প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য দায়ী জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতা

শিক্ষার্থীদের মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতার কারণেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে বলে মনে করছেন চট্টগ্রামের একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকরা। তাদের মতে, বর্তমানে পরীক্ষার্থীরা চায় যেকোনও উপায়ে জিপিএ-৫ পেতে। তাদের এই প্রতিযোগিতার মানসিকতা থেকে তারা এখন প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িয়ে পড়ছে। অবশ্যই এজন্য অভিভাবকরাই বেশি দায়ী। পরীক্ষার ফল ভালো করার জন্য শিক্ষার্থীদের অনৈতিক পথে হাঁটতে অভিভাবকরাই  উদ্বুদ্ধ করছেন বলে অভিযোগ করছেন এই শিক্ষকরা। তারা বলছেন, কোনও কোনও ক্ষেত্রে অভিভাবকরাই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে সন্তানদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) এসএসসি পরীক্ষার পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সংগ্রহের দায়ে চট্টগ্রাম আইডিয়াল স্কুলের ২৪ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নয়জন ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সংগ্রহের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকায় তাদের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। একইদিন নগরীর আরেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুই শিক্ষার্থীকে একই অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া ওই দিন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকার আরেকটি পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে একই অভিযোগে সাত পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। চট্টগ্রামে এই ধরনের ঘটনায় হতাশ শিক্ষকরা। মহামারি রূপ ধারণ করা এই অপরাধ থেকে পরিত্রাণের জন্য শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষকরা।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মহিলা সমিতি (বাওয়া) স্কুলের প্রধান শিক্ষক আনোয়ারা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার জন্য দায়ী মূলত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়া নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। অভিভাবকরা সবসময় ছেলেমেয়েদের যেকোনও উপায়েই জিপিএ-৫ পেতে উদ্বুদ্ধ করেন। তারা সন্তানকে জিপিএ-৫ পাইয়ে দিতে নিজেরাও অপরাধ করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। সেটা যদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অপরাধ হয়, তারা সেটাও করতে রাজি আছেন।’

প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাহবুব হাসান। নিজের মেয়ে পরীক্ষার্থী থাকায় তিনি আপাতত দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন।

মাহবুব হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য আমি অবশ্যই নৈতিক স্খলনকে দোষ দেবো। আমাদের নৈতিক বল এত কম যে, আমরা লোভ সামলাতে পারছি না। এ জন্য শুধু শিক্ষার্থীদের দোষ দেবো না, অনেক অভিভাবকও এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া যেমন অপরাধ, তেমনি ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করা, সেটি দেখা, দেখে পরীক্ষা দেওয়াও অপরাধ। আর এটা নৈতিক স্খলনের কারণে হচ্ছে। আমার মনে হয়, নৈতিকতার জায়গায় আমাদের আরেকটু জোর দেওয়া উচিত।’

মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে নগরীর জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদের সামনে অপেক্ষমাণ শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসে তল্লাশি চালিয়ে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনে ফাঁস হওয়া পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্ন পান জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ আলী। পরে ওই প্রশ্নপত্রের সঙ্গে পরীক্ষার হলে প্রদত্ত প্রশ্নপত্রের মিল পায় প্রশাসন। যাচাই-বাছাই শেষে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ওই বাসে থাকা বিজ্ঞান বিভাগের ২৪ পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃত ২৪ জন পরীক্ষার্থী চট্টগ্রাম আরইডিয়াল স্কুলের শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে যাদের মোবাইল ফোনে প্রশ্নপত্র পাওয়া যায়, এমন সাত পরীক্ষার্থী এবং খাতায়  প্রশ্নোত্তর  লেখা পাওয়া আরও দুই পরীক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। এ সময় সাতটি মোবাইল ফোন সেট, ট্যাব ও উত্তরপত্র লেখা দুটি খাতা জব্দ করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। পরদিন বুধবার ওই নয় শিক্ষার্থীসহ ওই বাসে করে আসা স্কুল শিক্ষিকা কহিনুর আক্তারের নামে পাবলিক পরীক্ষা অ্যাক্ট আইনে কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পরে ওই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে দুপুরে তাদের আদালতে পাঠায় পুলিশ। 

এদিকে একই দিন মঙ্গলবার পুলিশ লাইন্স ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে পরীক্ষা শুরুর আগে দুই পরীক্ষার্থীর বাবা ম্যাসেঞ্জারে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে উত্তর মেলানোর সময় অন্য অভিভাবকরা হৈ চৈ শুরু করলে তিনি মোবাইল ফোন রেখে পালিয়ে যান। পরে পুলিশ গিয়ে মোবাইল ফোনটি জব্দ করে । এ ঘটনায় বাংলাদেশ মহিলা সমিতি (বাওয়া) স্কুল অ্যান্ড কলেজের ওই দুই পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে প্রশাসন।এ সময় দুই শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। পরে বুধবার ওই দুই শিক্ষার্থী ও তাদের বাবাকে আসামি করে নগরীর খুলশী থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় বুধবার দুপুরে আটক চট্টগ্রাম আইডিয়াল স্কুলের নয় শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাদেরও আদালতে পাঠায় পুলিশ।

পরে বুধবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) আদালতে শিক্ষার্থীদের পক্ষে জামিন আবেদন করলে চট্টগ্রাম মহানগর শিশু আদালতের বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌসের আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেন। বর্তমানে তারা জামিনে।

অন্যদিকে একই দিন মঙ্গলবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকায় পরীক্ষা শুরুর আগে পরীক্ষা কেন্দ্রের কাছে একটি মসজিদের সামনে বসে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করার সময় সাত শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা সবাই ওই উপজেলার হেঁয়াকো উচ্চবিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী। তারা ফটিকছড়ি বাগান বাজার উচ্চবিদ্যালয়, গজারিয়া জেবুন্নেসা পাড়া উচ্চবিদ্যালয় ও চিকনছড়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

ওইদিন ফটিকছড়ি উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল হাসনাত মো. শহীদুল হক  জানিয়েছিলেন, ‘সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে কেন্দ্রের কাছাকাছি একটি মসজিদের সামনে বসে দশজন পরীক্ষার্থী উত্তর খোঁজাখুঁজি করছিল। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় সাদা পোশাকে থাকা পুলিশ সদস্যরা খোঁজ নিয়ে দেখেন তারা মোবাইল ফোনে পাওয়া প্রশ্নপত্র সমাধান করছে। পরে পুলিশ সদস্যরা তাদের ধরে কেন্দ্র সচিবের কাছে নিয়ে যান। তাদের কাছে থাকা প্রশ্নপত্রের সঙ্গে প্রদত্ত প্রশ্নপত্রের মিল পাওয়া যায়। পরীক্ষা শেষে তাদের আটক করে পুলিশ।’