টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান দুদু মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা নির্যাতিত ভিন দেশের মানুষ। মিয়ানমার আমাদের নানা জুলুম নির্যাতন করেছে। সেই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাংলাদেশে কোনোরকম আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগও কেড়ে নিলো প্রকৃতি। আল্লাহ আমাদের এত কষ্ট কেন দিচ্ছেন জানি না।’
উখিয়ার কুতুপালং নিবন্ধিত শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গা মো. ইউনুছ আরমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় মোরা’র আঘাতে উখিয়ার নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ৮০ শতাংশ ক্যাম্পের চালাঘর উড়ে গেছে। এতে গৃহহীন হয়ে পড়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। এসময় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে তাদের মধ্যে দুই শতাধিক মানুষ। ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে আগাম কোনও তথ্য জানা না থাকায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।’
জেলার অন্যান্য এলাকার চেয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করে কুতুপালং অনিবন্ধিত ক্যাম্পের চেয়ারম্যান আবু ছিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্যাম্পগুলো মূলত টিন, পলিথিন, বাঁশ ও খড়ের তৈরি। এ কারণেই ঘূর্ণিঝড়ের শুরুতেই উড়ে গেছে সবকিছু। বিশেষ করে পাহাড়ের ক্যাম্পগুলো অবস্থান হওয়ায় বুঝে তৈরি না হওয়ায় ঝড় ওঠার আগেই সবকিছু তছনছ হয়ে যায়। এতে করে প্রায় ১০হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
উখিয়ার বালুখালীতে গড়ে উঠা নতুন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আয়ুব আলী মাঝি ও লালু মাঝি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নতুন করে গড়ে উঠা বালুখালীর এই ক্যাম্পে প্রায় ১৫ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। এসব রোহিঙ্গাদের একজনের ঘরও ঠিক নেই। সব বাতাশে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর থেকে কোনও সাহায্য সংস্থার লোকজনও এখানে আসেনি এখন পর্যন্ত। তবে একটি এনজিও জনপ্রতি দুই কেজি করে চাল বিতরণ করেছে।’
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাঈন উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঘূর্ণিঝড়ে উখিয়ার বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্প কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের মধ্যে নিবন্ধিত রোহিঙ্গারা নিয়মিত ত্রাণ পাচ্ছেন। এছাড়াও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা যারা আছেন তাদের সপ্তাহে একবার ওয়ার্ল্ড ফুড এবং বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা ত্রাণ বিতরণ করছে।’
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা’র (আইওএম) কক্সবাজার অঞ্চলের প্রধান সানজুক্তা সাহানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নতুন করে গড়ে উঠা ক্যাম্পগুলোর মধ্যে উখিয়ার কুতুপালংয়ে ১২ হাজার ঘরের মধ্যে ৬ হাজার, বালুখালীতে ২ হাজার ৮শ ঘরের মধ্যে প্রায় ৭শ , টেকনাফের লেদায় ২ হাজার ৩শ ঘরের মধ্যে ২ হাজার ৮৫টি ও শামলাপুরে ১৯শ ঘরের মধ্যে ১২শ ঘর নষ্ট হয়ে গেছে। একইসঙ্গে টেকনাফে ‘আইওএম’ এর অফিস, হাসপাতাল ও সোলারপ্যানেলগুলো সবকটি ভেঙে গেছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাম্পে পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্য সেবা ভেঙে পড়েছে। এজন্য ‘আইওএম’র মেডিক্যাল টিম কাজ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভেঙে যাওয়া ঘরগুলো পলিথিন, বাঁশ, টিন ও মাটির দেয়ালে তৈরি হওয়ায় এরমধ্যে কিছু কিছু ঘর নিজ উদ্যোগে মেরামত করছে রোহিঙ্গারা। আর যেগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের ‘আরওএম’ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।’
উল্লেখ্য ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের মুসলিমপ্রধান এলাকায় সন্ত্রাসীদের সমন্বিত হামলায় ৯ পুলিশ সদস্য নিহত হয়। এর দায় চাপানো হয় রোহিঙ্গাদের ওপর। আর তখন থেকেই শুরু হয় সেদেশে সেনাবাহিনীর দমন পীড়ন প্রক্রিয়া। জাতিসংঘের হিসাবে, এ ঘটনায় ঘরহারা হয়েছেন ৩০ হাজার মানুষ। পালাতে গিয়েও গুলি খেয়ে মৃত্যু হয়েছে অন্তত দু’শতাধিক রোহিঙ্গার। মৃত্যুর ভয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আশ্রয় নিয়েছে কমপক্ষে ৭০ হাজার রোহিঙ্গা। বর্তমানে কক্সবাজার জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ। আর নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ৩২ হাজার।
/এফএস/
আরও পড়ুন-
সংসদে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট