জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির সাক্ষ্যগ্রহণ

জেরায় সাংবাদিক আরিফুলকে অপ্রাসঙ্গিক ও এলোমেলো প্রশ্ন করেন অভিযুক্ত নাজিম উদ্দীন

সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম ও প্রত্যাহার হওয়া কুড়িগ্রামের আরডিসি নাজিম উদ্দীন





বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগানের মুখোমুখি হয়ে সেই নির্যাতনের রাতের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ এড়ানোর চেষ্টা করলেন ওই ঘটনায় অভিযুক্ত ও পরে কুড়িগ্রাম থেকে প্রত্যাহার হওয়া আরডিসি নাজিম উদ্দীন। এসময় তদন্ত কমিটির সামনে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের দেওয়া বক্তব্য এড়িয়ে উল্টো তাকেই অভিযুক্ত করার চেষ্টা করেন নাজিম। একইসঙ্গে আরিফের সাথে তার পূর্ব পরিচয় না থাকার বিষয়টি বারবার প্রমাণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন নাজিম। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তদন্ত কমিটির কাছে সাংবাদিক আরিফের দেওয়া বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত নাজিম উদ্দীনকে জেরা করতে বলা হলে তিনি আরিফকে প্রশ্ন করেন, ঘটনার আগে তিনি ( আরিফ) নাজিম উদ্দীনকে চিনতেন কিনা। জবাবে আরিফ তাকে আগে থেকে চেনার একাধিক তথ্য প্রমাণ দিয়ে একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে কারাগারে জেল সুপারের কক্ষে তাকে প্রথম দেখার ঘটনার বর্ণনা দিলে নাজিম তা সঠিক নয় বলে দাবি করেন। এসময় আরিফ সেদিন ওই কক্ষে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনসহ নাজিমের অবস্থান এবং ওই কক্ষে উপস্থিত অন্য কয়েকজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন। এরপরও নাজিম উদ্দীন তা মানতে না চেয়ে প্রশ্ন করেন, ‘বলেন তো, জেল সুপারের কক্ষে কয়টি সোফা রয়েছে?’ তার এমন প্রশ্নে তদন্ত কমিটি অনেকটা বিব্রত বোধ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নাজিম দাবি করেন, তাকে ফাঁসাতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা ও তৎকালীন এনডিসি ও সহকারী কমিশনার এসএম রাহাতুল ইসলামের শেখানো কথা বলছেন সাংবাদিক আরিফুল। এসময় বাড়িতে গিয়ে দরজা ভেঙে নাজিম উদ্দীনের প্রবেশ করে নির্যাতন করা ও ‘তুই অনেক জ্বালাচ্ছিস, কলেমা পড়ে ফেল, তোকে এনকাউন্টারে দেওয়া হবে’- মন্তব্যটি আরিফ মনে করিয়ে দিলে নাজিম এর জবাব দেননি।
তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীনকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে গত ১৩ মার্চ সাংবাদিক আরিফুলকে ঘর থেকে মধ্যরাতে তুলে এনে ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পর জেলা প্রশাসকের অফিসে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তার যে উদ্দেশ্যমূলক বিচার করা হয় তাতে অন্যতম অভিযুক্ত এই আরডিসি নাজিম উদ্দীন। এ ঘটনায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে যে বিভাগীয় মামলা হয়েছে কুড়িগ্রামে তার তদন্ত কাজের পঞ্চম দিবসে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) মামলার সাক্ষী সাংবাদিক আরিফুলের মুখোমুখি হন মামলাটির অভিযুক্ত আরডিসি নাজিম উদ্দীন।

জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় মামলাটিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রায় প্রত্যেকের পৃথকভাবে সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে তদন্ত কমিটি। কুড়িগ্রাম সার্কিট হাউজের সম্মেলন কক্ষে এ সাক্ষ্য গ্রহণকাজ চলছে। পঞ্চম দিনেও কমিটির সঙ্গে কুড়িগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জিলুফা সুলতানা উপস্থিত ছিলেন।
সূত্রটি জানান, সাংবাদিক আরিফুলের দেওয়া গত ১৩ মে রাতের ঘটনার বর্ণনায় তৎকালীন আরডিসি নাজিম উদ্দীনের উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততার অভিযোগের জেরায় নাজিম সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানকে অপ্রাসঙ্গিক ও এলোমেলো প্রশ্ন করতে থাকেন। এসময় তদন্ত কমিটি নাজিম উদ্দীনকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন না করে অভিযোগের বিষয়ে যত খুশি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করো।’ সাংবাদিক আরিফ যখন তাকে ওই রাতে তার বলা ও করা বিভিন্ন ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন তখন নাজিম প্রসঙ্গেই থাকতে চাইছিলেন না।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) পঞ্চম ও শেষ দিনের মতো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির তদন্ত কালে উপস্থিত ছিলেন কমিটির প্রধান যুগ্ম সচিব আমেনা বেগম, কমিটির অন্য দুই সদস্য উপ-সচিব পিকেএম এনামুল করীম ও কামাল হোসেন। এ দিন সাংবাদিক আরিফসহ সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদেরও সাক্ষ্য নেন তদন্ত কমিটি।
তদন্ত কমিটি, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন ও আরিফুল ইসলাম রিগান জানান, কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দীন, মোবাইলকোর্ট পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা, তৎকালীন এনডিসি ও সহকারী কমিশনার এসএম রাহাতুল ইসলামের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সেই দিনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্ত কমিটি আমার নিকট সেইদিনের ঘটনা এবং সে ঘটনায় অভিযুক্ত তৎকালীন আরডিসি নাজিম উদ্দীন ও অন্য দুই নির্বাহী মেজিস্ট্রেটের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চান। এসময় ওইদিন আমার ওপর যে অন্যায় ও অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল সেসবের বিস্তারিত বিবরণ ও সাজানো মোবাইল কোর্টে সাজার ঘটনা সবিস্তারে তুলে ধরেছি। আমার কথাগুলো তদন্ত কমিটি অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে শুনেছেন এবং শনিবারও ১২ পৃষ্ঠা জুড়ে লিপিবদ্ধ করেছে, এতে আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। আজ তদন্ত কমিটির সামনেই আমাকে সাবেক আরডিসি নাজিম উদ্দীন প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আমার সাক্ষ্যের বিপরীতে জেরা করেন। আমি তার প্রতিটি জেরার উপযুক্ত ও সত্য জবাব দিয়েছি। কমিটি জেরার জবাবও লিপিবদ্ধ করেছে। চার পৃষ্ঠার ওই জেরাতেও আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, আমাকে বিবস্ত্র করে হাত ও চোখ বেঁধে বেধড়ক পেটানো, এনকাউন্টার দিতে চাওয়া এসব ঘটনা ঘটিয়েছিলেন আরডিসি নাজিম উদ্দীন। এসবই যে তৎকালীন ডিসি সুলতানা পারভীনের নির্দেশে ও পরিকল্পায় আরডিসি নাজিম উদ্দীনের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছে এসব বিষয় আমি তার ( নাজিম উদ্দীন) সামনেই তদন্ত কমিটিকে বলেছি। কিন্তু, নাজিম উদ্দীন এসব বিষয় এড়িয়ে যান এবং ঘুরেফিরে এলোমেলো ও অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করেন। এতে তদন্ত কমিটি অনেকটা বিব্রত বোধ করেন। আমাকে জেরা করার জন্য তাকে আনলিমিটেড সময় দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তিনি বারবার সত্য লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেন।
বিভাগীয় মামলা হওয়ায় তদন্ত কমিটির কোনও সদস্য এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হননি। আরডিসি নাজিম উদ্দীনও সাংবাদিকদের সামনে আসেননি।
প্রসঙ্গত, গত ১৩ মার্চ মধ্যরাতে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের বাসায় হানা দিয়ে তাকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে ক্রসফায়ারের হুমকিসহ ডিসি অফিসে এনে নির্মম নির্যাতন করা হয়। এরপর অধূমপায়ী আরিফকে আধাবোতল মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ এনে ওই রাতেই এক বছরের কারাদন্ত দিয়ে জেলে পাঠানো হয়। পরে ১৫ মার্চ তিনি জামিনে মুক্তি পান। এ ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠলে কুড়িগ্রামের তদানীন্তন ডিসি সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দীন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসএম রাহাতুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। একইসঙ্গে এ ঘটনায় বিভাগীয় মামলা দায়ের হয় এবং ঘটনাটি তদন্তে কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়। এদিকে একই ঘটনায় সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের দায়ের করা ফৌজদারি মামলাটি নিম্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

আরও পড়ুন:

নির্যাতনের ঘটনায় সাংবাদিক আরিফুলকে জেরা করলেন রাহাতুল

সাংবাদিক আরিফুলের দেওয়া নির্যাতনের বর্ণনায় একমত রিন্টু বিকাশ

মধ্যরাতে আরিফকে গ্রেফতার করে সাজা: রংপুরের বিভাগীয় কমিশনারকে তদন্তের নির্দেশ



আরিফের ওপর অন্যায় হয়ে থাকলে ডিসিকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবেপ্রতিমন্ত্রী

‘রাতে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকতে পারেন না মোবাইল কোর্ট’

মোবাইল কোর্টে আরিফকে সাজায় ক্ষুব্ধ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, তদন্তের নির্দেশ

কুড়িগ্রামের ডিসির বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে বললেন আইনমন্ত্রী

‘তুই অনেক জ্বালাচ্ছিস- বলে মারতে মারতে নিয়ে যায় আরিফকে’

মধ্যরাতে বাড়ি থেকে সাংবাদিককে ধরে নিয়ে মোবাইল কোর্টে এক বছরের জেল

মধ্যরাতে সাংবাদিক আরিফুলকে তুলে নিয়ে গেলো মোবাইল কোর্ট

কাবিখা’র টাকায় পুকুর সংস্কার করে ডিসি’র নামে নামকরণ!