রাসমেলায় সুন্দরবনে হরিণ শিকার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা, সতর্ক বন বিভাগ

রাসমেলা (ফাইল ছবি)সুন্দরবনের দুবলার চরে আগামী বৃহস্পতিবার (২ নভেম্বর) থেকে শুরু হচ্ছে তিন দিনের রাস পূর্ণিমা উৎসব। আগের বছরগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন বলছে, তীর্থযাত্রীদের সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ নিয়ে রাসমেলা নামে পরিচিত এই উৎসবের সময়েই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে হরিণ শিকার চক্র। এ কারণেই কঠোর পদক্ষেপ ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনগুলো। আর বন বিভাগ বলছে, হরিণ শিকারের সহায়ক কোনও ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে দর্শনার্থীরা যেন সুন্দরবনে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি সংগঠন জনউদ্যোগ খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘রাসমেলাকে ঘিরে প্রতিবছর হরিণ শিকারিদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এই সময়ে প্রচুর তীর্থযাত্রী সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ পায়। তাদের ভিড়ে মিশে গিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য তৎপর থাকে শিকারিরা। এ বছরের রাসমেলাকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে তারা ছদ্মবেশ নিয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। অনেকে বনজীবী সেজে বনবিভাগ থেকে মাছ ও কাঁকড়া ধরার পারমিট নিয়ে হরিণ শিকারের ফাঁদসহ বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে ঢুকে পড়ছে।’ আশপাশের আটটি উপজেলার শতাধিক শিকারি হরিণ নিধনে মেতে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
বেসরকারি সংগঠন সেফের সমন্বয়কারী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সারাবছর সুন্দরবন থেকে যে পরিমাণ হরিণ শিকার হয়, রাসমেলাকে ঘিরে তার চেয়ে বেশি হরিণ শিকার হয়ে থাকে। নাইলনের ফাঁদ, জাল, স্প্রিং বসানো ফাঁদ, বিষটোপ, কলার মধ্যে বড়শি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা ফাঁদ ছাড়াও তীর বা গুলি ছুঁড়ে ও পাতায় চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে হরিণ ধরা হয়।’
রাসমেলায় হরিণ শিকার বন্ধে তাই জনউদ্যোগ খুলনার পক্ষ থেকে আট দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিতে বলা হয়েছে, রাসমেলার সময় অনুমতিপত্র ছাড়া কোনও ধরনের নৌযান সুন্দরবনে যেন প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনও নৌযান যেন হরিণ বা অন্য কোনও পশু শিকারের সরঞ্জাম বহন না করতে পারে, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, চিহ্নিত শিকারিদের বনে যাওয়ার অনুমতি না দেওয়া, বিশৃঙ্খলভাবে ফানুস ওড়ানো বন্ধ করা, নিরাপত্তার জন্য র্যা ব, পুলিশ কোস্টগার্ডসহ বনপ্রহরীর সংখ্যা বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছে জনউদ্যোগ।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, রাসমেলার জন্য আটটি নিরাপদ রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি যাত্রী এসব রুটের যেকোনও একটি ব্যবহারের অনুমতি পাবেন। তারা বনের ভেতরে ইচ্ছামতো কোনও রুট ব্যবহার করতে পারবেন না। বনে ঢোকা প্রতিটি যানবাহনেই বিএলসি বা সিরিয়াল নম্বর লেখা থাকতে হবে বলে জানান তিনি।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বশিরুল আল-মামুন বলেন, ‘নির্দিষ্ট রুটগুলোতে বন বিভাগ, পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ড সদস্যরা টহলে থাকবে। হরিণ শিকার যেন না হয়, তা নিয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেবল হরিণ শিকারই নয়, তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়াসহ আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত সদস্যরা সার্বিক বিষয়েই সার্বক্ষণিক নজরদারি করবেন।’
উল্লেখ্য, রাসমেলার জন্য অনুমোদিত আটটি রুট হলো— বুড়িগোয়ালিনী, কোবাদক থেকে বাটুলানদী-বলনদী-পাটকোষ্টা হয়ে হংসরাজ নদী হয়ে দুবলারচর; কদমতলা থেকে ইছামতি নদী, দোবেকী হয়ে আড়পাঙ্গাসিয়া-কাগাদোবেকী হয়ে দুবলার চর; কৈখালী স্টেশন হয়ে মাদার গাং, খোপড়াখালী ভাড়ানী, দোবেকী হয়ে আড়পাঙ্গাসিয়া-কাগাদোবেকী হয়ে দুবলার চর; কয়রা, কাশিয়াবাদ, খাসিটানা, বজবজা হয়ে আড়ুয়া শিবসা-শিবসা নদী-মরজাত হয়ে দুবলার চর; নলিয়ান স্টেশন হয়ে শিবসা-মরজাত নদী হয়ে দুবলার চর; ঢাংমারী/চাঁদপাই স্টেশন হয়ে পশুর নদী দিয়ে দুবলারচর; বগী-বলেশ্বর-সুপতি স্টেশন-কচিখালী-শেলার চর হয়ে দুবলার চর; শরণখোলা স্টেশন-সুপতি স্টেশন-কচিখালী-শেলার চর হয়ে দুবলার চর।