গাজীপুরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কেনা জমিতে প্রবেশের জন্য ভাওয়াল বনে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, বিএনপি নেতাকর্মীদের বাধার মুখে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ রেখে সেখান থেকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা ও কর্মচারীরা ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। বুধবার (১৮ মার্চ) সকাল ১০টা থেকে দুপুর পর্যন্ত সদর উপজেলার ভবানীপুর পূর্বপাড়া (কসাই পট্টি) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভবানীপুর এলাকায় প্রীতি গ্রুপ নামে একটি গ্রুপ অব কোম্পানি জমি কেনে। ওই জমিতে প্রবেশের রাস্তা না থাকায় প্রীতি গ্রুপ কর্তৃপক্ষ বন বিভাগের জায়গার ওপর দিয়ে তাদের জমিতে প্রবেশের রাস্তা নির্মাণ করে। বর্তমানে ওই রাস্তার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। স্থানীয় বন বিভাগ একাধিকবার তাদের নিষেধ করলেও প্রীতি গ্রুপ কর্তৃপক্ষ বা তাদের লোকজন স্থানীয় বিএনপির সহযোগী সংগঠনের (স্বেচ্ছাসেবক এবং মৎস্যজীবী দলের) নেতাকর্মীদের সহযোগিতায় সম্প্রতি রাস্তা নির্মাণ শুরু করে।
বন বিভাগ দাবি করছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তারা রাস্তা নির্মাণ করতে চাইলে বন বিভাগ বাধা দেয়। পরে তারা ওই সময় রাস্তা নির্মাণ করতে পারেনি। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও রাতের আঁধারে বালু এবং ইট ফেলে রাস্তা নির্মাণ কাজ শুরু করে। বন বিভাগের লোকজন অভিযান চালিয়ে ট্রাক দিয়ে বালু এবং ইট উঠিয়ে স্থানীয় ভবানীপুর বন বিট অফিসে নিয়ে জব্দ করে। পরে তারা ওই স্থানে চারা রোপণ করে। সম্প্রতি বিএনপির সহযোগী সংগঠনের (স্বেচ্ছাসেবক এবং মৎস্যজীবি দলের) নেতাকর্মীদের চেষ্টায় রাতের আঁধারে আবার রাস্তায় বালি ও ইট ফেলে রাস্তা নির্মাণ কাজ শুরু করে।
বন বিভাগ আরও জানায়, বিএনপি সরকার গঠনের পর স্থানীয় বিএনপির সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সহায়তায় রাতের আঁধারে প্রীতি গ্রুপ কর্তৃপক্ষ আবারও জোর করে রাস্তা নির্মাণ শুরু করে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে পূর্ব দিকে প্রীতি গ্রুপের জমি পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তা ২০-২৫ ফুট প্রশস্ত করে বালি ও ইট ফেলে নির্মাণ প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছে। বুধবার সকালে বন বিভাগ পুনরায় উচ্ছেদে গেলে বিএনপি নেতাকর্মীরা বাধা দিলে অভিযান স্থগিত করে কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে প্রীতি গ্রুপের কেনা জমিতে প্রবেশের উদ্দেশ্যে তাদের অর্থায়নে বালি ও ইট দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হয়। ওই জমির পাশেই রয়েছে ভাওয়ালের সংরক্ষিত শাল ও গজারি বন। বনাঞ্চলের ভেতর সরু হাঁটার পথ থাকলেও বড় কোনও সড়ক নেই।
এদিকে, বন বিভাগের উচ্ছেদ অভিযানে বাধা দেওয়ার সময় উপস্থিত বিএনপির সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুক লাইভ করেন। লাইভের ভিডিওতে দেখা যায়, ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি নাজমুল হোসেন মুকুল, ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং গাজীপুর সদর উপজেলা জাতীয়তাবাদী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (জেটেব) সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হোসেনকে। এ সময় ইমরান তার ফেসবুক আইডি থেকেও লাইভে এসে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ’ আখ্যা দিয়ে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেন।
