চাঁপাইনবাবগঞ্জে দিনে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জমে উঠেছে আমের বাজারহরেকরকম আমের ম ম গন্ধে জমে উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাজার। আমনির্ভর অর্থনীতি পাল্টে দিচ্ছে গ্রামীণ জনপদের দৃশ্যপট। এবার আমের দাম ভালো থাকায় লাভের মুখ দেখছেন বাগান মালিক, আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা।

গত কয়েক বছর আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রচুর পরিমাণে আমের উৎপাদন হয়েছে। তবে ফরমালিন আতঙ্ক, সারাদেশে সামগ্রিকভাবে আমের উৎপাদন বেড়ে যাওয়া, বিদেশে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে আম রফতানি না হওয়া, আম পাড়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং আম পাকার সময় অসম্ভব গরমে একসঙ্গে আম পেকে যাওয়ায় দাম পাননি এ অঞ্চলের আমচাষিরা। তবে এবার বাজার ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। এবার উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রশাসনিক নজরদারির কারণে পরিপক্ব ও বিষমুক্ত আমই বাজারজাত হচ্ছে এবং দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। আম বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে চাঙা হয়ে উঠেছে নানা ধরনের ব্যবসা কার্যক্রম।চাঁপাইনবাবগঞ্জে জমে উঠেছে আমবাজার

সরেজমিন দেশের বৃহত্তম কানসাট আমবাজার, সদরঘাট আমবাজার ও ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশন বজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের আগমনে এবং ক্রেতা বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখর আমবাজারগুলো। গত এক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে আম বেচাকেনা চললেও ঈদের সপ্তাহখানেক পর দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের আগমনে চাঙা হয়ে উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাজারগুলো। দেশসেরা খিরসাপাত, গোপালভোগ, ল্যাংড়া ও নানা জাতের গুটি আম এখন পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এসব বাজার ও জেলার বিভিন্ন আম বাগান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ট্রাক আম দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। আর প্রতিদিনই জেলা জুড়ে কেনাবেচা হচ্ছে প্রায় ২৫-৩০ কোটি টাকার আম।

এবার মৌসুমের শুরুতেই গাছভর্তি মুকুল স্বপ্ন দেখিয়েছিল আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিদের। তবে মুকুলের শুরুতেই বৃষ্টিপাত, পরবর্তী সময়ে গুটি অবস্থায় মিজ পোকার আক্রমণ, ঝড় ও শিলাবৃষ্টি বাদ সাধায় সে স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। তবে আমের উৎপাদন কম হলেও গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারই সর্বোচ্চ দাম পাওয়ায় আমচাষিরা খুশি। কয়েক বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশাও করছেন তারা।চাঁপাইনবাবগঞ্জে জমে উঠেছে আমের বাজার

বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন জাতের আমের জন্য বিভিন্ন ধরনের দাম পাচ্ছেন বিক্রেতারা। আম ব্যবসায়ী ও  শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ইসমাঈল খান শামীম জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে কানসাটসহ জেলার অন্যান্য আমবাজারগুলোতে কোয়ালিটি অনুযায়ী খিরসাপাত বিক্রি হচ্ছে ৩০০০ থেকে ৪৫০০ টাকায়, ল্যাংড়া বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ থেকে ২৫০০ টাকায়, লক্ষণা বিক্রি হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় এবং নানা জাতের গুটি আম বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে। তিনি আরও বলেন, ‘ল্যাংড়া, লক্ষণা ও গুটি আমের দাম গত এক সপ্তাহ থেকে একইরকম থাকলেও প্রতিদিনই বাড়ছে খিরসাপাত আমের দাম। এখন আর আমের দাম কমার কোনও সম্ভাবনা নেই। চলতি সপ্তাহে প্রতিটি জাতের আমের দাম আরও বাড়বে।’

কানসাট আমবাজারে কথা হয় আমচাষি বাবুর সঙ্গে। তিনি জানান, ‘এবার আমের উৎপাদন কম হলেও ভালো দাম পাওয়ায় আমরা খুশি। গতবারের চেয়ে এবার আমের চাহিদাও ভালো।’চাঁপাইনবাবগঞ্জে জমে উঠেছে আমের বাজার

