ঘূর্ণিঝড় মোরা: মহেশখালীর জেলে পল্লীতে স্বজনহারাদের আর্তনাদ

ঘূর্ণিঝড় মোরা’র আঘাতে স্বজনহারাদের আর্তনাদঘূর্ণিঝড় মোরা’র আঘাতে কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর পুটিবিলা জেলে পল্লীতে এখন চলছে স্বজন হারানো মানুষদের আর্তনাদ। স্থানীয়রা জানান, এই জেলে পল্লীর প্রায় প্রতিটি বাড়ির কোনও না কোনও স্বজন নিখাঁজ রয়েছেন। মোরা’র আঘাতে কেউ হারিয়েছেন স্বামী, আবার কেউ হারিয়েছেন আদরের সন্তানকে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বজন নিখোঁজ থাকায় প্রতিটি বাড়িতে এখন শোকের মাতম। নিখোঁজ স্বজনরা ফিরে আসবে কিনা এ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় মোরা’র কবল থেকে যারা ফিরে এসেছেন তাদের চোখে মুখে এখনও রয়েছে আতঙ্ক। প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ায় সাগরে ভাসমান এসব জেলেদের শরীরের ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফিরে আসা জেলেরা।
ঘূর্ণিঝড় মোরা’র আঘাতে স্বজনহারাদের আর্তনাদফিরে আসা এমনই এক জেলে আনছারুল করিম। বয়স ৩০ এর কাছাকাছি। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২৮ মে স্থানীয় এফভি গাউশিয়া নামের একটি ফিশিং ট্রলার করে এক সপ্তাহের জন্য মাছ ধরতে যাই সাগরে। কিন্তু ৩০ মে হঠাৎ জানতে পারি ঘূর্ণিঝড় মোরা আঘাত হানবে। এ কারণে আমাদের দ্রুত কূলে ফিরে যেতে হবে। ওই ট্রলারে থাকা আমিসহ ২৫ জন আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে কূলে আসতে চাইলেও ওই দিন ভোর ৫টার দিকে ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। এসময় প্রত্যেকে পানির কন্টেইনার ধরে বাঁচার চেষ্টা করে। এভাবে ৩৭ ঘণ্টা পানিতে ভাসমান থাকার পর ভারতীয় নৌ-বাহিনীর সহযোগিতায় প্রাণে রক্ষা পাই।’
শুধু আনছারুল করিম নয়, তার মতো প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছেন ওই এলাকার বশির ড্রাইভার, নাসির মিয়া, কায়ছার, সাগর, এরশাদসহ অনেকেই। তারা জানিয়েছেন, নিজে ফিরে আসার মধ্যেও স্বস্তি নেই। কারণ তাদের চোখের সামনে সঙ্গীরা একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে পানিতে ডুবে যাওয়ার স্মৃতিই যেন তাদের বার বার তাড়া করছে।

সরেজমিন কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী পৌরসভার পুটিবিলা এলাকায় গিয়ে জানা যায়, ওই গ্রামের অলি আহমদ ও জান্নাত আরার পরিবারের চলছে কান্নার রোল। তাদের দুই সন্তান সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফেরেনি। ঘূর্ণিঝড় মোরার আগেই এরা গিয়েছিল সাগরে।
শুধু এই দুইজনই নয়, এই গ্রামে এ পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন আরও অর্ধশত জেলে। কারও বাবা, কারও সন্তান, কারও স্বামী, আবার কারও নিকট স্বজন। এখন সবাইকে ঘিরে চলছে শোকাবহ পরিবেশ। তারা স্বজনদের ফেরত আনতে সরকারের সহায়তা চেয়েছেন।ঘূর্ণিঝড় মোরা’র আঘাতে স্বজনহারাদের আর্তনাদ
মহেশখালী উপজেলার পৌরসভার কলেজপাড়া গ্রামের আব্দুল শুক্কুর। তার দুই ভাই সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে নিখোঁজ হন। একইভাবে দাস্বত্মীপাড়া গ্রামের মরিয়ম খাতুনের স্বামী হাবিবুল্লাহ মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন।
তারা ফিরে আসা জেলেদের কাছে জানতে পেরেছেন, ঝড়ের কবলে তাদের স্বজনরা ডুবে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন।
এখন তারা নিখোঁজ হওয়া এসব স্বজনদের মৃত বা জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় প্রহর গুণছেন। এজন্য তারা সরকারের সহায়তা কামনা করেছেন।
ঘূর্ণিঝড় মোরার পর ভারতীয় নৌ বাহিনী উদ্ধার এই গ্রামের ৩৩ জেলেকে করেছে। এই ৩৩ জনের স্মৃতিতেও রয়েছে নানা ভয়াবহতা। ফেরত জেলেরা ঘরে ফিরলেও শরীরে রয়েছে আঘাতের নানা চিহ্ন। অনেকেই চিকিৎসাও নিতে পারেননি।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল কালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহেশখালী উপজেলায় ৮২ জন নিখোঁজের মধ্যে একজনের মৃতদেহ এবং ৩৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছে ৪৮ জন। এদের তালিকা তৈরি করার কাজ চলছে। নিখোঁজ জেলেদের পরিবারকে সহায়তা করা হবে।’

কেবল মহেশখালী নয়, কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া, পেকুয়াসহ উপকুলে আরও অনেক জেলে নিখোঁজ রয়েছে। তাদের সঠিক পরিসংখ্যা জানেন না প্রশাসনও।

/এআর/