তিনি দাবি করেন, এটি জনগণের রাস্তা এবং উচ্ছেদ অভিযান প্রতিহত করা হবে। বন বিভাগের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছাত্রদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলায় বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নেতাকর্মীরা বাকবিতণ্ডায় জড়ায় এবং উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রাকৃতিক সংরক্ষণ বিভাগের গাজীপুরের ভাওয়াল রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে এম রাশেদ সাদাত বলেন, ‘বনের জমির ওপর নির্মিত সড়কটি সম্পূর্ণভাবে একটি বেসরকারি কোম্পানির স্বার্থে তৈরি করা হয়েছে। ওই রাস্তার আশপাশে কোনও ঘরবাড়ি নেই। মানুষের চলাচলের জন্য একটি সরু পথ আগেই ছিল, সেটি বন্ধ করা হয়নি।
‘এর আগেও অবৈধভাবে রাস্তা নির্মাণের সময় অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে চারা রোপণ করা হয়েছিল। প্রীতি গ্রুপ কর্তৃপক্ষের লোকজন ওইসব চারা তুলে পুনরায় রাস্তা তৈরি করছে। পরবর্তী সময়ে আবার রাস্তা বন্ধ করতে গেলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কোম্পানির লোকজন আমাদের কাজে বাধা দেয়। পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হয়ে উঠলে অভিযান স্থগিত করে আমরা জনবল নিয়ে চলে আসতে বাধ্য হই। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সরকারি কাজে (অভিযানে) বাধা দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঘটনাস্থল থেকে ফিরে শ্রীপুর ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমান রিপন তার ফেসবুকে (এম এম রহমান রিপন) পোস্টে লেখেন, ‘আগে থেকে গাজীপুরের বনভূমিতে প্রীতি গ্রুপ বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে মব সৃষ্টি করে বনভূমি দখল করে রেখেছে। মজার ব্যাপার হলো, এসব করতে বন বিভাগের গায়ে একটি সহজ তকমা লাগালেই হয়ে যায়, সেটা হলো– অর্থ দিয়েছি। এটা কোনও কোনও ক্ষেত্রে ঘটেও থাকে। অবলীলায় এসব কারণে বহু সৎ কর্মকর্তা আক্রান্ত হয় এবং ফায়দা লোটে স্থানীয় নেতাকর্মী। ভবানীপুর বিটে ভাওয়াল গড় ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মুকুল, ইমরান সরকার, মৎস্যজীবী দলের নেতা হারুন প্রীতি গ্রুপের হয়ে ২০ ধারায় ঘোষিত সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে বেশ কয়েকদিন আগে রাতারাতি রাস্তা নির্মাণ করে দেয়। তাদের তকমা “জনস্বার্থে” এবং সম্ভবত ঊর্ধ্বতন নেতাদের এটাই বুঝিয়েছে। অথচ রাস্তা যেখানে গেছে, সেখানে কোনও বাড়িঘর নেই। বন বিভাগ কয়েক দফায় বাধা দিয়েও কাজ হয়নি।
‘আজ ঊর্ধ্বতন স্যারের নির্দেশে আমরা গেলাম রাস্তাটি উচ্ছেদ করতে, অবাক করার বিষয় হলো, প্রীতি গ্রুপের কেউ ওখানে উপস্থিত ছিলেন না, ছিলেন উপরোক্ত দালাল গোছের নেতাকর্মী, রাস্তা উচ্ছেদের সময় কয়েকশ নেশাগ্রস্ত লোক ভাড়া করে নিয়ে হাজির, ফেসবুকে ঢুকে ভিডিও লাইভ করে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও ধাক্কাধাক্কি শুরু করল, জনাব মুকুল সংরক্ষিত বনে ঢুকে আইন অমান্য করে বিচারক হয়ে রাস্তা উচ্ছেদ করতে দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন।’
অভিযোগের বিষয়ে ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং গাজীপুর সদর উপজেলা জাতীয়তাবাদী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হোসেন বলেন, ‘রাস্তাটার বিষয়ে আদালত থেকে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আনা হয়েছে। এটার ৩টা কাগজ রয়েছে– আরএস, সিএস এবং এসএ। বন বিভাগ রাস্তার জায়গাটি গেজেট দাবি করেছে। রাস্তাটি প্রায় ৫০ বছর আগে থেকেই পায়ে হাঁটার রাস্তা। রাস্তাটি সংষ্কার করার জন্য ইটের সলিং করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থে এবং এখানে একটি কারখানা নির্মাণ হবে, ওই স্বার্থে রাস্তাটি করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে বন বিভাগের লোকজন ভেকু নিয়ে আসছে রাস্তা উঠিয়ে নেওয়ার জন্য।’
যুবদল নেতা ইমরান আরও বলেন, ‘আমাদের কথা হচ্ছে, এখানে ঘরবাড়ি করা হয়নি, রাস্তা করা হচ্ছে। আগামী ৩০ তারিখ আদালতে শুনানি হবে। ওইদিন যদি আদালত বলে, এটা বনের জায়গা তাহলে যেভাবে আছে সেভাবেই থাকবে। অথবা আদালত যে নির্দেশনা দেবেন সেটাই আমরা মেনে নেবো।’