করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে গণপরিবহনের ভেতরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার যে সরকারি বিধি রয়েছে তার বেশিরভাগই মানা হচ্ছে না উত্তরের জেলা দিনাজপুরে। প্রথমদিকে লোক দেখানো বিভিন্ন কার্যক্রম থাকলেও পরিবহনের সঙ্গে যারা জড়িত তারাই এসব নিয়ম মানছেন না। তবে সংশ্লিষ্ট অনেক শ্রমিক-কর্মচারীই অভিযোগ করেছেন, যাত্রীরাই এসব মানছেন না বলে তারাও মানছেন না। অবশ্য সরেজমিন তাদের অভিযোগের কিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে। বাসের ভেতরে যেমন হ্যান্ড স্যানিটাইজার নেই, তেমনই অনেক যাত্রীদের মুখেও মাস্ক নেই। অনেকে মাস্ককে ফ্যাশন আইটেম বানিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছেন থুতনির নিচে।
মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ২টা। দিনাজপুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল মির্জাপুরে গিয়ে দেখা যায়, যেখানে টিকিট দেওয়া হচ্ছে সেখানে প্রায় ৭০ ভাগ যাত্রী ও আগন্তুকই রয়েছেন মাস্ক ছাড়া। অনেকের মুখে মাস্ক থাকলেও ঝুলছে থুতনির নিচে। সেখানে বসে যে দুজন টিকিট বিক্রি করছেন তাদের মুখে মাস্ক থাকলেও একজনের রয়েছে থুতনির নিচে। সহকারী হিসেবে আরও যে দুজন রয়েছেন তাদের মধ্যে একজনের মুখে মাস্ক নেই আর একজনের রয়েছে থুতনির নিচে। প্রথম দিকে টিকিট দেওয়ার স্থানে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা থাকলেও এখন আর নেই। প্রকাশ্যেই চলছে ধূমপান ও পান খাওয়া। পুরো বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষের মুখে মাস্ক নাই এবং স্বাস্থ্যবিধির যেসব নিয়মের কথা বলা হচ্ছে তার বেশিরভাগই অনুপস্থিত।
কথা হলে সেখানকার একজন সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কত আর মানবো। আগে তো মানছিলাম, কিন্তু এখন অনেক যাত্রীই আসছেন মাস্ক ছাড়া।’
ঠাকুরগাঁওগামী বাসের ভেতরে উঠে দেখা গেছে, দুটি সিটে একজন করে বসার কথা থাকলেও অনেকেই দুটি সিটে দুজন করে বসছেন।’
টিকিট কেটে ওঠা ওবায়দুর রহমান নামে ঠাকুরগাঁওগামী এক যাত্রী বলেন, আমাদের স্বাস্থ্যবিধির যেসব কথা বলা হয়েছে তার বেশিরভাগই এখানে মানা হচ্ছে না। এতে ঝুঁকিতে রয়েছি আমরা সাধারণ মানুষজন। এখানে যারা টিকিট দিচ্ছেন তারাও যেমন ঘেঁষাঘেঁষি করে আছেন, আমরা যারা টিকিট কাটছি তারাও ঘেঁষাঘেঁষি করে আছি। নিজেকে যতই নিরাপদে রাখতে চাই না কেন, বাইরে অধিকাংশ মানুষই এসব মানছেন না।’
দিনাজপুর থেকে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, রংপুর, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, হিলি, গাইবান্ধা, বোচাগঞ্জসহ বিভিন্ন রুটের যেসব বাস চলাচল করছে সেসবের ভেতরের অবস্থা দেখলে মনে হবে অধিকাংশ মানুষেরই করোনার ব্যাপারে কোনও আতঙ্ক নেই। তবে এসব আতঙ্কহীন মানুষকে দেখে এবং তাদের আচরণে সচেতন অনেকেই আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন।
রংপুরগামী একটি বাসে উঠে দেখা যায়, যাত্রীদের অনেকেই রয়েছেন মাস্ক ছাড়া। আবার দু’টি সিটে করে একজন বসার কথা থাকলেও অনেকেই দুটি সিটে দুই জন করে বসেছেন। এমনই একজন সৈয়দপুরগামী যাত্রী সিরাজুল ইসলাম। তিনিও তার পাশে আরও একজনকে নিয়ে বসেছেন। জানতে চাইলে বলেন, আমার ভাই হয়। যেহেতু আমরা একই পরিবারের তাই একসাথে বসেছি। পাশে থাকা যুবকটিও বলেন যে আমরা একই পরিবারের।
বাসচালকও বলেন, যেহেতু তারা একই পরিবারের তাই একসাথে বসেছে। একই পরিবারের হলেও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে কী নিয়ম রয়েছে তা জানতে চাইলে তিনি তা জানাতে পারেননি।
রংপুরগামী আরেকটি বাসে উঠে দেখা যায়, সেখানে আসনে বসার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মান্য করা হয়েছে। তবে সেখানে অনেকেই রয়েছেন যাদের মাস্ক থুতনিতে। ক্যামেরা বের করার সঙ্গে সঙ্গে তারা সেই মাস্ক মুখে তুলে দেন। মাস্কের এমন ব্যবহার কেন জানতে চাইলে একজন কথা বলতে রাজি হননি।
আরেকজন বলেন, বাসের ভেতরে তো বেশি যাত্রী নেই। আর সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনেই উঠেছি, তাই মাস্ক নিচে নামিয়ে দিয়েছিলাম।
