‘সকাল ৯টার দিকে বাসা থেকে (শ্রীপুরের পটকা) রিকশায় করে কিন্ডারগার্টেনে যাচ্ছিলাম। ট্রেন সিগনালে আটকে পড়ায় রিকশা থেকে নেমে রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটা শুরু করি। স্টেশনে তিনটি রেললাইন। কিছুক্ষণ পর মাঝখানের লাইন দিয়ে হাঁটা শুরু করি। কিন্ডারগার্টেনের কাছাকাছি এসে দেখি একটি বাচ্চা মেয়ে স্কুলভ্যানের সামনে খেলা করছে। হঠাৎ একটা লোক এসে মেয়েটিকে ভ্যান থেকে হ্যাঁচকা টানে কোলে তুলে নিয়ে রেললাইনের দিকে এগুতে থাকে। আমার সঙ্গে তার দূরত্ব ছিল ৫০ হাতের মতো। আমিও তাকে অনুসরণ করতে থাকি। সামন দিক থেকে আসছিল দ্রুতগামী একটি ট্রেন। হঠাৎ দেখি, লোকটি তার মেয়েকে বুকে নিয়ে ট্রেনটার সামনে নামাজের সেজদার ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ে। মুহূর্তেই ট্রেনটা তাদের ওপর দিয়ে চলে যায়।’
গত ২৯ এপ্রিল শ্রীপুর রেল স্টেশনের দক্ষিণ পাশের আউটার সিগন্যালের কাছে পালিত কন্যা আয়েশা আক্তারকে (১০) নিয়ে তার বাবা হযরত আলীর (৪৫) আত্মহত্যার দৃশ্য এভাবেই বর্ণনা করেন প্রত্যক্ষদর্শী জুয়েনা আক্তার। তিনি ঘটনাস্থলের পাশে নূরুন্নাহার কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক ও গোসিংগা ইউনিয়নের কর্ণপুরের পটকা গ্রামের বাসিন্দা।
নিজেকে বাবা-মেয়ের ‘আত্মহত্যা’র প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে জুয়েনা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে আরও বলেন, ঘটনা আকস্মিকতায় তিনি রেললাইনে দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টি ভুলেই গিয়েছিলেন। ট্রেন কাছে চলে আসার একেবারে শেষ মুহূর্তে সরে যান তিনি। জুয়েনা বলেন, “ম্যাডাম’ চিৎকার শুনে রেললাইন থেকে দু’কদম ডানে সরে পড়ি। না হয় আমিও আজ দুনিয়ায় থাকতাম না। দৃশ্যটি (বাবা-মেয়ের আত্মহত্যা) দেখে আমার শরীরের সব শক্তি হারিয়ে ফেলি। ট্রেন চলে যাওয়ার পর তাদের কী হয়েছে তা দেখার জ্ঞান ছিল না আমার। পরে দেখি কিন্ডারগার্টেনের ভেতরে শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও সহকর্মীরা আমার মাথায় পানি ঢালছে। ঘটনার ঘন্টা দেড়েক পরে শরীরে সামান্য শক্তি পাই। দুর্ঘটনা কবলিতদের পরিচয় জানতে ঘটনাস্থলের পাশে গিয়ে দেখি ওই ব্যক্তির স্ত্রী কান্নাকাটি করছে। ভয়ে লাশের কাছে যাইনি।’
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ এপ্রিল শনিবার সকাল ৯টার দিকে শ্রীপুর রেল স্টেশনের দক্ষিণ পাশের আউটার সিগন্যালের কাছে বাবা ও মেয়ের লাশ পাওয়া যায়। শ্রীপুরের গোসিংগা ইউনিয়নের কর্নপুর (সিটপাড়া) গ্রামের মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে হযরত আলী (৪৫) ও তার পালিত কন্যা আয়েশা আক্তারের (১০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আয়েশা আক্তার শ্রীপুরের হেরা পটকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়তো।
হযরত আলীর স্ত্রী হালিমা বেগমের অভিযোগ, শিশুটির শ্লীলতাহানির চেষ্টার ঘটনায় বিচার না পেয়ে তাকে নিয়ে তার বাবা আত্মহত্যা করেছে। হালিমা আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন প্রতিবেশী ফারুক ও মেম্বার আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে।
হালিমার দাবি, ৮ বছর বয়সী আয়েশাকে মাঝেমধ্যে ফজলুল হকের ছেলে ৩০ বছরের ফারুক সাইকেলে চড়াতেন। এর মধ্যে একদিন মেয়েটিকে যৌন নির্যাতনের চেষ্টা করেন তিনি। প্রায় দুই মাস আগের এ ঘটনার বিচারের দায়িত্ব নেন স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল হোসেন। কিন্তু ফারুকের কাছ থেকে ২০০ টাকা নিয়ে কোনও মীমাংসা ছাড়াই তিনি বিষয়টি ধামাচাপা দেন। ফারুকের বিরুদ্ধে ৪০ হাজার টাকা দামের একটি গরু চুরি এবং বাড়ি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টার অভিযোগও তুলেছেন হালিমা। আয়েশাকে নির্যাতন করায় ফারুকের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিয়েছিলেন বলেও হালিমা দাবি করেছেন।
বাবা-মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় হালিমা বেগম বাদী হয়ে ছয় জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল হোসেন (৪৭) ও তার ছেলে মিথুনকে (২৪) গ্রেফতার করা হয়।
/এফএস/টিএন/