নির্ভার নিঃশ্বাস নিচ্ছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী স্বজনেরা

 

১. বধ্যভূমিতে বুদ্ধিজীবীদের লাশ- ছবি রশিদ তালুকদার

১৯৭১ এর ডিসেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে পরাজয় নিশ্চিত জেনে দেশের মেধা বিনাশের ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজে নামে পাকিস্তান বাহিনী। সঙ্গে এ দেশের দোষর, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস। ২৫ মার্চ থেকে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা শুরু করলেও শেষ কামড় দেয় ১৪ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবী দিবসের সংকলন আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন নিউজ উইক-এর সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের লেখা থেকে জানা যায়, শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা মোট এক হাজার ৭০ জন।

২. শহীদ ডা. আলীম চৌধুরীর পারিবারিক ছবি- ক্রেডিট নূজহাত চৌধুরী 

ডা. আলীম চৌধুরীর পরিবারের ছবি, ক্রেডিট নুজহাত চৌধুরী

 

১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরপরই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্বজনেরা মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তাদের গলিত ও ক্ষতবিক্ষত লাশ খুঁজে পায়। স্বজনদের বয়ানে ফিরে পাওয়া বুদ্ধিজীবীদের লাশে ছিল অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন; চোখ, হাত-পা ছিল বাঁধা। কারো কারো শরীরে ছিল একাধিক গুলি। অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে। লাশের ক্ষত চিহ্নের কারণে অনেকেই প্রিয়জনের মৃতদেহ শনাক্ত করতে পারেননি।

স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর প্রিয়জন হারানো বেদনা স্বজনদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ালেও এখন অনেকটা ভারমুক্ত নিশ্বাস নিতে পারছেন বলে জানিয়েছেন তারা। কারণ, যাদের পাশবিকতায় নিমিষে তারা অনিশ্চিত জীবনের পথে চলে গিয়েছিলেন, বিজয়ের চরম সময়ে পাননি বিন্দুমাত্র আনন্দ, করতে পারেননি বিজয় উৎযাপন সেই খুনিদের বিচার নিশ্চিত করা গেছে। ইতোমধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত রাজাকারের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।

শহীদ ড. ফজলে রাব্বীর মেয়ে নুসরাত রাব্বী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ১৯৭১ সালে অনেক পরিবারই বাবাকে হারিয়ে টিকে থাকতে পারেনি। আমার মায়ের মতো যুদ্ধে স্বামীহারা নারী সারাজীবন যে অসাধারণ সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, তাঁর প্রতি আমি সব সময় কৃতজ্ঞ। ১৯৭১ সালে আমরা ৭৫ সিদ্ধেশ্বরীর জলপাইগুড়ি হাউজে থাকতাম। বিজয়ের একদম কিছু মুহূর্ত আগে ১৫ তারিখে বাবাকে অপহরণ করে নিয়ে হত্যা করা হয়।

৩. শহীদ ফজলে রাব্বী ও তার সন্তান নূসরাত রাব্বী 

ছবি শহীদ ডা. ফজলে রাব্বী ও তার মেয়ে নূসরাত রাব্বী

 

বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী নূসরাত বাংলাদেশ এসেছিলেন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দিতে। সেদিনে তিনি বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বলেন, ১৫ ডিসেম্বর বিকাল ৩টার দিকে আল-বদরের লোকজন তাদের বাড়িটি ঘিরে ফেলে। তাদের সঙ্গে কাদামাখা একটি মাইক্রোবাস ছিল। ওই বাসে উঠিয়েই তার বাবাকে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন দেশ নিয়ে কী ভাবেন জানতে চাইলে উত্তরে বলেন, ১৯৭১ সালের অপরাধীদের বিচার করে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারছে এটা বেশ গর্বের। বাংলাদেশি জনগণের নিরন্তর প্রয়াস এবং প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। আমার মনে হয় না বিচারহীনতার মধ্যে হাজারো শহীদের আত্মা শান্তিতে ছিল। তিনি আরও বলেন, একেকটা ফাঁসি গণহত্যার অন্ধকার যুগ থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করছে। নূসরাত মনে করেন, আজকে বুদ্ধিজীবীদের যারা হত্যাচেষ্টায় লিপ্ত তাদেরকেও কোনও ছাড় দেওয়া ঠিক হবে না। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে যে গণহত্যা ঘটেছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং আমাদের সংঘবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে সেটার ঐতিহাসিক প্রভাব তুলে ধরার কাজটি করে যেতে হবে। এবং পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের অবশ্যই হাজারো হত্যা, ধর্ষণ ও দেশত্যাগে বাধ্য করার কারণে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

