‘আপা’ ডাকাকে কেন্দ্র করে বনফুল অ্যান্ড কোম্পানিকে জরিমানা, এক বিক্রয়কর্মীকে চাকরিচ্যুতি এবং পরে পুনর্বহালের ঘটনা নিয়ে সিলেটের ওসমানীনগরে তোলপাড় চলছে। অভিযোগ উঠেছে, সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশাকে ‘আপা’ ডাকায় ক্ষিপ্ত হয়ে বনফুল মিষ্টির শোরুমের ওই কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন তিনি। স্যোসাল মিডিয়া ও বিভিন্ন পত্রিকায় এ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এ ঘটনার জেরে ওই কর্মচারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলেও পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য তানসিনা রুশদী লুনার হস্তক্ষেপে তার চাকরি বহাল করা হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ‘আপা’ ডাকাকে কেন্দ্র করে নয় বরং ভোক্তা অধিকার রক্ষা ও বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে বাসি মিষ্টি বিক্রির অভিযোগে তাজপুর বাজারের ‘বনফুল’কে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশা। আর ওই কোম্পানির কর্তৃপক্ষ কর্মচারী আব্দুল মান্নানের কাছ থেকে জরিমানার টাকা সম্পূর্ণ আদায়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছিল বলেও অভিযোগ ওঠে। পরে মানবিক দিক বিবেচনা করে স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে তাকে ফের চাকরিতে পুনর্বহাল করে কোম্পানির সিলেট কারখানায় বদলি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।
কী ঘটেছিল সেদিন
ঈদের পরদিন বিকালে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশা একজন সাধারণ ক্রেতা হিসেবে তাজপুর বাজারের বনফুল শোরুম পরিদর্শনে যান। তিনি শোরুমের দীর্ঘদিনের কর্মচারী আব্দুল মান্নানের কাছে জানতে চান, মিষ্টিগুলো নতুন কিনা।
কর্মচারী মান্নান ক্রেতা মনে করে উত্তর দেন, ড্রাই মিষ্টিগুলো ঈদের আগের এবং নরমাল মিষ্টিগুলো আজকের। তখন ইউএনও বলেন, ‘তোমরা মানুষকে বাসি মিষ্টি দাও, আমার কাছে অভিযোগ আছে।’ জবাবে মান্নান তাকে বিষয়টি নিয়ে শোরুমের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে সমাধান করার অনুরোধ জানান।
একপর্যায়ে ইউএনওর উপস্থিতিতেই ভয় পেয়ে শো-রুম থেকে বের হয়ে যান কর্মচারী মান্নান। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে গেলে শোরুমের কর্মচারীদের মাঝে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি ও ভীতির সৃষ্টি হয়। পরে শোরুম ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া প্রশাসনের কাছে তাদের ত্রুটি স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে সরকারি আইন অমান্য করে বাসি খাদ্যসামগ্রী বিক্রির দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিয়ম অনুযায়ী বনফুল কর্তৃপক্ষকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
তবে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো হয়, ম্যানেজার মান্নানকে ইউএনওর কাছে ক্ষমা চাইতে বললে মান্নান বলেন, ‘আপা ভুল হয়েছে, আমাকে মাফ করে দেন।’ আর ‘আপা’ সম্বোধন করায় ইউএনও আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং তাৎক্ষণিক পুলিশ ডেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। এই ঘটনার পর বনফুল কর্তৃপক্ষ মান্নানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে।
পরে গত ১ জুন স্থানীয় সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা উপজেলা পরিষদে এলে ভুক্তভোগী মান্নান তার দ্বারস্থ হন। এমপি লুনা তার চাকরি বহালের জন্য স্থানীয় বিএনপির দুই নেতাকে দায়িত্ব দেন। বর্তমানে মান্নানের চাকরি বহাল হলেও তাকে সিলেট নগরীর খাদিম বিসিক শিল্প এলাকায় বনফুলের কারখানায় বদলি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী কর্মচারী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমি ৩২ বছর ধরে বনফুলে চাকরি করছি, আমার কোনও খারাপ রেকর্ড নেই। তিনি সাধারণ ক্রেতা সেজে আসায় আমি চিনতে পারিনি। ম্যানেজার স্যারের নির্দেশে আমি “আপা ভুল হয়েছে” বলে মাফ চেয়েছিলাম। এ ঘটনার পর মোবাইল কোর্ট বসিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু কোম্পানি আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। এটা আমার ওপর চরম অবিচার করা হয়েছিল।’
বনফুলের তাজপুর বাজার শোরুম ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া বলেন, ‘দোকান কর্মচারী মান্নান ইউএনও ম্যাডামকে না চিনে গুরুত্ব দেননি। তাই তাকে ক্ষমা চাইতে বলি। সে তখন “আপা ক্ষমা করে দেন” বলে ফেলে।’
আপনারা বাসি মিষ্টি বিক্রি করেন কিনা? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ড্রাই মিষ্টি এক-দুই দিন আগের থাকে, নরমাল মিষ্টি নতুনই থাকে। কখনও গরমে কোনও পণ্য নষ্ট হলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে চেক করে আউট করে দিই। বিষয়টি পত্রিকায় না লিখলে আমাদের জন্য ভালো।’
ওসমানীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস টি এম ফখর উদ্দিন বলেন, ‘ভুক্তভোগী ব্যক্তি বিষয়টি নিয়ে সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনার কাছে এসেছিলেন। এমপি মহোদয় উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনেছেন। তবে ঘটনার বিস্তারিত জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে যোগাযোগ করলে ভালো হবে।’ ইউএনও আপা বলায় জরিমানা করার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বলে জানান তিনি।
বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমার কলিগ। তিনি “আপা” ডাকার জন্য জরিমানা করতে পারেন না। হয়তো ক্রেতা হিসেবে গিয়ে ওই আউটলেটে কোনও সমস্যা দেখতে পেয়ে ভোক্তা অধিকার আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তিনি জরিমানা করেছেন।’
এদিকে, ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশার সরকারি ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।