বগুড়ায় ২২ শতক জায়গা দখলমুক্ত করেছে জেলা প্রশাসন

বগুড়ায় ২২ শতক জায়গা দখলমুক্ত করেছে জেলা প্রশাসন বগুড়া শহরের জিরো পয়েন্ট সাতমাথা এলাকায় মাড়োয়ারি ধর্মশালার নামে দখল করা ২২ শতক জায়গা শনিবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে দখলমুক্ত করেছে জেলা প্রশাসন। শুক্রবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দু’পক্ষের বৈঠকে মাড়োয়ারি নেতারা কাগজপত্র দেখতে ব্যর্থ হওয়ায় জেলা প্রশাসন শনিবার সকাল ১০টার মধ্যে দখলমুক্ত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তারা সরে না যাওয়ায় শনিবার দুপুরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আমিরুল ইসলামের নেতৃত্বে দখলমুক্ত করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার (১২ অক্টোবর) গভীর রাতে পুলিশের উপস্থিতিতে যুবলীগ কর্মীরা স্টীল সিটের প্রাচীর দিয়ে জায়গাটি দখল করে। এতে ভেতরে রূপালী ব্যাংক জোনাল শাখাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আমিরুল ইসলাম ও সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হাবিবুল হাসান রুমি জানান, ২২ শতক সম্পত্তি অর্পিত ‘ক’ তালিকাভুক্ত। ভুলক্রমে হোল্ডিং খুলে খাজনা আদায় করা হলেও ১৪২১ সাল থেকে তা বন্ধ হয়ে গেছে। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ সম্পত্তি সরকারের। এখানে থাকা সব স্থাপনা অবৈধ। মাড়োয়ারি সম্পত্তির নামে অবৈধভাবে দখল করা হয়েছিল। আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত জেলা প্রশাসক এ জমির কাস্টডিয়ান।

বগুড়া সদর উপজেলা ভূমি অফিস সূত্র জানায়, সুত্রাপুর মৌজার ২২ শতাংশ সম্পত্তি ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তের পর শত্রু সম্পত্তি ঘোষণা হয়। ১৯৬২ সালে রমজান আলীর নামে এমআর খতিয়ান হয়। সরকার ১৯৭৬ সালে মিস কেসমূলে সম্পত্তিটি খাস ঘোষণার উদ্যোগ নেয়। সরকারের এ উদ্যোগের প্রেক্ষিতে ওই বছর সম্পত্তিটি মাড়োয়ারি ধর্মশালা দাবি করে আদালতে একটি মামলা করা হয়। ২০০৩ সালে মাড়োয়ারি ধর্মশালার পক্ষে পৃথক রিট হয়েছিল। পরে সে রিট খারিজ হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০১৩ সালে মাড়োয়ারি ধর্মশালার পক্ষে বগুড়ার অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যাবর্তন ট্রাইব্যুনালে আরেকটি অবমুক্ত মামলা করা হয়। আগামী ২৯ অক্টোবর এ মামলার শুনানির দিন ধার্য আছে।

মাড়োয়ারি ধর্মশালা কমিটির সভাপতি কল্যাণ প্রসাদ পোদ্দার দাবি করেন, তারা ২০১৬ সালের ১৮ জানুয়ারি ধর্মশালার পক্ষে রায় পেয়েছেন এবং পরে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত করতে আদালতে পৃথক মামলা করেছেন।

স্থানীয়রা জানান, মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগের কিছু দায়িত্বশীল নেতাকর্মী ও মাড়োয়ারিরা শতকোটি টাকা মূল্যের এ সম্পত্তি গ্রাসের পরিকল্পনা করেন। কোন একটি বৃহৎ এনজিও তাদের সার্বিক সহযোগিতা ও কিছু অর্থ বিনিয়োগ করে। সেখানে ১৪তলা ভবন নির্মাণের জন্য একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে যুবলীগের বেশ কয়েকজন ক্যাডার শহরের সাতমাথায় মোটর বাইক নিয়ে মহড়া দেবার পর স্টীল সিটের প্রাচীর দিয়ে ওই সম্পত্তি দখল করেন। দখলের সময় জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা ফোন করে বিষয়টি সাংবাদিকদের অবহিত করে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন। ধর্মশালা কমিটির সভাপতি কল্যাণ প্রসাদ পোদ্দার জানিয়েছেন, ডেভেলপার কোম্পানি বৈধভাবে তাদের সম্পত্তি ঘিরে নেয়। এ সময় জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক সাগর কুমার রায়, জেলা যুবলীগের সভাপতি শুভাশীষ পোদ্দার লিটন ছাড়াও ধর্মশালার কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। শুভাশীষ পোদ্দার লিটন ওই সময় তার উপস্থিত থাকার কথা অস্বীকার করলেও সাগর কুমার রায় স্বীকার করেছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে সম্পত্তি দখলের পর শনিবার সকালে জানাজানি হয়। ভেতরে রূপালী ব্যাংক জোনাল শাখাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অবরুদ্ধ হয়। শতাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বেকার হয়ে আহাজারি করেন। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে জেলা প্রশাসক নুরে আলম সিদ্দিকী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হাবিবুল হাসান রুমিকে নির্দেশ দেন। তিনি শুক্রবার সন্ধ্যায় দু’পক্ষকে তার কার্যালয়ে ডেকে কাগজপত্র দেখেন। কিন্তু মাড়োয়ারি নেতারা ওই সম্পত্তি দখলের স্বপক্ষে কাগজ দেখাতে ব্যর্থ হন।

হাবিবুল হাসান রুমি জানান, শনিবার সকাল ১০টার মধ্যে সম্পত্তি দখলমুক্ত করতে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

স্থানীয়রা জানান, দখলবাজরা সম্পত্তি দখলের পর সেখানে মাড়োয়ারি ধর্মশালার নামে ব্যানার টানিয়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসন উচ্ছেদের সময় ওই ব্যানারসহ ছবি সংগ্রহ করবে। আর এ ছবি বিভিন্ন দূতাবাসে পাঠিয়ে মাড়োয়ারিদের ওপর সরকার নির্যাতন করছে এমন প্রচারনা চালানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু শনিবার দুপুরে প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান শুরুর আগেই নিতেন্দ্র নাথ দত্ত নামে এক ব্যক্তি ওই ব্যানারটি খুলে নিয়ে যান। তিনি নিজেকে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি আবার জেলা প্রশাসনের লোকজন পরিচয় দেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পত্তি দখলমুক্ত করা না হলে দুপুর ২টার দিকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আমিরুল ইসলামের নেতৃত্বে দখলমুক্ত করা হয়েছে। এ সময় সদর থানার ওসি (অপারেশন) আবুল কালাম আজাদ ছাড়াও বিপুল সংখ্যক ফোর্স মোতায়েন ছিল।