লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বিএনপির দুর্গ দখলে মরিয়া আ. লীগ

10-pic2লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ-১ আসন বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও তা দখলে সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। এজন্য উপজেলায় ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কমিটির সঙ্গে যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবকলীগের ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিগুলো নতুন করে সাজিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
অপরদিকে সম্প্রতি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম ভিপি তিন মাস আগে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন ইউনিয়নের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো নতুন করে সাজিয়ে উপজেলা ও পৌর ছাত্রদলের কমিটি গঠন করেছেন। এতে রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপি ধীরে ধীরে চাঙা হচ্ছে । তবে এবার বিএনপির দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে চমক আসতে পারে বলে দলীয় একটি সূত্র থেকে জানা গেছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে লক্ষ্মীপুর-১ রামগঞ্জ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা জোর প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচনি এলাকায় চলছে গণসংযোগ, শুভেচ্ছা বিনিময়, গ্রুপিং ও লবিং। অপরদিকে ভোটারদের মধ্যেও চলছে নানা আলোচনা। কে কোন দলের মনোনয়ন পাচ্ছে, কে হলে ভালো হয়, তা নিয়েও চলছে নানা বিশ্লেষণ।
লক্ষ্মীপুর-১ রামগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল তরীকত ফেডারেশন মনোনীত লায়ন এম এ আউয়াল বর্তমান সংসদ সদস্য। আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য যারা তৎপর তারা হলেন, ঢাকার আনোয়ার খাঁন মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও রামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন খাঁন, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শিল্পপতি সফিকুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. সফিক মাহমুদ পিন্টু, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক মমিন পাটওয়ারী, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান ও আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব আলম ।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আকম রুহুল আমিন বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন খান গত তিন বছর ধরে সাধারণ মানুষ ও আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদেরকে সঙ্গে নিয়ে গণসংযোগ করেছেন। তিনি এলাকার সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুদানসহ নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি নির্বাচনি এলাকার শিক্ষক, ঈমাম ও গ্রাম পুলিশসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে গরীব মানুষের জন্য ১০ কেজি করে ১২ হাজার পরিবারের মধ্যে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করেন। ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ৩৫ হাজার ইফতার প্যাকেট বিতরণ করেছেন তিনি। এছাড়া ৭০ হাজার শাড়ি লুঙ্গি বিতরণ করেছেন এই ঈদে। স্কুল ও কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও তিনি অনুদান করেছেন।
আনোয়ার খাঁন মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং রামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন খাঁন বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে এখানে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হতে পারেনি। নেত্রীর নির্দেশ পেয়ে রামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম শক্তিশালী করেছি। ’
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও আওয়ামী লীগের সহ সম্পাদক এম এ মোমিন পাটওয়ারী ছাত্রজীবন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ২০০১ সালে চার দলীয় জোটের সময় তিনি কয়েকবার জেল খেটেছেন, ছিলেন রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে। গত ৫ বছর ধরে তিনি রামগঞ্জের প্রতিটি ইউনিয়নে পথসভা উঠোন বৈঠক কর্মী সভা করেছেন।
আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সম্পাদক এম এ মোমিন পাটওয়ারী বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন-২০২১ ও ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নে তারুণ্যের জয় হবে। তরুণ নেতৃত্ব ছাড়া এই ভিশন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আমি এলাকায় কাজ করে যাচ্ছি। আমাকে নেত্রী মনোনয়ন দিলে রামগঞ্জের জনগণ আমাকে বিজয়ী করবে বলে বিশ্বাস করি।’
রামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. শফিক মাহমুদ পিন্টু বলেন, ‘আমি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একজন মাঠকর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। রামগঞ্জবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করবে। নেত্রী যদি মনে করেন আমাকে মনোনয়ন দেবেন তাহলে ইনশাআল্লাহ এ আসনটি আমি শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে পারবো।’
লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মোহাম্মাদ শাহাজাহান বলেন, ‘রামগঞ্জ আওয়ামী লীগকে আমি সুসংগঠিত করেছি। দলের প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেছি। গতবার আমি আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছি। পরে দলের সভানেত্রীর অনুরোধে প্রত্যাহার করেছি। আশা করি নেত্রী এবার আমাকে মূল্যায়ন করে দলের নমিনেশন দেবেন।’
এদিকে বিএনপির এ ঘাঁটিতে দলীয় মনোনয়নের প্রত্যাশায় আছেন নবম জাতীয় সংসদে বিএনপি মনোনীত বিজয়ী এমপি নাজিম উদ্দিন আহমেদ। তিনি দুই বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া আছেন, ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের সাবেক কমিশনার হারুনুর রশিদ, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াছিন আলী, উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ ও শামসুল আলম।
সাবেক এমপি ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দলের দুর্দিনে কাজ করে দলের এমপি হয়েছি। নেতাকর্মীদের সঙ্গে মামলা ও হামলা মোকাবিলা করেছি। দলের জন্য কাজ করছি। আমি আশাবাদী দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আমাকে মনোনয়ন দিলে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে জয়লাভ করবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে রামগঞ্জ বিএনপি আওয়ামী লীগের নির্যাতন দমন নীতির পরও অনেক শক্তিশালী। বর্তমানে আমি ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম ভিপি সাংগঠনিকভাবে কাজ করছি। আগামী নির্বাচনে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে লক্ষ্মীপুর -১ আসন থেকে বিএনপি জয় লাভ করবে।’
ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের সাবেক কমিশনার হারুনুর রশিদ সার্বিকভাবে বেশ জনপ্রিয়। এলাকায় তার সুনাম রয়েছে, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও তার আসা যাওয়া রয়েছে। এছাড়া দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোসহ দলের শৃঙ্খলার জন্য নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াছিন আলী এলাকায় নম্র-ভদ্র হিসেবে ইমেজ রয়েছে। তিনিও বিএনপির মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদী।
এছাড়া ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক কমিশনার হারুনুর রশিদ বলেন, ‘সরকারবিরোধী আন্দোলনে দলের নিবেদিত কর্মী হিসেবে কাজ করেছি এবং নিজ এলাকা রামগঞ্জের জনগণের সঙ্গে সবসময় আছি, থাকবো। আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি এলাকার উন্নয়ন ও জনসেবায় আরও বেশি সুযোগ পাবো।’
এছাড়া এখানে মনোনয়ন প্রত্যাশায় কেন্দ্রীয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন ২০ দলীয় জোটের শরীক দল এলডিপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব সাহাদাত হোসেন সেলিম। তিনি বলেন, ‘আমার নিজ এলাকার মাটি ও মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে। জোটে ও এলাকায় আমার একটি ভালো অবস্থান আছে। আমি এক সময় এলাকায় বিএনপির সংগঠন করতাম। জোটগতভাবে নির্বাচন হলে আমার মনোনয়ন নিশ্চিত ইনশাআল্লাহ।’
এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে মহাজোটের তরীকত ফেডারেশন থেকে বর্তমান এমপি লায়ন এম এ আউয়াল এমপি ও ২০ দলীয় জোট থেকে এলডিপি’র যুগ্ন-মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম মনোনয়ন প্রত্যাশী। দুইজনই এলাকায় গনবিচ্ছিন্ন বলে জানান জোটের অন্যান্য নেতারা। তারা এলাকায় জান না বলে তাদের অভিযোগ।