তিন উৎসবকে ঘিরে বরিশালে জমে উঠেছে ফুল ব্যবসা

flowersবসন্তবরণ, ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস- এই তিন উৎসবকে সামনে রেখে বরিশালে জমে উঠেছে ফুল ব্যবসা। ইতোমধ্যে নগরীর ফুলের দোকানগুলোয় বাসন্তি, হলুদ গাঁদা এবং জারবেরাসহ বিভিন্ন ফুলে ভরে উঠেছে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী জোগান দিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন জেলার ফুলচাষি, পাইকার ও শ্রমিকরা। চলতি মৌসুমে বড় ধরনের কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হওয়ায় ফুলের উৎপাদন ভালো হয়েছে বলে দাবি ফুলচাষিদের। তাই এবার বেচাকেনাও ভালো হবে বলে আশা করছেন তারা।

বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে বরিশালের সদর, বানারীপাড়া ও পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি- এ তিন উপজেলায় ৫০০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে দীর্ঘদিন থেকে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ হচ্ছে।
পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা প্রতিদিন এখান থেকে নানা জাতের ফুলসহ চারা কিনে ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, ফরিদপুর, বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন।

এ তিন উপজেলায় ফুল ও ফুলের চারা চাষাবাদের সঙ্গে গ্রামের প্রায় তিন হাজার শ্রমজীবী পরিবার জড়িত থেকে সংসার চালাচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই তিন উপজেলায় প্রায় ২ হাজার নার্সারির অধিকাংশ শ্রমিকই নারী। এ খাতে অন্তত ১০ হাজার নারী কর্মরত রয়েছেন এই এলাকার। এর ফলে নারীদের জীবন মানেও উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে ।

flowers-1সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন জানান, বরিশালে গত তিন মাস ধরে সদর উপজেলার ফুলচাষিরা প্রায় ৬ হেক্টর জমিতে গ্ল্যাডিওলাস ও অন্যান্য ফুল চাষ করছেন।

বরিশালের গ্ল্যাডিওলাস ফুলচাষিরা জানান, বিদেশি গ্ল্যাডিওলাস ফুল এত বছর একচেটিয়া উৎপাদন হতো বাংলাদেশের যশোর অঞ্চলে। এখন বরিশালের ফুল বাজারেও গোলাপ, রজনীগন্ধার পরেই গ্ল্যাডিওলাসের চাহিদা। এ মৌসুমে গ্ল্যাডিওলাসের প্রতিটি স্টিক বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা দরে।
গত নভেম্বর মাসে এ ফুলের চাষ শুরু হলেও চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই ফুল দিতে শুরু করেছে।

বরিশাল সদর উপজেলার কড়াপুর গ্রামের ফুলচাষি হোসনে আরা বেগম, করমজা গ্রামের গিয়াসউদ্দিন লিটু, কর্ণকাঠির ছালাম আকন, সাগরদীর আনিছুর রহমান, রূপাতলীর শহিদুল ইসলাম প্রত্যেকেই তাদের পাঁচ থেকে দশ শতক করে জমিতে এবার গ্ল্যাডিওলাস ফুলের চাষ করেছেন।
বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জলিলুর রহমান বলেন, ‘চলতি বছর এই উপজেলায় ৬৮টি নার্সারিতে ৩০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফুলের চারা উৎপাদিত হয়েছে। গত বছর ৬০টি নার্সারিতে ২৫ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়। বানারীপাড়া উপজেলার শতাধিক পরিবার দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছের চারা উৎপাদন করে স্বাবলম্বী হয়েছে।’

বরিশালের বানারীপাড়ার উদয়কাঠির সুকন্যা নার্সারির মালিক সুফলা রানী জানান, তিনি এক হেক্টর জমিতে গাঁদা, গ্ল্যাডিওলাস ও জিনিয়াসহ মৌসুমি ফুলের চাষ করেছেন।

তিনি আরও জানান, প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয়ে ফুল চাষ করা হলেও ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় তিনি এ ব্যবসার প্রসারতা বাড়াতে পারছেন না।

flowers-2পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা রিফাত শিকদার জানান, উপজেলার এক হাজার ৭৮৩ নার্সারিতে চলতি মৌসুমে ৪৮৪ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়েছে। গত বছর ১ হাজার ৭৫০ নার্সারিতে ৪৪০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়েছিল।

সন্ধ্যা নদীর চিরাপাড়া এলাকায় প্রতি বছর মৌসুমের শুরু থেকেই ফুলের চারার ভাসমান হাট বসে। শীত ও বর্ষায় উপকূলীয় এলাকাগুলোর হাটবাজারে বেচাকেনা হয় এ হাটের ফুলের চারা।
সন্ধ্যা নদীর চিরাপাড়া এলাকা ছাড়াও কচুয়াকাঠি মোহনায়ও বসে ভাসমান ফুলের চারার হাট।
প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও সোমবার নৌকায় করে দুই দিনের এ ভাসমান হাটে বসে শীতের ফুলের চারার পসরা। ভাসমান এ হাটে লাখ টাকার ফুলের চারা বিক্রি হয়।

পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ফুলসহ গাছের চারার চাহিদা বেশি থাকায়  চাষিরা চারা উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন বেশি। প্রতিটি চারা পলিথিনের প্যাকেটে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ফলে চারা থেকে মাটি ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। ক্রেতা ওই পলিথিন কেটে টব অথবা মাটিতে চারা রোপণ করে থাকেন।

এ হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার অলংকারকাঠি ও সংগীতকাঠিতে রয়েছে দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফুলের চারার নার্সারি। সেখান থেকে গাঁদা, গোলাপ, জিনিয়া, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকাসহ ২০ থেকে ২৫ জাতের ফুলের চারা সংগ্রহ করে বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করা হয়। তবে বেশি বেচাকেনা হয় ভাসমান হাটে। প্রতি শীত মৌসুমে হাটে কয়েক লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়।


বরিশাল নগরীর ফুল ব্যবসায়ী সমিতির নেতা মাজহার গাজী বলেন, ‘নগরীতে ছোট-বড় ১২টি ফুলের দোকান রয়েছে। গত বছরের মতো এবারও নগরীর ফুল ব্যবসায়ীরা ব্যাপক লাভের আশা করছেন। গত বছর রেকর্ড পরিমাণ ১৫ লাখ টাকার ব্যবসা করেছেন নগরীর ফুল ব্যবসায়ীরা। এবারও তারা রেকর্ড পরিমাণ টাকার ফুল বিক্রি করার প্রস্তুতি নিয়েছেন।’

তবে ব্যাংক ঋণ, ন্যায্যমূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক, হিমাগার, পরিবহন, প্যাকেজিং সুবিধা না পাওয়ায় ফুল চাষের এই উদ্যোগ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে পারছে না বলে তিনি মনে করেন।