ডিজিটাল হাজিরা মেশিন

বরাদ্দ পেয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিনতে গিয়ে দুর্নীতিতে জড়ালো শিক্ষক সমিতি!

নাটোরের বাগাতিপাড়ায় ৪৮ স্কুলের জন্য কেনা কম দামের ডিজিটাল ফিঙ্গার প্রিন্ট রিডার মেশিন

নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলায় ৪৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছ থেকে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন কিনে দেওয়ার নামে সাড়ে তিন লাখ টাকা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে উপজেলা শিক্ষক সমিতির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের পছন্দের ডিলারের কাছ থেকে এসব মেশিন কেনার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষগুলোকে চাপ দিয়ে রাজি করানো হলেও এগুলোর দাম দেখানো হয়েছে দ্বিগুণ এবং মেশিনগুলোতে হাজিরা সংরক্ষণ হয় অন্য মেশিনগুলোর অর্ধেক। আবার উপজেলা শিক্ষক সমিতির নেতারা বলেছেন, একযোগে এসব মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত হলেও নির্দিষ্ট ডিলারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পরিশোধে ছিল  ‘ওপরের চাপ’, ফলে তারা বাজার যাচাই করতে পারেননি।  এসব ডিভাইসের সঙ্গে সেন্ট্রাল মনিটরিং সিস্টেম এবং রিপোর্টিং সফটওয়্যার না থাকায় সরকারের উদ্দেশ্য সফল হবে কিনা তাতেও সন্দেহ রয়েছে। 

জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-স্টাফদের সঠিক সময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করাতে গত বছর  স্লিপ ( স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান) ফান্ডের অধীনে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন কিনতে ২০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেয় সরকার।  প্রতিটি বিদ্যালয়কে এ বরাদ্দ দিয়ে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী হাজিরা মেশিন কিনতে বলা হয়েছিল।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ টাকা পেয়ে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার ৫৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিন ধাপে কেনা হয় ৫৬টি ডিজিটাল হাজিরা মেশিন। এ বছরের শুরুতে ৮টি স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রত্যেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নিজেদের পছন্দে ৮টি মেশিন কেনে, এসব মেশিন দুই লাখ আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গার প্রিন্ট) সংরক্ষণ করার ক্ষমতা রাখে। ফলে অন্য স্কুল কর্তৃপক্ষগুলো এ ধরনের মেশিন কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়। ঠিক তখন  উপজেলা শিক্ষক সমিতি নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে বাকি ৪৮টি স্কুলগুলোকে একজন নির্দিষ্ট ডিলারের কাছ থেকে এসব মেশিন কেনার চাপ দেয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বকুলের নাম ব্যবহার করে দেওয়া এই প্রস্তাব অর্থে নির্দেশের কারণে ইচ্ছা থাকলেও অন্য প্রধান শিক্ষকরা আর নিজেরা যাচাই করে হাজিরা মেশিন কেনার সুযোগ পাননি। তবে এসব মেশিনের দামও যেহেতু ১৫ হাজার টাকা করে নির্ধরণ করা হয়, তাদের ধারণা ছিল তারাও একই ধরনের মেশিন পাবেন। তবে দুই দফায় বাকি ৪৮টি স্কুলকে যে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন দেওয়া হয়েছে সেগুলোর আঙুলের ছাপ সংরক্ষণের ক্ষমতা মাত্র এক লাখ। পরবর্তীতে স্কুল কর্তৃপক্ষগুলো বাজার যাচাই করে দেখেছেন, এই মেশিনগুলোর বাজারমূল্য মাত্র সাড়ে সাত হাজার টাকা অথচ প্রতিটি স্কুলকে পরিশোধ করতে হয়েছে ১৫ হাজার টাকা করে। এতে প্রতিটি স্কুলের কাছ থেকে কৌশলে বাড়তি সাড়ে সাত হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। ফলে ৪৮টি স্কুলের কাছ থেকে উপজেলা শিক্ষক সমিতি বাড়তি নিয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।  

বাগাতিপাড়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মজনু মিয়া জানান, ডিজিটাল মেশিন কেনার জন্য স্লিপ ফান্ড থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২০ হাজার টাকা। ২০১৯ সালে টাকা দেওয়া হলেও নানা জটিলতায় চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে মেশিন কেনা শুরু হয়। শুরুতে দুই ধাপে মোট আটটি স্কুল ১৫ হাজার টাকায় নিজ উদ্যোগে মেশিন কেনেন। পরবর্তীতে ৪৮টি স্কুল একযোগে ১৫ হাজার টাকায় মেশিন কেনেন।

নাটোরের বাগাতিপাড়ায় ৪৮ স্কুলের জন্য কেনা কম দামের ডিজিটাল ফিঙ্গার প্রিন্ট রিডার মেশিন

জিগরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফিজুর রহমান জানান, প্রথমদিকে তারা ১৫ হাজার টাকায় নিজেরা দেখে মেশিন কিনেছিলেন। তাদের মেশিন ২ লাখ আঙুলের ছাপ সংরক্ষণ করতে পারলেও পরে ৪৮টি স্কুলে একযোগে কেনা মেশিনগুলোর আঙুলের ছাপ সংরক্ষণের ক্ষমতা এক লাখ।

রহিমানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনির হোসেন জানান, উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভায় একযোগে মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুসারেই তারা টাকা দিয়েছেন।

একযোগে কেনা ওই ডিজিটাল হাজিরা মেশিনের দাম জানতে চাইলে নাটোর শহরের কানাইখালী এলাকার কম্পিউটার সামগ্রী বিক্রেতা ব্লুরিজ টেকনোলজির স্বত্বাধিকারী রাংকু জানান, এধরনের মেশিনের বাজারমূল্য সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা।

তবে সব প্রাথমিক বিদ্যালয় উপজেলা শিক্ষক সমিতির এই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। তমালতলা আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খন্দকার মোখলেসুর রহমান জানান, তিনি পৃথকভাবে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন কিনেছেন। খরচ পড়েছে ৫-৬ হাজার টাকা।

চায়না ইউকে সফটওয়্যার কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার বাগাতিপাড়ার অধিবাসী আশিকুর রহমান রবিন দাবি করেন, ডিজিটাল হাজিরা নিশ্চিত করতে যে সকল ডিভাইস ক্রয় করা হয়েছে তা অত্যন্ত নিম্নমানের। এছাড়াও ডিভাইসের সঙ্গে সেন্ট্রাল মনিটরিং সিস্টেম এবং রিপোর্টিং সফটওয়্যার না থাকায় অনেক অর্থ ব্যয় করার পরেও সরকারের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

এসব ডিজিটাল ফিঙ্গার প্রিন্ট রিডিং মেশিন মাত্র এক লাখ ফিঙ্গার ধারণ করতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র দাবি করেছে, লালপুর-বাগাতিপাড়া আসনের সাংসদ শহিদুল ইসলাম বকুল ও বাগাতিপাড়া উপজেলা শিক্ষক সমিতি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এই সিন্ডিকেটে সরাসরি জড়িত। কথিত ‘ওপরের চাপ’ বলা হলেও তাদের নির্দেশেই ওই দামে মেশিনগুলো কেনা হলেও সফটও্যার এবং সেন্ট্রাল মনিটরিং সিস্টেম না থাকায় মেশিনগুলো চালু করা যায়নি। এগুলো দিয়ে আদৌ কোনও কাজ করা যাবে কিনা তাতেও সন্দেহ রয়েছে।

অপরদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহাদৎ হোসেন এক ব্যক্তিকে তাদের কাছে এমপি শহিদুল ইসলাম বকুলের পাঠানো লোক হিসেবে পরিচয় করে দেয়। তার কাছ থেকেই মেশিন কিনতে বলে। তারা মেশিনটির দাম কমানো নিয়ে অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে ওই দামেই কিনতে বাধ্য হন।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি শাহাদত হোসেন জানান, ‘‘মেশিনগুলো যে কোম্পানির তাদের ১৫ হাজার টাকা পরিশোধে ‘ওপরের চাপ’ ছিল। বাজারে ৫টা দোকানে যাচাইয়ে তাদের কোনও স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি। তাই ওই ফিক্সড দাম দিতে তারা বাধ্য হয়েছেন।’’

‘ওপরের চাপ’ বলতে কাদের কথা বলেছেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোনও মন্তব্য করতে চাননি তিনি।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে সাধারণ সম্পাদক শাহাদৎ হোসেন অস্বীকার করে জানান, সবার সঙ্গে আলোচনা করেই ওই দামে মেশিন কেনা হয়েছে। এখানে বিভিন্ন সফ্টও্যার আর নেট সার্ভিসসহ দাম ধরেছে কোম্পানি। এ ব্যাপারে কে কী বলেছ জানি না তবে এমপি বা তারা (উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি  ও সাধারণ সম্পাদক) কোন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন।

এ ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মজনু মিয়া জানান, উপজেলা অফিসে সেন্ট্রাল ডিভাইস সংযুক্ত না থাকায় হাজিরা মনিটরিং করা শুরু হয়নি। তিনি তার মোবাইল ফোনে তিনটি স্কুলের মেশিন মনিটরিং করেন দাবি করে জানান, স্কুলগুলো খোলার পর এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে এ ব্যাপারে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ পছন্দমতো মেশিন কিনতে স্বাধীনতা দেন। তবে সরকারি টাকা দুর্নীতির কোনও সুযোগ নেই। বিষয়টি তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এমপি শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। এ ব্যাপারে তার কোনও সম্পৃক্ততা নেই। কেউ ফায়দা লুটতে তার নাম ব্যাবহার করতে পারে। বিষয়টি  তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তার সকল প্রকার সহযোগিতা থাকবে।