এভাবে আর কতদিন মায়ের কোলে চড়ে ক্লাসে আসবেন রুমকি?

মেয়েকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি ভাঙছেন মা (ছবি– প্রতিনিধি)

দুই পা-সহ কোমর অব্দি শরীরটা বিকল, জন্ম থেকেই। চলাফেরা দূরের কথা, ঠিকঠাক বসার ক্ষমতাও নেই তার। বলতে গেলে বিছানায় শুয়ে-বসেই বড় হয়েছেন। শরীরের এই অবস্থার পরও সেই ছোটবেলা থেকে পড়ালেখার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল তার। বাবা-মাও চেয়েছিলেন, মেয়েকে বসিয়ে না রেখে লেখাপড়া শেখাবেন। যথাসাধ্য সেই চেষ্টা তারা করছেনও এপর্যন্ত। মেয়েকে কোলে করে ক্লাসে নিয়ে গেছেন মা। আর এভাবে মায়ের কোলে চড়ে মেয়ে স্কুলের গণ্ডি পার করেছেন, কলেজেরও।

শেষমেশ ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন রাজিয়া সুলতানা রুমকি। অপেক্ষা এখন শিক্ষক হয়ে মানুষগড়ার কারিগর হওয়ার লক্ষ্যে পৌঁছার। কিন্তু সেটা পারবেন কিনা, তা নিয়ে ইদানিং মনে সংশয় দানা বেধেছে তার। রুমকির ভাষ্য, ‘আমার ক্লাস হয় তিন তলায়। বলাই বাহুল্য, সিঁড়ি ভেঙে আমার পক্ষে ক্লাসে যাওয়া সম্ভব নয়। এখনও আমার মা-ই আমাকে কোলে করে তিন তলায় উঠেন। কিন্তু আমার চল্লিশোর্ধ মায়ের পক্ষে এভাবে সিঁড়ি ভাঙা বিপদজনক। মায়ের কিছু হলে আমাকে তিন তলায় উঠাবে কে?’

রাজশাহী মহানগরীর পাঠানপাড়া এলাকার হাফিজুর রহমানের মেয়ে রাজিয়া সুলতানা রুমকি। রুমকির মা নাজনীন বেগম পেশায় গৃহিণী। ট্রাকচালক বাবা হাফিজুর রহমান ও মা নাজনীন বেগমের দুই সন্তানের মধ্যে রুমকি বড়। প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর বাবা-মায়ের সদিচ্ছায় রুমকি ২০১৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৩৯ অর্জন করেন।

রুমকির সঙ্গে আলাপে জানা যায়, এসএসসি পাশের পর রাজশাহীর মহিলা সরকারি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ২০১৮ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-৪.০৮ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর কোচিং ছাড়াই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। প্রতিবন্ধী কোটায় উর্দু বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগও পান। রুমকির ভাষায়, ‘এটা আমার পরিবারে ঈদের আনন্দ নিয়ে আসে।’

কিছু শিক্ষার্থী হুইলচেয়ারসহ রুমকিকে নিয়ে সিঁড়ি ভাঙছেন (ছবি– প্রতিনিধি)

রুমকি বলে চলেন, ‘কিন্তু এই আনন্দে ভাটা পড়লো অন্য এক কারণে। উর্দু বিভাগের ক্লাস হয় শহীদুল্লাহ কলা ভবনের তিন তলায়। আমার মায়ের পক্ষে সিঁড়ি বেয়ে আমাকে বয়ে নিয়ে তিন তলায় উঠাটা কষ্টকর, বিপদজনকও। এটা বুঝতে পেরে বিষয় পরিবর্তনের জন্য মাইগ্রেশন করি। মাইগ্রেশনে আমার সাবজেক্ট আসে আরবি। কিন্তু আরবি বিভাগের ক্লাসও হয় সেই তিন তলায়।’

