ফেনীর রাজনৈতিক আলোচনায় নিজাম হাজারী

নিজাম হাজারীজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম হাজারীর সংসদ সদস্য পদ নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদনের রায়ের ধার্য দিনকে ঘিরে ফেনীর রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে ব্যাপক আলোচনা।

এ মামলার রায়ে শেষ পর্যন্ত  নিজাম হাজারী সংসদ সদস্য পদ না থাকলে কে হবেন ফেনী সদরে পরবর্তী সংসদ সদস্য ও  দলের জেলা  সাধারণ সম্পাদক, তা নিয়ে এখনই তার বিরোধী শিবির হিসাব-নিকাশ কষছেন। 

বুধবার (০৩ আগস্ট) বিচারপতি মো. এমদাদুল হক ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এ শুনানি শেষে আগামী ১৭ আগস্ট এ বিষয়ে আদেশ দেওয়ার ঘোষণা দেন আদালত।

এ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজাম হাজারীর সংসদ সদস্য বহাল থাকা না থাকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার ঝড় ওঠে ।

স্থানীয় রাজনৈতিকেরা মনে করছেন, এই ইস্যুতে নিজাম হাজারীর দলীয় প্রধান প্রতিপক্ষ জয়নাল হাজারী তার সম্পাদিত ’হাজারিকা’  পত্রিকা বেশ সরব। এই ইস্যুতে জয়নাল হাজারীর সঙ্গে অপ্রকাশ্য জোট বেঁধেছেন প্রধানমন্ত্রীর গণমাধ্যম বিষযক উপদেষ্টা সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও হাজি রহিম উল্যাহ এমপিসহ ক্ষমতাসীন দলের একটি প্রভাশালী মহল। তাদের মতে, রায়ের  ওপর নির্ভর করছে নিজাম হাজারীর রাজনৈতিক ভবিষ্যত।

সূত্র জানায়, গত বছর নিজাম হাজারীর দলীয় প্রতিপক্ষ ফেনীর পতিত গডফাদার ও সাবেক জয়নাল হাজারীর অনুগত ক্যাডার ‘ক্লাস কমিটি’র ক্যাপ্টেন সাখাওয়াত হোসেন বাদী হয়ে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন।

রিট পিটিশনে সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে দণ্ডপ্রাপ্ত নিজাম হাজারীর কারাভোগ শেষ হওয়ার আগে মুক্তি পাওয়া ও পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার আগে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ অবৈধ বলে উল্লেখ করা হয়।

গত জুলাই মাসে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন বিচারিক আদালতে এ বিষয় প্রতিবেদন দাখিল করেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অস্ত্র আইনের মামলায় সাজা শেষ হওয়ার আগেই জেল থেকে জামিনে বের হন সাজাপ্রাপ্ত নিজাম হাজারী। এতে এমপি নিজাম হাজারী একটি অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজার দুই বছর ছয় মাস ১৬ দিন কম ভোগ করেছেন।

এই মামলায় গতকাল বুধবার গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এ শুনানি শেষ হয়। আগামী ১৭ আগস্ট এ বিষয়ে আদেশ দেওয়ার ঘোষণা দেন আদালত।

ফলে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যেও এ ব্যাপারে সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নিজাম হাজারীর সংসদ সদস্য পদ না থাকলে তার শূন্য পদে কে হবেন পরবর্তী সাংসদ ও  দলের জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক, তা নিয়েও নির্বাসিত জয়নাল হাজারীর সমর্থকরা জল্পনা-কল্পনা শুরু করে দিয়েছেন।

মামলায় দণ্ডের পুরো মেয়াদ ভোগ করেই কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছেন বলে দাবি করে সংসদ সদস্য নিজাম হাজারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ফেনীর জনগণের প্রত্যাখ্যাত এক ব্যক্তি উদ্দেশ্যমূলকভাবে তার অনুগত এক ব্যক্তিকে দিয়ে এ মামলাটি দায়ের করেন, যা মহামান্য আদালত শুনানি শেষ করেছেন। এখন  রায়ের অপেক্ষায় আছে।

তিনি বলেন, আমি আদালতের রায়ে এর সুবিচার পাবো বলে প্রত্যাশা করছি। 

তিনি আরও বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমি ফেনীর অতীতের বদনাম ঘুছিয়েছি। ফেনী এখন দেশে ও বিদেশে  উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধ এক জনপদ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। ফেনীর অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত এই অপশক্তি ফেনীকে অশান্ত করতে নানাভাবে অপচেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। ফেনীর মানুষ এ ব্যাপারে অনেক সচেতন। তারা যে কোনও মূল্যে এই  অপশক্তিকে ফেনীর মাটিতে স্থান দেবে না।   

আওয়ামী লীগ থেকে  বহিষ্কৃত, সাবেক এমপি জয়নাল হাজারী মোবাইল ফোনে এই মামলা সর্ম্পকে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কারাগার মহাপরিদর্শক আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর আর বলার অপেক্ষা রাখে না, মামলার ভবিষ্যত কী হতে পারে!

তিনি বলেন, আদালতের রায় নিজামের বিপক্ষে গেলে জেলা আওয়ামী লীগে অনেক পরিবর্তন আসবে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদও নিজামকে ছাড়তে হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী যুগ্মসাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব পাবেন। যুগ্মসাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির আদেলও বর্তমানে ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম হত্যা মামলার আসামি হিসেবে জেলহাজতে।

এ বিষয়ে ফেনী জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আজিজ আহাম্মদ চৌধুরী বলেন, নিজাম হাজারীর বিরুদ্ধে দায়ের করা রিট পিটিশন নিয়ে ফেনী আওয়ামী লীগ অবশ্যই শঙ্কিত। তিনি অভিযুক্ত হলে ফের জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ডাকতে হবে।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রহমান বিকম বলেন, নিজাম হাজারীকে বাদ দিয়ে ফেনী আওয়ামী লীগ নতুন কিছু কল্পনা করতে পারে না। অতীতে যারা ফেনীকে অশান্ত করেছে, তারা আবার শান্ত ফেনীকে অশান্ত করতে নিজাম হাজারী বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নেমেছে। ফেনীর মানুষ এই অপশক্তির সব যড়যন্ত্র রুখে দেবে।

ফেনী-৩ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজি রহিম উল্যাহ বলেন, নিজাম হাজারীর এই মামলার রায়কে ঘিরে  ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন দিন আসছে। এই মেরুকরণে ইকবাল সোবহান চেীধুরী ও জয়নাল হাজারীর নেতৃত্বে ফেনীর আওয়ামী লীগের রাজনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। 

জেলা যুবলীগের সভাপতি দিদারুল কবির রতন বলেন, এটি ফেনীর পতিত গডফাদার জয়নাল হাজারীর নতুন খেলা।  এর সঙ্গে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রহিম উল্যাহসহ কয়েকজন আপদ জড়িত আছেন। এতে নিজাম হাজারী তথা জেলা আওয়ামী লীগের কোনও ক্ষতি করার মতো ক্ষমতা এদের  নেই। সুতরাং এই নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কোনও দুশ্চিন্তা থাকার কারণ নেই।

আরও পড়ুন- 

যে কারণে অলস পড়ে আছে ৬শ’ কোটি টাকা
সাবেক জঙ্গি বললো, বাংলাদেশে এজেন্ট পাঠিয়েছে আইএস

/এবি/আপ-এফএস/