ঠাকুরগাঁওগামী আরেকটি বাসের যাত্রী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ভাই আমাদের ওখানে মাস্ক পরা নিয়ে অতো কড়াকড়ি নাই। গ্রামে থাকি, গ্রাম থেকে এসেছিলাম। আবার ফিরে যাচ্ছি। ৪০/৫০ টাকা দিয়ে মাস্ক কিনে কী হবে, বাড়িতে গেলে তো আবার ফেলে দেওয়া লাগবে। আমাদের ওখানে তো সবাই মাস্ক পরে না।
বাসের স্টাফ রফিকুল ইসলাম বলেন, আসলে আমাদের এখানে করার কিছু নাই। অনেককেই বলেছি কিন্তু তারা শুনতে চায় না। তাই বলতে বলতে বাধ্য হয়েই এখন চুপ থাকি। নিজে যাতে নিরাপদে থাকি সেই চিন্তাই করি।
দিনাজপুর মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এম রফিক বলেন, আমরা আসলে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে কোনও সাড়া পাচ্ছি না। অনেকেই মানছেন না, মাস্ক পরছেন না। আমরা অনেক যাত্রীকেই মাস্ক দিয়েছি। হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ সকল ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু, সকলের যদি এসব ব্যাপারে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ না থাকে তাহলে আমরা কি করতে পারি? স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন পরিচালনার ব্যাপারে প্রশাসনের সঙ্গে অনেকবার বৈঠক হয়েছে, কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। প্রশাসনও বিষয়গুলো সেভাবে দেখছেন না। বিষয়গুলো আপনারা লিখুন, এতে যদি অনেকে সচেতন হয়।
দিনাজপুর বাস মালিক সমিতির সভাপতি ভবানী শংকর আগারওয়াল বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ১ জুন থেকে গাড়ি চালাচ্ছি। আমরা দূরপাল্লার গাড়িগুলো চালাচ্ছি, এখন চালানোর মতো অবস্থা শুরু হয়েছে। সরকার ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু অবৈধ থ্রি হুইলার গাড়িগুলো চলাচলে আমরা কুলাতে পারছি না।
ঈদের কারণে বাইরে থেকে অস্বাভাবিক লোকজন চলে এসেছিল। যে কারণেই হোক কয়েকদিন স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি বা মানেনি। ঈদের কারণে অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানে নাই। আগামী দু’-একদিনের মধ্যে শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে যানবাহন চালানো হবে। আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা পাচ্ছি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও মাস্ক ব্যবহারের ব্যাপারে প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। এটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ, তবে যখন ভ্রাম্যমাণ আদালত চলে তখন সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানে। আবার প্রশাসনের কর্মকর্তারা চলে যাওয়ার পর স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে। সকলে যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে তাহলেই করোনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে প্রশাসনকে আরও আন্তরিক হতে হবে। দিনাজপুরে প্রশাসনের লোকজন যথেষ্ট কাজ করছে। তবে অনেক যানবাহন গাদাগাদি করে যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে। অটোবাইকে করে গাদাগাদি করে লোকজন চলাচল করছে। এসব ব্যাপারে প্রশাসনকে আরও আন্তরিক হতে হবে।
দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শরিফুল ইসলাম বলেন, গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। বর্তমানে করোনার সংক্রামণ ঠেকাতে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। তাছাড়া মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। যখন যেখানে যাওয়ার প্রয়োজন তখনই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছেন। আমাদের প্রশাসনের কর্মকর্তারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করছেন। প্রশাসনের একার পক্ষে এসব কাজ করা সম্ভব না। করোনা সংক্রামণ ঠেকাতে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে সকলের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। যে কেউ স্বেচ্ছাসেবী হয়ে এসব ব্যাপারে কাজ করতে পারে।