খাগড়াছড়িতে ফল পরিবহনে অতিরিক্ত চাঁদা-ট্যাক্স-টোল!




পাহাড়ে উৎপাদিত বিভিন্ন ফল ট্রাকে করে যায় দেশের নানা প্রান্তেখাগড়াছড়ি জেলায় উৎপাদিত আমসহ বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল পরিবহনে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। ফল উৎপাদন ও পরিবহনে চাঁদা, তিন পৌরসভা ও জেলা পরিষদের অতিরিক্ত ট্যাক্স-টোল আদায়ে এখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন তারা। হয়রানি বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি উঠেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. মুর্তজা আলী জানান, চলতি বছর তিন হাজার ২৪৪ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের আম চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৯ মেট্রিক টন হারে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তার চেয়ে বেশি উৎপাদন হয়েছে। তবে যে হারে ঘাটে ঘাটে ট্যাক্স ও টোলের নামে টাকা দিতে হয়, তাতে কৃষকের লাভ হচ্ছে না। খাগড়াছড়ির মতো বাংলাদেশের আর কোনও জেলায় উৎপাদিত কৃষি সামগ্রীর ওপরে এত ট্যাক্স-টোল নেই বলেও জানান তিনি।

খাগড়াছড়ি ফলদ বাগান মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি দিবাকর চাকমা বলেন, খাগড়াছড়িতে এ বছর আম্রপালি আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে এমনিতেই পরিবহন ভাড়া অনেক বেশি। খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রামের ভাড়া ১০-১২ হাজার টাকা, ফেনীর ভাড়া ৬-৭ হাজার টাকা, ঢাকার ভাড়া ১৫-১৬ হাজার টাকা এবং স্থানভেদে আগের তুলনায় দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এর ওপর বিভিন্ন স্থানে চাঁদা-ট্যাক্স-টোল মিলিয়ে খরচ পড়ে আরও ১৫/২০ হাজার টাকা। আর এসব দিতে দিতে কৃষকের মাথায় হাত।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, খাগড়াছড়ি পৌরসভার সীমানা হচ্ছে শহরের চেংগী ব্রিজ পর্যন্ত। কিন্তু পৌরসভা এখন আরও এক কিলোমিটার দূরে জিরোমাইল এলাকায় গিয়ে ট্যাক্স-টোল ওঠাচ্ছে। পৌর টোল কেন্দ্র পৌরসভায় উৎপাদিত ফলমূল ও কাঁচামালের ওপর ট্যাক্স-টোল নেওয়ার কথা থাকলেও তা না করে পৌরসীমার বাইরে জিরোমাইলে গিয়েও জেলার মহালছড়ি উপজেলা, পাশের রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার উৎপাদিত সামগ্রীর ওপরেও টোল আদায় করছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি গাড়ির ভাড়ার পাশাপাশি ১০-১৫ হাজার টাকা যদি ট্যাক্স-টোল দিতে হয়, তাহলে কৃষকেরা কোথায় যাবে?

মারমা বাগান মালিক সমিতির সভাপতি বাবুশ্যি চৌধুরী বলেন, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা থেকে ফল পরিবহন করতে স্থানীয় পৌরসভার টোল কেন্দ্রগুলো গাড়িপ্রতি ১০০ টাকা করে নেওয়া হলেও খাগড়াছড়ি পৌরসভার টোল কেন্দ্রে গাড়িপ্রতি তিন হাজার ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ ১৫০০-২০০০ টাকা করে নিচ্ছে। একই অবস্থা মাটিরাঙা পৌরসভা, রামগড় পৌরসভা ও মানিছড়ি টোল কেন্দ্রেও। বাংলাদেশের কোনও অঞ্চলে উৎপাদিত কাঁচামালের ওপর এত টোল ট্যাক্স দেওয়ার বিধান নেই। শুধু খাগড়াছড়ি জেলা পার হতেই ১০-১২ হাজার গাড়িপ্রতি চাঁদা ও টোল দিতে গিয়ে দিশেহারা কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তারা এই হয়রানি থেকে দ্রুত মুক্তি চান।
বাগান মালিক মফিজুল ইসলাম বলেন, খাগড়াছড়ি থেকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফল নিয়ে প্রতিদিন ২৫০-৩০০ গাড়ি রাজধানীসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। জেলা পরিষদ ও বাজার ফান্ডের টোল কেন্দ্রগুলোতে আমসহ অন্য ফল বহনকারী পরিবহনের ওপর সরকার নির্ধারিত টোলের অতিরিক্ত দুই থেকে তিনশ’ গুণ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোনও ধরনের রসিদও দেন না ইজারাদাররা। এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের কাছে গিয়েও কোনও সুরাহা মিলছে না। এতে করে খাগড়াছড়ি থেকে ফল কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছে বাইরের ব্যবসায়ীরা।

