বাড়ছে যমুনার পানি। পানি বিপৎসীমার ওপরে থাকায় জেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৮০ কিলোমিটার বাঁধের পাশে ‘প্রচণ্ড ঘূর্ণ্যাবর্ত’ বেড়েছে। সদর উপজেলাধীন যমুনার পশ্চিম পাড়ে শিমলা গ্রামে পাউবোর স্বল্প খরচের শিমলা স্পারটি যমুনা গর্ভে বিলীন হওয়ায় ভাঙন ক’দিন ধরেই রয়েছে। যমুনায় ভাঙন ও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় শিমলার উত্তর-দক্ষিণে পাউবোর রানীগ্রাম-খোকশাবাড়ি-পাঁচঠাকুড়ী পর্যন্ত ‘স্বল্প উচ্চতার বন্যা নিয়ন্ত্রণ’ বাঁধটি গত বছরের মতো এবারও ঝুঁকিতে পড়েছে।
সদর উপজেলার গুনেরগাঁতীর পশ্চিমে রানীগ্রাম শিমুলতলা থেকে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পেছন হয়ে খোকশাবাড়ি, দিয়ারপাঁচিল, পাঁচঠাকুড়ী ও ভাটপিয়ারী পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘের এ বাঁধটি ১৩/১৪ বছর আগে ২৫ কোটি ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়। পাউবোর নকশা ও পরিকল্পনা দফতর থেকে বাঁধটি যে উচ্চতায় নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়, বাস্তবায়নের সময় তাতে ব্যত্য় ঘটে। দৈর্ঘ্য ঠিক রেখে উচ্চতা কমিয়ে স্বল্প করে মাটির ভরাট করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, রানীগ্রাম থেকে খোকশাবাড়ি পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার অংশে প্রকল্পের নকশা মাফিক মাটি ভরাট করা হয়নি। ভরাট কাজে ফাঁকির কারণে প্রতি বছরই বাঁধ নিয়ে শঙ্কা শুরু হয়। ভরা বর্ষায় এ বাঁধ নিয়ে খোদ পাউবোই মানসিক ও স্নায়ু চাপে থাকেন, সে সঙ্গে স্থানীয়রাও।
পানির তোড়ে ও চাপে বাঁধের পশ্চিম তলদেশে অসংখ্য ‘সিপেজ’ তৈরি হওয়ায় পানি চোয়ানোর পরিমাণ বেড়ে যায় যমুনার। প্রতি বছরই ‘সিনথেটিক পলিথিন’ ব্যাগে বালি ভরে বাঁধের পূর্বদিকে লম্বালম্বি এঁটে দেয় পাউবো। কিছু স্থানে বাঁশের পাইলিং দেওয়া হয়। এবারও ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাঁধের বাম পাশেও পানি চোয়ানো স্থানে অনুরূপ পদক্ষেপ নেয় পাউবো। ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে রানীগ্রাম শিমুল তলা থেকে ভাটপিয়ারী পর্যন্ত স্বল্প উচ্চতার বাঁধটি পাউবোর নির্মাণ করার সময় থেকেই প্রতি বছরই যমুনার পানি ছুঁই ছুঁই করে। মনে হয়, বাঁধটি উপচে যমুনার পানি লোকালয়ে ঢুকে বাঁধটি ভেঙে যাবে। স্থানীয় লোকজন বাঁধ নিয়ে ভরা বর্ষায় কমবেশী আতঙ্কে পড়েন। এবার শিমলা স্পারটি যমুনা গর্ভে বিলীন হওয়ার পর এসব অঞ্চলে বেড়েছে ভাঙন, সে সঙ্গে বেড়েছে নদী পাড়ের মানুষজনের মধ্যে আতঙ্ক।
এদিকে, বিলীন ‘শিমলা স্পার’ গত শনিবার পরিদর্শন করেছেন জ্যেষ্ঠ পানিসম্পদ সচিব কবীর বিন আনোয়ার। সেসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সঠিক ডিজাইনে, সঠিক নিয়মে এবং যথেষ্ট শক্তভাবে সিরাজগঞ্জের স্পারগুলো নির্মাণ করা হয়নি। নির্মাণের পর বারবার রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করার পরও এগুলো টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। আগামীতে প্রধানমন্ত্রীর ডেলটা প্ল্যান বাস্তবায়িত হলে সিরাজগঞ্জ জেলা মোটামুটি বন্যা ও ভাঙন মুক্ত হবে।
অন্যদিকে, সিরাজগঞ্জসহ সারাদেশে নব্বুই দশক থেকে স্পার, গ্রয়েন ও বাঁধের নকশা প্রণয়নকারী অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন রবিবার মোবাইলে জানান, দেড়শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০ বছর আগে বগুড়ার কালিতলায় ১৩০ মিটার স্পার বিদেশিদের দিয়ে যখন তৈরি হয়, তখন প্রতিটি সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশীয় প্রযুক্তি ও পরিকল্পনায় সিরাজগঞ্জে ৯টি স্পার নির্মাণ করে পাউবো। সিরাজগঞ্জের প্রথম দফায় ‘সিংগড়া বাড়ি-১ ও ২ স্পার দু’টি পাইলট হিসেবে নির্মাণ করা হয়। সে দু’টি এখনও টিকে আছে। বাকিগুলো নির্মাণের পর যেভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা ছিল, তা করা হয়নি। সাড়ে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রতিটি স্পার রাক্ষুসী যমুনায় গত ২০ বছর টিকে ছিল, এটাইতো অনেক।
তিনি বলেন, এখন শত কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রসবার তৈরির সামর্থ্য থাকলেও গত ২০ বছর আগে পাউবোর সে সামর্থ্য ছিল না। ২০ বছর আগে সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে শহর রক্ষা বাঁধ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে বেশ ক’বার তাতে ধস দেখা যায়। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে হার্ডরক ফেলে সেটি শক্তিশালী করা হয়েছে।