যে কর্মকর্তার স্বাক্ষরে শিক্ষক বদলি, তিনিই চান বাতিল হোক

কুড়িগ্রাম সদরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের অন্তঃউপজেলা বদলিতে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বদলি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে টাকার বিনিময়ে ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকাশ্য অনিয়মে শিক্ষক বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষক নেতৃবৃন্দ। অনুসন্ধানে অনিয়মের প্রমাণও পাওয়া গেছে।

উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বেলগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে লোকজন নিয়ে শিক্ষা অফিসে যান। তিনি শিক্ষা কর্মকর্তাকে চাপ প্রয়োগ করে বদলি তালিকা পরিবর্তন করতে বাধ্য করেন। যদিও বিএনপির এই নেতা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এদিকে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক রাজনৈতিক ‘চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে’ নীতিমালা ভেঙে বদলির অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তবে ঠিক কারা তাকে চাপ প্রয়োগ করেছেন, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকালে বদলির আদেশ জারি করে ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটি’।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কমিটির সভাপতি এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সদস্য সচিব। সদরের ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদে বদলির ইচ্ছা পোষণ করে আবেদন করেন ৪৩ শিক্ষক। শুধুমাত্র শূন্য পদের বিপরীতে এসব আবেদন আহ্বান করা হয়। আবেদনের শেষ সময় ছিল সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা।

বদলি সংক্রান্ত নথিপত্র এবং আদেশ যাচাই করে দেখা গেছে, ১২ শিক্ষককে বদলির আদেশ জারি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮ শিক্ষককে নীতিমালা লঙ্ঘন করে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি আবেদনের সময় শেষ হওয়ার পর তালিকা পরিবর্তন করে নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্ত করারও অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের ৫টি নির্দেশনার ৪টিই লঙ্ঘন করা হয়েছে। শূন্য পদের বিপরীতে বদলি করার নির্দেশনা থাকলেও প্রকাশিত তালিকায় শূন্য পদ নেই এমন বিদ্যালয়ে শিক্ষক বদলি করা হয়েছে। লঙ্ঘন হয়েছে জ্যেষ্ঠতা। আবেদন করেননি এমন শিক্ষককেও বদলি দেখানো হয়েছে।

বদলির নীতিমালায় বলা হয়েছে, যেসব বিদ্যালয়ে পাঁচ বা তার কম সংখ্যক শিক্ষক কর্মরত আছেন, সেসব বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলি করা যাবে না। কিন্তু বদলির ক্ষেত্রে এই নির্দেশনাও লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বদলির আদেশে দেখা গেছে, জ্যেষ্ঠতার লঙ্ঘন করে চার শিক্ষককে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আবেদন না করেও বদলির সুযোগ পেয়েছেন একজন। শূন্য পদ নেই এবং বদলির পছন্দক্রমে নাম নেই এমন স্কুলে বদলির সুযোগ পেয়েছেন একজন শিক্ষক।

শিক্ষক বদলির তালিকায় দেখা গেছে, তালিকায় ২ নম্বর ক্রমে থাকা শিক্ষক বাশিরুল মুমিন খন্দকারকে ২ শিক্ষকের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে, ৩ নম্বর ক্রমিকে থাকা রোখসানা পারভীনকে ৩ জনের, ৪ নম্বর তালিকায় থাকা পাপড়ী রানীকে ৬ জনের এবং ৮ নম্বর ক্রমিকে থাকা ফরিদা বেগমকে সর্বোচ্চ ১০ জনের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলির সুযোগ দিয়েছে উপজেলা কমিটি।

তালিকায় ১০ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষক আব্দুর রহিমকে সদরের পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি দেখানো হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা অফিসের শূন্য পদের তালিকায় ওই স্কুলের নাম ছিল না। আব্দুর রহিম তার বদলির পছন্দক্রমে ওই স্কুলের নামও উল্লেখ করেননি।

বদলির সুযোগ পাওয়া ১২ নম্বর ক্রমিকের শিক্ষক মাহমুদা আক্তার বদলির আবেদনই করেননি। প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রকাশিত ৪৩ আবেদনকারীর তালিকায় তার নাম নেই। কিন্তু তাকেও বদলির সুযোগ দিয়েছে কমিটি। তালিকা পরিবর্তন করে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বদলির তালিকায় ৫ নম্বর ক্রমিকে থাকা শিক্ষক মনিরা আক্তারের চাকরি ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হয়েছে। কিন্তু তাকে ২০১০ সালে যোগদান দেখিয়ে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বলছেন, লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা বদলি বাণিজ্য করেছেন। তাদের চাপে পড়ে কিংবা সুবিধা নিয়ে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এই আদেশ জারি করা হয়েছে। বদলির প্রকৃত দাবিদার শিক্ষকদের বঞ্চিত করা হয়েছে।

সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমি অফিসে গিয়ে ইউএনও এবং শিক্ষা কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ দিয়ে এসেছি। আমি কোনও চাপ প্রয়োগ করিনি। যারা অভিযোগ তুলেছেন, তারা সঠিক বলেননি।’

বদলিতে অনিয়মের অভিযোগ স্বীকার করেছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘আমি অসহায়। বাধ্য হয়েছি। যেগুলো অভিযোগ তুলেছেন, তা আমি অস্বীকার করছি না। আমাকে তালিকা দিয়ে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছে। আমি স্বাক্ষর করেছি। কে বা কারা চাপ দিয়েছে, তা আমি বলতে পারবো না। আমাকে এমন প্রশ্ন করবেন না, যার উত্তর দিলে আমার চাকরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

এই শিক্ষা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে এখানে যোগদান করেছি। শিক্ষকদের ভালো করে চিনি না। টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি চেয়েছি নীতিমালা অনুযায়ী হোক। শিক্ষকরা ন্যায্য সুবিধা পাক। কিন্তু এখানকার সব খবর আপনারা জানেন। আর চাপ ও দুর্নাম নিতে পারছি না। আমি চাই এই বদলি আদেশ বাতিল হোক।’

ইউএনও মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘তেমন রাজনৈতিক চাপ নয়, কিছু সুপারিশ ছিল। বড় ধরনের কোনও অনিয়ম হয়ে থাকলে বদলি আদেশ বাতিল করা হবে।’