‘পদ্মার ইলিশ আর পাবনার ঘি/ জামাইয়ের পাতে দিলে আর লাগে কি?’ ইলিশ নিয়ে এই প্রবাদ দেশের অনেক এলাকাতেই প্রচলিত। দেশের বিভিন্ন এলাকা তো বটেই, বিদেশেও কদর রয়েছে ইলিশের। তবে সেই ইলিশ যদি সাধারণ আকারের না হয়ে বিশালাকৃতির হয়, তবে রসনাবিলাসের আনন্দ রূপ নেয় এক উৎসবে। উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে এবং আড়তদারদের ভাষায় এই আকারের মাছগুলোই হলো ‘রাজা ইলিশ’। সাধারণ বাজারে যেখানে ১ কেজি ওজনের ইলিশকে বড় ধরা হয়, সেখানে ২ থেকে তিন কেজি কিংবা তার চেয়ে বেশি ওজনের একেকটি রূপালি ইলিশ যেন আদিম সম্রাট। সাগরের মোহনা কিংবা প্রমত্তা পদ্মা-মেঘনার বুক থেকে যখন এই রূপালি রাজারা মৎস্যজীবীদের জালে উঠে আসে, তখন আড়তজুড়ে শুরু হয় হুলুস্থুল।
সবশেষ মঙ্গলবার ভোলার মেঘনা নদীতে আবার ধরা পড়েছে আড়াই কেজি ওজনের একটি ‘রাজা ইলিশ’। মনপুরা উপজেলার রামনেওয়াজ মৎস্যঘাটে আনার পর মাছটি প্রথমে নিলামে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও, পরে ঘাটে বসেই ঢাকার এক ক্রেতার কাছে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। চলতি মৌসুমে নদীতে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ না মিললেও এমন বড় মাছ ধরা পড়ায় জেলে ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।
এর আগে গত শুক্রবার ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা তালতলি মৎস্যঘাটেও আড়াই কেজি ওজনের আরেকটি ‘রাজা ইলিশ’ ধরা পড়েছিল। জেলে মিরাজ মাঝি সাগর মোহনা থেকে মাছটি নিয়ে আসেন। সেটি নিলামে ১২ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হলেও পরদিন ঢাকার আড়তে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে বড় আকারের এমন ইলিশ ‘রাজা ইলিশ’ নামে পরিচিত।
আসে কোথা থেকে
মঙ্গলবার দুপুরে মনপুরা ইউনিয়নের রামনেওয়াজ মৎস্যঘাটে জেলে এমরান মাঝি মাছটি নিয়ে আসেন। তিনি জানান, সকালে মেঘনা নদীতে জাল তোলার সময় অন্যান্য ইলিশের সঙ্গে বড় আকৃতির ইলিশ মাছটিও ধরা পড়ে। পরে ফরহাদ হাওলাদারের আড়তে নিলামে তোলা হলে সর্বোচ্চ দর দিয়ে মাছটি কিনে নেন ব্যবসায়ী শাওন হাওলাদার।
মৎস্য ব্যবসায়ী মো. মাইনউদ্দিন বলেন, নিলামে মাছটি শাওন হাওলাদার ১৫ হাজার টাকায় কেনার পরে ঢাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী দরদামে অংশ নেন। পরে ঢাকার এক ক্রেতা মোবাইলে যোগাযোগ করে মাছটি ২০ হাজার টাকায় কিনে নেন।
শাওন হাওলাদার বলেন, ‘আমি নিলাম থেকে মাছটি ১৫ হাজার টাকায় কিনেছি। পরে ব্যক্তিগতভাবে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। ক্রেতার পরিচয় প্রকাশ করতে চাই না।’
ইলিশা তালতলি মৎস্যঘাটের আড়তদার নাগর হাজারি বলেন, ‘চলতি মৌসুমে এত বড় ইলিশ খুব কমই দেখা গেছে। স্থানীয়ভাবে এটিকে মৌসুমের অন্যতম বড় ইলিশ হিসেবে ধরা হচ্ছে।’
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হুসাইন বলেন, ‘আড়াই কেজি ওজনের একটি ইলিশের বয়স আনুমানিক দুই থেকে আড়াই বছর হতে পারে। সামনে ডিম ছাড়ার মৌসুম হওয়ায় বড় ইলিশ নদীমুখী হচ্ছে। মেঘনা নদীতে এখনও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ মিলছে না। ফলে জীবিকার তাগিদে অনেক জেলে গভীর সাগর মোহনায় মাছ ধরতে যাচ্ছেন। সেখানে মাছের সম্ভাবনা থাকলেও বৈরী আবহাওয়া, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও উচ্চ ব্যয়ের কারণে প্রতিটি যাত্রাই অনিশ্চয়তায় ভরা। তবু জীবিকার প্রয়োজনে নদী ও সাগরের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন উপকূলের জেলেরা। মূলত বড় ইলিশগুলো সাগর মোহনায় ধরা পড়ে।’
