নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দিতে হবে।

কপ-৩১ বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় এই বিষয়গুলো তুলে ধরার একটি সুযোগ। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্তর্ভুক্তির দাবি তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন দেশের নিজস্ব জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে তার প্রতিফলন দেখা যাবে। শুধু নীতিমালা থাকলেই হবে না; কোন প্রতিষ্ঠান কী দায়িত্ব পালন করবে, কত অর্থ বরাদ্দ হবে এবং কীভাবে অগ্রগতি পরিমাপ করা হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে।

প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবেও যৌক্তিক। আগাম সতর্কবার্তা বুঝতে না পারলে উদ্ধার ও জরুরি সেবার প্রয়োজন বাড়ে। আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহার করতে না পারলে সরকারি বিনিয়োগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। পুনর্বাসনসেবা না পেলে পরিবারকে দীর্ঘদিন বাড়তি

পরিচর্যার দায়িত্ব নিতে হয়, কমে যায় কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ। শুরু থেকেই সবার উপযোগী করে অবকাঠামো ও সেবা তৈরি করা হলে একই বিনিয়োগ থেকে বেশি মানুষ উপকৃত হতে পারেন।

দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন সেই অগ্রগতির পরবর্তী মানদণ্ড হওয়া উচিত— দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও কি সমানভাবে প্রস্তুতি নিতে, নিরাপদে আশ্রয় পেতে, দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ঘুরে দাঁড়াতে এবং উন্নয়নের অংশ হতে পারছেন? জলবায়ু ন্যায়বিচারের অর্থ শুধু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা নয়; একটি দেশের

ভেতরেও যেন কেউ তার প্রতিবন্ধিতার কারণে সুরক্ষা ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিও নিশ্চিত করা।

কপ-৩১ -এ বাংলাদেশকে এই বার্তাই জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। কারণ জলবায়ু সহনশীল দেশ গড়তে হলে কোনো কাল্পনিক ‘গড় নাগরিকের’ কথা ভেবে পরিকল্পনা করলে চলবে না। পরিকল্পনা হতে হবে সবার জন্য, প্রবেশগম্যতা হতে হবে শুরু থেকেই।

লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
২৮ বছর ধরে হেঁটে পৃথিবী ভ্রমণ, পাড়ি দিলেন ৫০ হাজার কি.মি.
২৮ বছর ধরে হেঁটে পৃথিবী ভ্রমণ, পাড়ি দিলেন ৫০ হাজার কি.মি.
গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী
গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী
লিপস্টিক, নেলপলিশ ফ্রিজে রাখলেই কি ভালো থাকে?
লিপস্টিক, নেলপলিশ ফ্রিজে রাখলেই কি ভালো থাকে?
মিশিগান সিনেট প্রার্থীর পক্ষে ভারত থেকে ভুয়া ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ
মিশিগান সিনেট প্রার্থীর পক্ষে ভারত থেকে ভুয়া ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ
সর্বশেষ সর্বাধিক