‘আমার স্বামী একটা সন্তানের চাকরি বা বিয়ে দেখে যেতে পারলেন না। তিনি যদি বাজারে আলু-পটল বিক্রি করতেন তাহলে হয়তো খুন হতেন না। তার একটাই দোষ তিনি বুদ্ধিজীবী।’ গুমরে ওঠা কান্না চেপে রেখে কথাগুলো বলেন নিহত অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিমের স্ত্রী হোসনে আরা।
সোমবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ আয়োজিত শোকসভায় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ শোকসভা শুরু হয়ে দুপুর পর্যন্ত চলে।
হোসনে আরা কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন,‘ বিভিন্ন গণমাধ্যমে শুধু সিদ্দিকীর ( অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী) গানের স্কুলের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু, তিনি তো সেখানে শুধু গান-বাজনা করতেন না, ওই স্কুলের শিক্ষার্থীদের ক্রিকেট খেলার সরঞ্জামও কিনে দিতেন। এটা যদি তার অপরাধ হয় তাহলে সব ক্রিকেটপ্রেমীকেও হত্যা করা উচিত। তিনি বিভিন্ন স্কুল-মাদ্রাসার গরিব-দুঃখী ছাত্রসহ সবার পাশেই দাঁড়াতেন এ কথা কয়জন জানেন?’
প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বামীর হত্যার বিচার চেয়ে হোসনে আরা বলেন, আমার স্বামী হত্যার বিচার করে দেখান, বাংলাদেশ কতটুকু এগিয়েছে। তার প্রমাণ দেন।’ এসময় তিনি এ হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন,‘ যে দেশে সাগর-রুনি হত্যার বিচার হয় না, সেই দেশে কি সিদ্দিকী হত্যার বিচার হবে?’
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মুহাম্মদ তারিক-উল-ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই শোকসভায় আরও বক্তব্য রাখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান, রেজাউল করিমের মেয়ে রিজওয়ানা হাসিন শতবি, ছেলে রিয়াসাত ইমতিয়াজ সৌরভ প্রমুখ। এসময় বিভাগের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরাও বক্তব্য রাখেন।
এসময় হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার দাবি করে অধ্যাপক রেজাউলের মেয়ে রিজওয়ানা হাসিন শতবি বলেন, ‘আমার আব্বু সংস্কৃতিমনা ছিলেন। কিন্তু, কবিতা আবৃত্তি ও গান-বাজনা করলে এবং সেতারা বাজালেই কী মানুষ খারাপ হয়ে যায়? নাস্তিক হয়ে যায়? ‘নাস্তিক’ এর মিথটা মানুষের সৃষ্টি। এটা একটা ভুল, এই ভুল আমাদের ভাঙাতে হবে।’
শতবি বলেন,‘অনেক গণমাধ্যমে আমার আব্বুকে ‘ব্লগার’ বলা হয়েছে। অথচ আমার আব্বু ফেসবুকই ভালোভাবে বুঝতেন না। তিনি ব্লগার ছিলেন না। এটা মিথ্যা। তিনি সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করতেন।’
রেজাউলের বড় মেয়ে শতবি বলেন,‘আমাদের বাড়িতে কিছুদিন আগে কিছু নতুন ঘর তৈরি করা হয়েছিল। সেসময় তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে কাজ করেন। এজন্য আমরা তাকে বারণ করতাম। এর জবাবে তিনি বলতেন, ‘আরে বাপুরে বসে থাকার চেয়ে কাজ করা ভালো। একটু না হয় করলাম।’
শতবি আরও বলেন,‘তাঁর বয়স হয়েছিল ষাট (৬০), কিন্তু মনের দিক থেকে তিনি খুবই বাচ্চা ছিলেন। আমার সেই ছোট্ট বাচ্চাটা চলে গেলো। তিনি কখনও কালোকে সাদা আর সাদাকে কালো বলতেন না, তিনি ন্যায়ের কথা বলতেন।’
অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন,‘একজন শিক্ষার্থীকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। আর তিনি এই রকম একজন শিক্ষক ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ হাজার শিক্ষার্থীর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরা বলছি, আমরা এই হত্যার বিচার চাই, তার আত্মার শান্তি চাই।’
শোকসভায় বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
/জেবি/টিএন/
আরও পড়তে পারেন:
নতুন ছবিটা আর বানানো হলো না অধ্যাপক রেজাউলের