নাম কেন রাজা ইলিশ
সাধারণত বাজারে ৭০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশকে বেশ বড় মনে করা হয়। কিন্তু রাজা ইলিশের গল্পটা একেবারেই ভিন্ন। মৎস্য বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে, দুই থেকে আড়াই বছর বা তার বেশি বয়সী মা ইলিশগুলোই মূলত বড় আকার ধারণ করে। এদের রূপালি আঁশগুলোর ওপর থাকে বেগুনি আর সোনালি আভা। নদী বা সাগরের গভীর জলরাশি দাপিয়ে বেড়ানো এই মাছগুলো যেমন ওজনে ভারী, তেমনি এদের শারীরিক গড়নও হয় তীব্র আকর্ষণীয় ও চওড়া।
ইলিশের আসল জাদু লুকিয়ে আছে চর্বি বা তেলে
রাজা ইলিশ আকারে যত বড় হয়, এর শরীরে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ তেলের পরিমাণও তত বাড়ে। রান্না করার সময় এই মাছ থেকে যে সুবাস ছড়ায়, তা মুহূর্তেই চারপাশ মৌ মৌ করে তোলে। ভাজা হোক কিংবা সর্ষে ইলিশ, রাজা ইলিশের একেকটি টুকরোর স্বাদ যেন সাধারণ মাছের চেয়ে মুখে লেগে থাকার মতো অনন্য ও মাখনের মতো নরম হয়।
রাজা ইলিশ আসা মানেই উৎসবের আমেজ
যেহেতু এই ওজনের ইলিশ সচরাচর জালে ধরা পড়ে না, তাই ঘাটে তোলার পর শুরু হয় প্রকাশ্য ডাক বা নিলাম। একেকটি আড়াই থেকে তিন কেজি ওজনের রাজা ইলিশ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি মূল্যে বিক্রি হয়। সাধারণ ক্রেতাদের সাধ্যের বাইরে হলেও সৌখিন ভোজনরসিক বা করপোরেট উপহার হিসেবে এই রাজকীয় মাছ লুফে নেওয়ার জন্য তৈরি থাকেন এক শ্রেণির মানুষজন।
মৎস্য কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ইদানীং জাটকা নিধন রোধ এবং মা ইলিশ সংরক্ষণের সঠিক সরকারি উদ্যোগের কারণেই নদী ও সাগরে ইলিশের গড় ওজন বেড়েছে। মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পাওয়ায় তারা দীর্ঘায়ু হচ্ছে এবং এই বিশাল আকৃতির ‘রাজা ইলিশের’ দেখা মিলছে। ‘মা ভালো তো, বাচ্চা ভালো’—এই নীতিতে বড় ইলিশের বংশবৃদ্ধি দেশের মৎস্য সম্পদের জন্য এক দারুণ আশার আলো।
পদ্মা ও মেঘনার মোহনার প্রভাব
সমুদ্র থেকে ডিম ছাড়ার জন্য যখন পূর্ণবয়স্ক বড় ইলিশগুলো পদ্মা, মেঘনা বা চাঁদপুরের নদী অববাহিকায় প্রবেশ করে, তখন নদীর মিষ্টি পানি ও লোনা পানির মিশ্রণ এবং সেখানকার বিশেষ খাবারের কারণে এদের শরীরে তেলের পরিমাণ বাড়ে ও স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়।
রাজকীয় দাম ও চাহিদা
বাজারে বড় আকারের ইলিশগুলো বেশ বিরল। ফলে এগুলোর দামও সাধারণ ইলিশের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। উচ্চমূল্য এবং আভিজাত্যের প্রতীক হওয়ায় একে ইলিশের মধ্যে ‘রাজা ইলিশ’ বলা হয়।
মনপুরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, ‘বর্তমানে মেঘনা নদীতে ইলিশের সংকট চলছে। এর মধ্যে বড় আকৃতির রাজা ইলিশ জেলেদের জালে ধরা পড়লে তা তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বিষয়। সামনে নদীতে আরও বড় আকৃতির ইলিশসহ অন্যান্য মাছ ধরা পড়বে বলে আশা করছি আমরা।’