রুমকি বলেন, ‘প্রথমত, আমি একা চলাফেরা করতে পারি না। তার  ওপর আমার শহীদুল্লাহ কলা ভবনের তিন তলায় উঠে ক্লাস করা সম্ভব নয়। আজও (৩১ জানুয়ারি) আমার মা-ই আামাকে তিন তলায় নিয়ে গেছেন। কিন্তু সবসময় তো আমার মা আসতে পারবে না। তখন আমাকে তিন তলায় ওঠাবে কে? এ ছাড়া, নিয়মিত ক্লাস না করলে আমি পরীক্ষায় ভালো করতে পারবো না। তাই প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, আমাকে যেন বাংলা বিভাগে ট্রান্সফার করা হয়। কারণ, বাংলা বিভাগের ক্লাস নিচ তলায় হয়।’

বিষয়টি জানার পর রুমকির সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন রাবি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মাহফুজুর রহমান এহসান। রুমকির সমস্যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে আলাপ করেন; রুমকির বিষয় পরিবর্তনের জন্য আবেদন জানান।

এরপর গত বৃহস্পতিবার (৩১ জানুয়ারি) দুপুরে রুমকিকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারীয়ার কাছে যান মাহফুজুর রহমান এহসান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক লায়লা আরজুমান বানু, সহকারী প্রক্টর ও সহকারী অধ্যাপক রবিউল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক গাজী তৌহিদুর রহমান প্রমুখ। সেখানে  বিভাগ পরিবর্তন বা বিকল্প কোনও ব্যবস্থার অনুরোধ জানান এহসান ও রুমকি।

এসময় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারীয়া বলেন, ‘এই সমস্যা  নিয়ে আমরা আগেও বসেছি। কিন্তু এর কোনও সমাধান কেউ দিতে পারেনি। কারণ, ভবনগুলো অনেক আগে তৈরি করা। মানবিক বিষয়গুলো আমরাও বুঝি। কিন্তু হঠাৎ কোনও বিভাগ পরিবর্তন করা যায় না। তাই আপাতত সেখানেই (আরবি) সে ক্লাস করুক। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি বিবেচনা করার চেষ্টা করবো।’ এ ছাড়া, অন্য যেকোনও ব্যাপারে রুমকিকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

রুমকির মা নাজনীন বেগম বলেন, ‘মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিকে রুমকিকে আমি আনা-নেওয়া করেছি। কিন্তু এখন মেয়েকে তিন তলায় উঠানো আমার পক্ষে কষ্টকর। মেয়েকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে গেলে একপর্যায়ে শরীর কাঁপে। তাই প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, মানবিক দিকটা বিবেচনা করে আমার মেয়েকে নিচে কোনও ক্লাস রুমে বা অন্য বিভাগে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হোক।’

উপ-উপাচার্যের দফতরে রুমকি (ছবি– প্রতিনিধি)

ছাত্রলীগ নেতা এহসান বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। ওই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনের কাছে গিয়েছিলাম। তারা মানবিক দিক বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। এর বাইরে অর্থনৈতিক বা  অন্য যেকোনও সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।’

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবগুলো অনেক পুরনো হওয়ায় তাতে কোনও র‌্যাম্প পদ্ধতি বা লিফটের ব্যবস্থা নেই। ভবনগুলোতে প্রবেশের জন্য র‌্যাম্প চালু করার দাবি জানিয়েছে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘পিডিএফ’। এ ছাড়া, নতুন ভবনগুলোতে লিফটের ব্যবস্থারও দাবি জানান তারা।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সংগঠন পিডিএফ-এর সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিষয়ে ইতিবাচক। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই, তারা যেন প্রতিটি একাডেমিক ভবনে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রবেশের জন্য র‌্যাম্প ব্যবস্থা চালু করেন। আর ভবিষ্যতে নতুন যেসব ভবন তৈরি করা হবে, সেখানে যেন লিফটের ব্যবস্থা থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে ১৯০ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন রাবিতে। এর মধ্যে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মেসে অবস্থান করেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত সিট বরাদ্দ রাখলে শিক্ষার্থীদের সুবিধা হতো।’