কৃষক ও ফল ব্যবসায়ী অনিমেষ চাকমা রিংকু বলেন, তিন পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও অন্যদের চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য গত ১০ জুন সংবাদ সম্মেলন করে প্রশাসনকে হয়রানি বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বন জানালেও আজ পর্যন্ত তা বন্ধ হয়নি। উল্টো কৃষক, ফল ব্যবসায়ী ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের ওপর নৈরাজ্যকর চাঁদাবাজি বেড়ে গেছে। প্রতি ট্রাক তামাকের গাড়িতে ১০-১৫ লাখ টাকার তামাক পরিবহনে ট্যাক্স-টোল ১৫০০ টাকা। কিন্তু ২-৩ লাখ টাকার একটি ফলের গাড়িতে ট্যাক্স-টোল ৪-৫ হাজার আর ৫-৬ টন ফল নিলে ৮-১০ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাগড়াছড়িতে কর্মরত বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন, চাঁদা আর ট্যাক্স-টোলের কারণে আমরা অতিষ্ঠ। তিনি বলেন, প্রতি প্যাকেট ফলের জন্য পৌরসভা ২০-৩০ টাকা আর জেলা পরিষদ টোল কেন্দ্রে ২০-৩০ টাকা দিতে হয়। একটি গাড়ির খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রাম অথবা ফেনী যেতে স্বাভাবিক খরচের পাশাপাশি আরও ১০/১৫ হাজার টাকা বেশি খরচ পড়ে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

খাগড়াছড়ি পৌরসভার ইজারাদার জামাল হোসেন নির্ধারিত ট্যাক্সের বাইরে টোল নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার বলেন, করোনার কারণে তারা চলতি বছর বেশ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এমনিতেই গাড়ি কম চলছে, তাই ফল পরিবহনে অতিরিক্ত টোল আদায় করা হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র রফিকুল আলম বলেন, পৌরসভার কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মতে টোলকেন্দ্র ইজারা দেওয়া হয়েছে। পাহাড়িদের চারটি আঞ্চলিক সংগঠন লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করছে, কিন্তু এ বিষয়ে প্রতিকার না চেয়ে পৌর টোল কেন্দ্রকে চাঁদাবাজ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে অপশক্তিগুলো। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে গত ২১ জুনের সভায় যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জরুরি সরকারের সময় লাইটিং, নিরাপত্তা ও চেকের সুবিধার্থে পৌরসভার বাইরে জিরোমাইলে পৌর টোল কেন্দ্র স্থানান্তর করা হয়েছিল। যেহেতু প্রশ্ন উঠেছে- তা এখন পৌরসভার ভেতরে নিয়ে আসা হবে। ইজারাদারেরা যেহেতু কতিপয় ক্ষেত্রে শর্ত ভেঙেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, ‘চাঁদাবাজি, অতিরিক্ত ট্যাক্স-টোল আদায়ের বিষয়টি শুনেছি। তবে শুনলে তো হয় না, কৃষক-ফল ব্যবসায়ী, ফল ক্রেতা বা পরিবহনকারীদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, গতকাল রাতে (২৩ জুন রাত ৯টা) রামগড় উপজেলায় জেলা পরিষদের সোনাইফুল টোল কেন্দ্রে কৃষক এসএম আনিসের দুই মেট্রিক টন আমের গাড়িতে ২০০০ টাকা টোল দাবি করলে আনিস তা দিতে অস্বীকার করে এবং স্থানীয় পুলিশকে জানালে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইজারাদারেরা ২০০০ টাকা দাবির সমর্থনে কোনও কাগজ বা রসিদ দেখাতে পারেনি।

জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, প্রভাবশালী বলতে কিছু নেই। আইন সবার জন্য সমান। খাগড়াছড়িতে দ্বৈত পদ্ধতি চলমান। সমতলে স্থানীয় সরকারের একটি স্তর ট্যাক্স-টোল নিলে আর কেউ নেয় না। কিন্তু এখানে যার অংশ দিয়ে গাড়ি যাবে তাকে ট্যাক্স ও টোল দিতে হয়। অতিরিক্ত ট্যাক্স-টোল আদায় নিয়ে গত ২১ জুন বাগান মালিক, ইজারাদার, পৌরসভার মেয়রদের নিয়ে বসেছি। উভয়পক্ষের উপস্থাপিত দলিলাদি দেখেছি। ইজারাদারদের বক্তব্য সঠিক, তাই পৌর ট্যাক্স-টোল কেন্দ্র পৌর এলাকায় স্থানান্তর এবং কাঁচামালের অতিরিক্ত ট্যাক্স-টোল নেওয়া বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছি। নির্দেশনা অমান্য করলে আইনের আলোকে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, অতিরিক্ত ট্যাক্স-টোল আদায়ের সুযোগ নেই। জেলা পরিষদের ইজারা শর্তের বাইরে গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।