লকডাউনের আগে থেকে ভেলোরে চিকিৎসকের অধীন যশোরের ফাতিমা নামে এক নারী তার স্বামীর চিকিৎসা করাচ্ছিলেন। দুই মাস অন্তর তার থেরাপি নিতে হয়। সর্বশেষটি হয় গত ফেব্রুয়ারিতে। এরপর এপ্রিলে পরবর্তী থেরাপি নেওয়ার কথা থাকলেও করোনাভাইরাসের কারণে ভারতের সব ভিসা স্থগিত হয়ে যায় ১৩ মার্চ থেকে।
হাইকমিশনে আবেদন করে বিশেষ ব্যবস্থায় ভিসা মিললেও সেটির স্বল্প মেয়াদ মাত্র তিন মাস। এ নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
ফাতিমা বলেন, ‘ভিসা পেয়েছি। কিন্তু মেয়াদ মাত্র তিন মাস এবং সিঙ্গেল এন্ট্রি। একবার গেলেই ওই ভিসার মেয়াদ শেষ। আগে যেখানে এক বছরের মাল্টিপল ভিসা ছিল। এখন একটা থেরাপি নিলে আরেকটার জন্য সেখানেই দুই মাস অপেক্ষা করতে হবে। আর ফিরে আসলে আবার ভিসা নিতে গেলে বাড়বে জটিলতা। সব মিলিয়ে কী হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
বেনাপোল পর্যন্ত স্থলপথে যাওয়ার পর কলকাতা থেকে বিমানে ভেলোরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
বলেন, ‘কোভিড-১৯ নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে আমরা ইমিগ্রেশন পার হতে পারছি। কিন্তু তারপর কী হবে এখনও জানি না। ভারতে যাওয়ার পর ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে, নাকি ভেলোরে গিয়ে, তাও নিশ্চিত হতে পারছি না।’
জরুরি বিবেচনায় ফাতিমা তার স্বামীর চিকিৎসার জন্য ভিসার ব্যবস্থা করতে পারলেও শার্শায় স্ত্রী রোগে ভোগা আর এক রোগী নাজমা তা পারেননি। তিনি বলেন, ‘বন্ধ্যাত্বসহ নানা জটিলতা নিয়ে ২০১৮ সাল থেকে ভারতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। তবে লকডাউন পরিস্থিতির কারণে চিকিৎসা বন্ধ। গত ২০ দিনে হাই কমিশনের নির্দিষ্ট ঠিকানায় চার বার ই- মেইল করেও কোনও রিপ্লাই পাইনি। আর পাবো কিনা, তাও জানি না।’
কয়েক দফা লকডাউন বাড়ানোর ধারাবাহিকতায় যাত্রীবাহী আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিষেধাজ্ঞায় সম্প্রতি ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে প্রতিবেশী দেশটি। এদিকে লকডাউন পরিস্থিতির কারণে ভারতে দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা নিতে থাকা অনেকে ওষুধের সংকটেও ভুগছেন। অনলাইনসহ নানাভাবে ওষুধ পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের কেউ কেউ।
যাত্রী নবীন মাহমুদ জানান, ‘ভিসা পেতে হলে প্রথমে ভারতে কোনও হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসকের অ্যাপয়েনমেন্ট লাগবে। সেটার ভিত্তিতে হাই কমিশনের নির্দিষ্ট ইমেইলে আবেদন করতে হবে। জরুরি বিবেচনায় হাই কমিশন থেকে ফিরতি ইমেইলে ভিসা সেন্টারে আসতে বলা হচ্ছে। সেই আলোকে কাগজপত্র নিয়ে গেলে ভিসা পাওয়া যেতে পারে।’
কেবলমাত্র জরুরি ও বিশেষ ক্ষেত্র বিবেচনায় মেডিক্যাল ভিসা দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যে কোনও অসুস্থতার জন্য এই পরিস্থিতিতে ভিসা দেওয়া সম্ভব না।’
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে চিকিৎসা, ব্যবসা, বেড়ানোসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিদিন গড়ে চার হাজারের বেশি বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে প্রবেশ করেন, যাদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি যান চিকিৎসা নিতে।
ইন্ডিয়ান চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া বিদেশিদের ৪৫ শতাংশই বাংলাদেশি। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত এক কোটি ৩৭ লাখ ৩০ হাজার ২৮২ বিদেশি ভারত ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে প্রথম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল প্রায় ২৯ লাখ।
চিকিৎসা প্রার্থী বাংলাদেশি ও বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয়দের বিড়ম্বনার কথা বিবেচনায় আকাশপথে বিশেষ যাতায়াত ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাব ঢাকা সফরে দিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা।
বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আহসান হাবিবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থলপথে সবচেয়ে বেশি পাসপোর্টধারী যাত্রী বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত ভ্রমণ করেন। কোভিড-১৯ এর কারণে যাতায়াত নেই বললে চলে। তবে দু’দেশে আটকে পড়ারা বিশেষ নিয়ম মেনে নিজ নিজ দেশে ফিরছেন। ভারতে করোনার প্রাদুর্ভাব বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারতের পাসপোর্টধারী যাত্রী চলাচল স্বাভাবিক হতে সময় লাগছে। বিশেষ ব্যবস্থায় কিছু রোগী যাত্রী যাতায়াত করছেন। তাও দৈনন্দিন হিসাবে দিনে দুই থেকে চার জনের বেশি হচ্ছে না বলে জানান তিনি।