শহীদ ডা. আলীম চৌধুরী ও শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী

ছবি: শহীদ ডা আলীম চৌধুরী ও শহীদ জায়া শ্যামলী নাজরীন চৌধুরী

 

সংগ্রামী নারী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীর বিয়ে হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আলীম চৌধুরীর সঙ্গে। একাত্তরে এই পরিবারটি গোপনে মুক্তিযুদ্ধে নানা সহযোগিতা দিয়েছেন। ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে আল-বদর বাহিনীর সদস্যরা ডা. আলীমকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। বধ্যভূমিতে দেশের অন্যান্য সূর্যসন্তানদের সঙ্গে তাঁর লাশও পাওয়া যায়।

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যদানকালে জবানবন্দিতে শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে আল-বদর বাহিনীর তিন সদস্য আমাদের পুরানা পল্টনের ভাড়া বাসায় আসে। সেই বাহিনীর সদস্যরা আমার স্বামী আলীম চৌধুরীর চোখ বেঁধে তাঁকে মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যায়। এ সময় আলীম চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে একজন আল-বদর সদস্য জানায়, আল-বদরের হাই-কমান্ড মতিউর রহমান নিজামীর নির্দেশে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

বিজয়ের পর বধ্যভূমিতে কেমন ছিল লাশের পরিস্থিতি বিবরণ করতে গিয়ে এই সাহসী শহীদজায়া বলেন, ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে অনেক বুদ্ধিজীবীর লাশের সঙ্গে আলীম চৌধুরীর লাশ পাওয়া যায়। তাঁর হাত পেছনে বাঁধা ছিল। এছাড়া গামছা দিয়ে তাঁর চোখ বাঁধা ছিল এবং সারা শরীরে বেয়নেটের অনেক আঘাত ও বুকে অনেক গুলির চিহ্ন ছিল। স্বাধীনতার পর দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীর একাকী সংগ্রাম শুরু হয়।

শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের চোখ ভেসে গেছে জলে, বুকে নেমে আসে কষ্টের পাথর। আজ ৪৪ বছর পর যখন সেই খুনিদের একের পর এক বিচার সম্পন্ন হচ্ছে তখন আমাদের পাথর নামতে শুরু করেছে। সর্বশেষ বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী মুজাহিদের ফাঁসির মধ্য দিয়ে সেই চোখে এবারের বিজয় অন্যরকম। এবার আমরা উদযাপনের স্বপ্ন দেখতে পারি। এতদিন যে কষ্ট বুকে বয়ে বেড়িয়েছি সে কষ্ট লাঘব হয়েছে।

 GuhathakurtaJyotirmoy

ছবি: শহীদ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও শহীদ মেঘনা গুহঠাকুরতা

 

আরেক বুদ্ধিজীবী শিক্ষক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে হত্যা করা হয় ২৫ মার্চ অপরারেশন সার্চলাইটে। সেই রাতে পাক সেনারা জোর করে তাঁকে ঘরের বাইরে টেনে নিয়ে যায়। নাম, ধর্ম নিশ্চিত হয়েই গুলি করা হয় তাঁকে। একটা গুলি ভেদ করে গেল তাঁর গ্রীবা। আবার একটি গুলি বিদ্ধ করল তাঁর কোমর। তারপরও তিনদিন বেঁচে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা। তার সন্তান মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মধ্য দিয়ে শহীদদের আত্মা শান্তি পেয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করা হয় এই প্রেরণা থেকে যে, তারা যে মুক্তবুদ্ধি চর্চার মাধ্যমে স্বাধীনতা স্বাধীকার আন্দোলনের দিকে যাচ্ছিলেন সেটা দমনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আজ যারা মুক্তবুদ্ধি চর্চা করছে তাদের ওপর একই কায়দায় হামলা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে আমি একটা ধারাবাহিকতা দেখি এবং তার জন্য আমাদের এ বিজয় দিবসটাকে ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন মুক্তবুদ্ধি চর্চা নির্বিঘ্নে করতে পারে এরকম সমাজের লক্ষে এগুতে হবে।

 

/এএইচ/