চারপাশে অন্ধকার নেমে আসার পর ভেসে এলো কান্নার শব্দ। বয়স্ক ও ক্নান্ত এক নারী কণ্ঠের আহাজারি। এ শব্দের উৎস পরিত্যক্ত একটি ভবন। নির্জন রাতে এরকম মায়াবী কান্নার সুর সাহিত্য-সিনেমায় রহস্যের সৃষ্টি করে। হতে পারতো এটি একটি ভৌতিক গল্প, কিন্তু বাস্তবে এর পটভূমি পুরোটাই ভিন্ন। গত ২২ আগস্ট রাতে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিত্যক্ত ভবন থেকে ভেসে আসা এ কান্না কাঁদিয়ে গেছে এলাকাবাসীকে। শব্দের উৎস ধরে রাতের অন্ধকারে ওই পরিত্যক্ত ভবনে গিয়ে এক বৃদ্ধাকে আবিষ্কার করেন প্রতিবেশীরা। এরপর বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা।
ওই রুগ্ন বৃদ্ধ নারী জানান, তার নাম ময়মন বেগম। বয়সের হিসেবে শতক হাকিয়েছেন অনেক আগেই। দুই ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের জননী তিনি। ১৯৮৮ সালে বন্যার সময় মারা যান তার স্বামী। বছর দশেক আগে ছোট ছেলেটাও ক্যান্সারে মারা যায়। বড় ছেলে নয়েজ মিয়া। মাছের ব্যবসা করেন। একই বাড়িতে থেকেও মাকে দু’মুঠো ভাত পর্যন্ত দেন না তিনি। মেয়ে জয়ফুন বেগম। একই এলাকায় বিয়ে হয়েছে। তিনিও এখন বুড়ো মায়ের খবর পর্যন্ত নেন না। তাই টাঙ্গাইলের বাসাইল পূর্ব পাড়ার একটি ঝুঁপড়িতে থাকেন বৃদ্ধ ময়মন বেগম। কিন্তু সম্প্রতি বন্যার পানি ওঠায় নিজের ঘরটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এ নারী। গত মঙ্গলবার (২২ আগস্ট) বিকালে তিনি এক আত্মীয়ের বাড়িতে যান থাকার জন্য। কিন্তু সন্ধ্যা নামার পরে আত্মীয়রা তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিত্যক্ত ভবনে ফেলে রেখে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাসাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিত্যক্ত ভবনে কয়েকদিন থেকে অবস্থান নিয়েছেন বন্যাদুর্গত ঘরহারানো কয়েকজন মানুষ। এখন সেখানেই আছেন ময়মন বেগম। গত কয়েক দিন ধরেই অনাহারে-অর্ধহারে কিংবা পাশে থাকা অন্যের খাবার খাচ্ছেন এ শতবর্ষী নারী।
ময়মন বেগম বলেন, ‘বেটা-বেটিরাই আমার খোঁজ নেয় না। আর ক্যারা খোঁজ নিব।’ এসময় আবেগঘন কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহ জানি কেউরে বুড়ি না বানায়। আমার বেটা-বেটিগো জানি আল্লাহ এতো বুড়া না বানায়। আমি নয় কোন রহমে চইল্যা গেলাম। ওগো পুলাপানের নিগ্যা ওগো এরহম অবস্থা অইলে অরা তো কুলাইব্যার পারবো না।’
এ বৃদ্ধ মায়ের জন্য সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতা অথবা কোনও নিরাপদ আশ্রমের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ ব্যাপারে বাসাইল পৌর মেয়র মজিবর রহমান বলেন, ‘বৃদ্ধাকে আমি চিনি। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিত্যক্ত ভবনে যে তিনি পড়ে আছেন তা আমার জানা ছিল না। আমি এখনি খোঁজ নিয়ে একটি ব্যবস্থা করবো।’