আরেক আমচাষি শাহজালাল জানান, ‘এবার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আমের উৎপাদন কম হলেও শুরু থেকেই আমরা ভালো দাম পাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত এই দাম অব্যাহত থাকলে আশা করছি এবার বিগত সময়ের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারবো।’ 

ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশন আমবাজারে গিয়েও দেখা যায় এবার আমের দাম পাওয়ায় আমচাষিদের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। তবে হিমশিম খাচ্ছেন ক্রেতা ও বাইরে থেকে আম কিনতে আসা ব্যবসায়ীরা। বাইরে থেকে আম কিনতে আসা ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার আমের উৎপাদন অনেক কম হওয়ার কারণেই দাম চড়া, যা গতবারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। তবে এখানকার আমের চাহিদা দেশব্যাপী এবং সুস্বাদু হওয়ায় বেশি দাম দিয়েই তারা আম কিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মোকামগুলোতে পাঠাচ্ছেন।চাঁপাইনবাবগঞ্জে জমে উঠেছে আমের বাজার

এদিকে, আম মৌসুমে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে জেলার অর্থনীতি। আম পাড়া, পরিবহন, প্যাকিং ও বাজারজাতকরণে বেড়েছে মৌসুমি কর্মসংস্থানও। আড়তগুলোতে কর্মব্যস্ততা তাই চোখে পড়ার মতো। আড়তদার ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সামনের দিনগুলোতে এই ব্যস্ততা আরও বাড়বে। বাড়বে কেনাবেচার পরিমাণ।

কানসাট আম আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক টিপু জানান, ‘এখন ভরপুর আমের মৌসুম। কানসাট আমবাজারে প্রতিদিন ১৫-২০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হচ্ছে। সব বাজার মিলিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে দিনে ২৫-৩০ কোটি টাকার আমবাণিজ্য হচ্ছে। দামও ভালো পাচ্ছেন চাষিরা। বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও কোনও সমস্যা নেই। এখন বাজারে খিরসাপাত, ল্যাংড়া, লক্ষণা ও নানাজাতের গুটি আম বেচাকেনা হচ্ছে। এরপরই বাজারে আসবে ফজলি, আম্রপালি ও আশ্বিনা জাতের আম। আশা করছি, সামনের দিনগুলোতে এই বেচাকেনার পরিমাণ আরও বাড়বে। তবে এখানকার আম রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাওয়ার পথে ট্রাকপ্রতি দুই-তিন হাজার টাকা চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে।’চাঁপাইনবাবগঞ্জে জমে উঠেছে আমের বাজার

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মঞ্জুরুল হুদা বলেন, ‘কৃষি বিভাগের নানা উদ্যোগ এবং সরকারি নজরদারিতে আমে বালাইনাশক ব্যবহার গত কয়েক বছরে কমেছে। যদিও এ অঞ্চলের চাষিরা আম উৎপাদনে রোগবালাই ও ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ ঠেকাতে বালাইনাশক ছাড়া আমে অন্য কোনও ক্ষতিকর রাসায়নিক (ফরমালিন, কেমিক্যাল) ব্যবহার করেন না। এর ফলে আমের প্রকৃত স্বাদ রক্ষা হওয়ায় দেশ-বিদেশে আমের চাহিদা আরও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।’

উচ্চ আদালতের নির্দেশে জেলার আমবাগানগুলোতে প্রশাসনের নজরদারি জোরদার থাকায় এবার পরিপক্ব, বিষমুক্ত ও শতভাগ নিরাপদ আমই বাজারজাত হচ্ছে বলে জানান জেলা প্রশাসক এজেডএম নুরুল হক। তিনি বলেন, ‘পুরো আম মৌসুমে এই নজরদারি  অব্যাহত থাকবে এবং ভোক্তারা নিরাপদ আমই খেতে পারবেন এবার।’

কৃষি বিভাগের তথ্যানুয়ায়ী গোটা জেলায় এবার আমের আবাদ হয়েছে ৩১ হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে। যার সম্ভাব্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন।

আরও পড়ুন- জমে উঠছে রাজশাহীর আমের বাজার