৪২২ কিলোমিটার নদী এলাকায় মাছ ধরতে নেই মানা

মাছধরা নৌকাচাঁদপুরের মেঘনা নদীসহ দেশের ৪২২ কিলোমিটার নদী এলাকায় মাছ ধরার ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে। মার্চ-এপ্রিল এ দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ মে প্রথম প্রথর থেকেই জেলেরা মাছ ধরতে নদীতে নামার অনুমতি পেয়েছেন। স্বস্তি ফিরে এসেছে চাঁদপুরের ৫১ হাজার জেলে পরিবারে। তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জেলার বিভিন্ন এলাকায় জাটকা শিকার করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, কিছু অসাধু জেলের কারণে কর্মসূচি শতভাগ না হলেও অন্তত ৯০ ভাগ সফল হয়েছে।

চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, সারাদেশে প্রায় ৪২২ কিলোমিটার নদী এলাকায় মার্চ-এপ্রিল মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। আজ পহেলা মে থেকে এ নদী এলাকায় জেলেরা মাছ ধরতে পারবেন।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য অফিস জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গত দুই মাসে মাছ শিকারের অপরাধে ১৪৭ জন জেলেকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে এক জনকে দুই বছর, ১৩৯ জনের এক বছর এবং সাত জনকে এক মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া ১৫৮টি অভিযানের মাধ্যমে জাটকা জব্দ করা হয়েছে ১৬.৫১১ মেট্রিক টন, তিন লাখ চিংড়ি রেণু, ২৭২.১৪৭ লাখ মিটার কারেন্ট জাল, ৯টি ইঞ্জিন চালিত নৌকা জব্দ করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ১৭১টি। ৩৮ জনের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়েছে এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

জাতীয় মাছ ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার প্রতি বছরের অক্টোবর মাসে মা ইলিশ ১১দিন ও জাটকা ইলিশ রক্ষায় মার্চ-এপ্রিল দুই মাস নদীতে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে মেঘনা নদীর মতলব উত্তরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত  ১০০ কিলোমিটার নদী এলাকায় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ। আর এ কারণে চাঁদপুর সদর, হাইমচর, মতলব দক্ষিণ ও উত্তর উপজেলার ৫১ হাজার ১৮৯ জন জেলে কর্মহীন হয়ে পড়ে। মাছ ধরতে ইতোমধ্যে জাল-নৌকা মেরামতসহ সব প্রস্তুতি নিয়েছেন জেলেরা।

হরিণা ফেরীঘাট এলাকার জেলে জলিল গাজী জানান, সরকারি নিষেধাজ্ঞা সময়ে তারা নদীতে মাছ আহরণ করেন না। সরকার যেটুকু সহযোগিতা করে, তা দিয়ে কোনও রকমে তাদের সংসার চলে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেই তারা মাছ আহরণে নামবেন। সেই জন্যে অপেক্ষার প্রহর গুনার পাশাপাশি জাল ও নৌকা প্রস্তুত করছেন।

লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের বহরিয়া এলাকার জেলে জব্বার গাজী জানান, ‘আমরা সরকারি নিষেধাজ্ঞা মানলেও কিছু মৌসুমি জেলে তা মানছে না। তারা রাতভর এমনকি দিনের বেলাতেও অবাধে জাটকা নিধন করেছে। তাহলে এই ধরনের অভিযান কিংবা জাটকা রক্ষা কর্মসূচি দিয়ে কী লাভ?’

একই এলাকার জেলে শাহজাহান গাজী জানান, ‘অভয়াশ্রমের দুই মাস আমরা নদীতে মাছ শিকার করি না। সরকার এই সময়ের জন্য ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রত্যেক জেলেকে ৪০ কেজি করে খাদ্য সহায়তা হিসেবে যে চাল দেয়, সেটা পেয়েছি। কিন্তু আমাদের পেশা জেলে হওয়ার কারণে এই সময়ে অন্য কোনও কাজে যোগ দেই না। ১ মে থেকে মাছ আহরণের প্রস্তুতি নিয়েছি।’

ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চুরি করে কেউ কেউ মাছ ধরেছে। তবে আমরা গবেষণা দেখেছি, এ বছরও কাঙ্ক্ষিত মাত্রার ইলিশ উৎপাদন অব্যাহত থাকবে। তবে ১ মে থেকে মাছ ধরা শুরু হলেও জেলেরা যেন ৯ ইঞ্চির নিচে থেকে জাটকা না ধরা ধরে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আসাদুল বাকী জানান, গত দুই মাসে ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ প্রশাসন, কোস্টগার্ড এবং মৎস্য বিভাগ ইলিশ সংরক্ষণে এবং জাটকা রক্ষায় সাড়ে চার শতাধিক অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দেড় শতাধিক জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। প্রায় অর্ধকোটি বর্গমিটার কারেন্ট জাল জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। অভিযান চালিয়ে ১৬ মেট্রিক টন জাটকা আটক করে  গরিব-দুঃস্থ ও এতিমদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।