জানা গেছে, রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় এ বছর এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র তিনটি। উপজেলার সদরের কেন্দ্র পুঠিয়া পি এন উচ্চ বিদ্যালয়ে থেকে অন্য দুইটির দূরত্ব প্রায় ১৮ থেকে ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে পুঠিয়া পি এন উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত কেন্দ্র বানেশ্বর ইসলামী উচ্চ বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক ব্যবহার করতে হয়।
পুঠিয়া পি এন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শামীম উদ্দিন জানালেন, দূরপাল্লার গাড়িগুলো এই মহাসড়ক দিয়ে দ্রুতগতিতে যাতায়াত করে থাকে। এতে করে মহাসড়কের এই অংশে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। আর এর শিকার হতে হয় শিক্ষার্থীদেরও। গত বছরও এক এসএসসি পরীক্ষার্থী এই সড়কেই প্রাণ হারিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। শামীম উদ্দিন বলেন, এসব ঘটনার পরও পরীক্ষাকেন্দ্র নিয়ে সরকারি নিয়মে কোনও বদল আসেনি।
এই প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘জেনারেল ও ভোকেশনাল মিলিয়ে আমার স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী ১০৯ জন। তাদের অন্য কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। এই নিয়মের কারণেই এবার আমাদের দুই পরীক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছে। এ ঘটনায় আমরা মর্মাহত। আমার মনে হয়, আগের মতো বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজ কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা উপকৃত হবে।’
এদিকে, দুর্ঘটনায় প্রশাসনের কিছু করার নেই বলে মন্তব্য করেছেন পুঠিয়া উপজেলা মাধ্যমিক অফিসার জাহিদুল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ধরনের দুর্ঘটনায় তো আমাদের কিছু করার নেই। তবে এই বিদ্যালয়ের (পুঠিয়া পি এন উচ্চ বিদ্যালয়) পরীক্ষার্থীদের অনেক দূরে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়— এ বিষয়টি নিয়ে আমরা আগেও ভেবেছি। এটা বিড়ম্বনার বিষয়। এর আশপাশেই কেন্দ্র থাকা উচিত।’
জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এর আগে দুয়েকবার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু অনেকের অসহযোগিতার কারণে সব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যায় না। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিযোগিতা ও বিভেদ থাকে। তবে এই দুর্ঘটনার পর এই বিষয়টির সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। পুঠিয়া সদরেই আরেকটি কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন। আমরা চাই না, আর কোনও পরীক্ষার্থী যেন দূরে কোথাও পরীক্ষা দিতে গিয়ে প্রাণ হারায়।’
তিনি বলেন, ‘আমার বোনের এক ছেলে, এক মেয়ে। সংসারেও টানাটানি। ছেলে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দরিদ্র পরিবারের ভার নেবে— এমনই চাওয়া ছিল সবার। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় সব আলো নিভে গেলো।’
দুর্ঘটনায় নিহত রাকিব উদ্দিন ও মোস্তাফিজুর রহমানের সহপাঠী ফজলে রাব্বীসহ বেশ কয়েকজনের ভাষ্য, দূরের কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দিতে তাদের সমস্যার মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় দূরপাল্লার গাড়িগুলো শিক্ষার্থীদের নিতে চায় না। ফলে তাদের বাধ্য হয়ে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ভটভটি ভ্যানে চড়তে হয়। আর এসব পরিবহনে দুর্ঘটনার হার অনেক বেশি। নিহত না হলেও পরীক্ষা দিতে গিয়ে ছোট-খাটো দুর্ঘটনায় অনেক পরীক্ষার্থীই আহত হয়েছে বলেও জানায় তারা।
পরীক্ষাকেন্দ্রের বিষয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সচিব ও সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তরুণ কুমার সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পাশাপাশি কেন্দ্র দেওয়ার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করে থাকেন। আমরা সেই সুপারিশ অনুযায়ী যাছাই-বাছাই করে কেন্দ্র নির্ধারণ করে থাকি। এবারেও অনেকগুলো কেন্দ্র বাড়ানো হয়েছে। আগামীতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য আরও কেন্দ্র বাড়ানো হবে।’
শিক্ষা বোর্ডের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সড়কে যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ট্রাফিক পুলিশসহ চালক, যাত্রী— সবাইকে আরও সর্তক হতে হবে। কারণ আমাদের সন্তানদের অকালপ্রয়াণ অত্যন্ত বেদনার। এই দুই পরীক্ষার্থীর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে কাজ করতে চায় শিক্ষা বোর্ড। এর জন্য বোর্ড থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি আমরা নিয়ে রেখেছি।’
উল্লেখ্য, সোমবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার তারাপুর টাওয়ার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান পুঠিয়া পি এন উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী রাকিবুল হোসেন (১৬) ও মোস্তাফিজুর রহমান (১৬) এবং মোস্তাফিজুর রহমানের বাবা সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট আব্দুল মোমিন (৪৫)। জানা গেছে, ছেলে মোস্তাফিজুর ও তার সহপাঠী রাকিবকে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশে মোটরসাইকেলে চড়ে রওনা দেন মোমিন। পথে এক ট্রাকের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই তিন জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহত মোমিনের ভাতিজা মহিদুল ইসলাম পুঠিয়া থানায় মামলা দায়ের করেছেন।