স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের দায়সারা দায়িত্বপালন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের কারণে সড়কটিতে বার বার বরাদ্দ দেওয়ায় সরকারের কোটি কোটি টাকা তছরুপ হয়েছে, তবে কাজের কাজ হয়নি। বর্তমানে সড়কটিতে পায়ে হেঁটে চলাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সড়কের টুনিরহাট থেকে ভাউলাগঞ্জ পর্যন্ত অংশে ছোট-বড় গর্ত ও খানাখন্দকে ভরা। আবার পাকা সড়কেরও কোথাও কোথাও পিচ, সুরকি, ইট উঠে গিয়ে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলে স্থানীয়দের দুর্ভোগের মাত্রা বেড়ে যায়। সড়কের ওপর জমে থাকা পানিতে বোঝাই যায় না কোন গর্ত কত বড়, আর কোন গর্তে কাঁদা আছে। এ সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়ছেন পথচারীরা। যানবাহনের পাশ দিয়ে চলতে গিয়ে সড়কের গর্তের পানি ছিটকে গিয়ে কাপড় নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে রাস্তা খারাপ হওয়ায় অতিরিক্ত ভাড়া দিলেও অনেক সময় যানবাহন যেতে চায় না। ছোটখাট যানবাহনগুলো প্রায়শই উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
২০১৮ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) অধীনে পঞ্চগড় ভাউলাগঞ্জ সড়কের বোদা জিসি টু ভাউলাগঞ্জ জিসি সড়কের সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়ক প্রায় এক কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে রেইনকো ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সংস্কার কাজ করে।
অন্যদিকে ২০১৯ সালের আগস্টে পঞ্চগড়-দেবীগঞ্জ সড়কের কালিয়াগঞ্জ থেকে বড়শশী পর্যন্ত পাঁচ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে এমএইচ কর্পোরেশন অ্যান্ড মীম ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৯ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার কাজ শুরু করে। তবে গত এক বছর ধরে ধীরগতিতে কাজ করায় সংস্কার কাজ শেষ হচ্ছে না। ২০২০ সালের আগস্টে সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে এখন পর্যন্ত ৩০ ভাগ কাজও শেষ করতে পারেনি। যেটুকু কাজ হয়েছে তাতেও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে দায়সারাভাবে কাজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। ইতোমধ্যে সড়কটির একাধিক স্থানে পিচ ঢালাইয়ে পর ফাঁটলের সৃষ্টি হয়েছে। সংস্কার কাজে অনিয়ম ও ধীরগতির কারণেই কাজ শেষ হতে না হতেই আবারও সড়কটিতে খানাখন্দ সৃষ্টি হচ্ছে।
সড়কটি দ্রুত সংস্কার এবং এলজিইডি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জেলার বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের মালেকাডাঙ্গা এলাকার নাসিরউদ্দিন জানান, সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে বাড়ি থেকে হাঁটবাজার, উপজেলা সদর ও জেলা সদরে যাতায়াতে সময় ও ভাড়া দুটোই বেশি গুনতে হচ্ছে।
একই এলাকার নজরুল ইসলাম জানান, বার বার সংস্কার করলেও সড়কটি কোনও সময়ই ভালো থাকে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতাই এর অন্যতম কারণ। ঠিকাদার দিনে রাতে কাজ করলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাউকে দেখা যায় না। ফলে আমরা সবসময় দুর্ভোগের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছি।
বড়শশী ইউনিয়নের বকদুলঝুলা এলাকার রুবেল হোসেন জানান, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে কাজ করায় সড়কটিতে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা ছোট-বড় খানাখন্দকে ভরে গেছে।
মোটরসাইকেল চালক ফরিদুজ্জামান ফরিদ জানান, সড়কটি দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো কঠিন। বৃষ্টি হলে সড়কটি বিপজ্জনক হয়ে উঠে। কোথায় গর্ত, কোথায় কাঁদা কোনোটাই বোঝা যায় না। কোনও কোনও গর্ত এক হাঁটুরও বেশি গভীর।
বড়শশী ইউনিয়নের তেঁতুলের মোড় এলাকার অটোচালক বাবু জানান, গত একবছর ধরে রাস্তার যে অবস্থা, তা এর আগে আমি কোনোদিন দেখিনি। খুব ধীরে যেতে হয়, এতে সময় লাগে অনেক বেশি। আধা ঘণ্টার রাস্তা দেড় দুই ঘণ্টা রেগে যায়। প্রায় সময়ই ভ্যান, রিকশা, অটো উল্টে দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেকের হাত-পা ভেঙেছে। গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে।
বড়শশী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা আকবর হোসেন ও মঞ্জুরুল ইসলাম উজ্জল জানান, সড়কটি বছরের পর বছর ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। জনগণ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে কাজ করায় রাস্তায় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বছরের পর বছর সড়কটি এভাবে খানাখন্দকে ভরে আছে সংশ্লিষ্টরা কেউ দায়িত্ব নিচ্ছেন না। বিষয়টি আমরা রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনকে জানিয়েছি।
এলজিইডির দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোমিনুল ইসলাম জানান, ২০১৮ সালের জুন মাসে এক কোটি ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৬৪ টাকা ব্যয়ে সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কের সংস্কার করা হয়। ঠাকুরগাঁও রেইনকো ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কাজটি করেছিলো। সড়কটি খানাখন্দকে ভরে গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
পঞ্চগড় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শামছুজামান সড়কটির বেহাল অবস্থার কথা জানিয়ে বলেন, ওভারলোড নিয়ে যানবাহন চলাচল করায় সড়কটি অল্পতেই নষ্ট হচ্ছে। সড়কটির খানাখন্দে ভরা অংশটুকু এ বছরেই মেরামত করে দেওয়া হবে। বৃষ্টিপাত হওয়ায় আমরাই ঠিকাদারকে কাজ বন্ধ রাখতে বলেছি। কাজে কোনও অনিয়ম হয়েছে কিনা বিষয়টি আমরা দেখছি। সড়কের খানাখন্দক সংস্কারের জন্য বাজেট দেওয়া হয়নি, তবে বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।