সংরক্ষণের নামে স্বকীয়তা হারাচ্ছে সুলতানি আমলের সেই মসজিদটি

চাঁদপুরে সুলতানি আমলের মসজিদচাঁদপুরে সদর উপজেলার রামপুর ইউনিয়নে জঙ্গলের ভেতর থাকা সুলতানি আমলের সেই মসজিদের সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে গত ডিসেম্বর। মসজিদের বাইরের দেয়ালের প্রায় ৪০ ভাগ ইট হাতুড়ি, কুড়াল ও অন্যান্য যন্ত্রণাংশ দিয়ে কেটে সেখানে লাগানো হয়েছে নতুন ইট। সংরক্ষণের নামে এক গম্বুজের মসজিদটি এখন মূল চেহারাই হারাতে বসেছে। কাজটির দেখভাল করছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের একটি টিম। শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) কাজ পরিদর্শনে এসে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) হতবাক হয়ে যান। চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে যতটুকু কাজ হয়েছে তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন।

মসজিদের প্রাচীন ইট ফেলে দিয়ে মূল অবয়বে লাগানো হয়েছে নতুন ইট

ডিজি ও অতিরিক্ত সচিব হান্নান মিয়া বলেন, ‘যারা এ ভুল এবং লেপছেপ দেওয়ার কাজ করলেন তাদের সবাইকে জবাব দিতে হবে। যা হয়েছে তা অনভিজ্ঞতা, উদাসীনতা ও অবিবেচকের কাজ। জেনেশুনে সরকারি টাকা জলে ফেলা হচ্ছে। তার চেয়ে কষ্টের বিষয় হলো প্রাচীন নিদর্শনের জাপরি ইটগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমরা যদি সময়মতো না আসতাম, তাহলে বোধ হয় মূল মসজিদই পেতাম না।’

মসজিদের প্রাচীন ইট ফেলে দিয়ে মূল অবয়বে লাগানো হয়েছে নতুন ইটকাজের এই অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নিজের চোখে এসব দেখে এ ধরনের  কাজ করতে বলতে পারি না। মসজিদের অবয়ব যাদের ভুলে নষ্ট হয়েছে তারা সেটা ঠিক করে দেবে নিজ খরচে। এটি মাত্র ৮ লাখ টাকার কাজ না। নতুন করে বসে আরও বরাদ্দের আবেদন করবো। বর্তমান টিমকে বাদ দিতে হবে।’

মসজিদটির একটি পুরনো ইটও যেন খোলা না হয় এবং যে ২ নম্বরি দেশীয় ইট দিয়ে মসজিদের গাইড ওয়াল তৈরি করা হয়েছে তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন ডিজি। তিনি বলেছেন, ‘নতুন দেয়াল পুরোটা ভেঙে ফেলতে হবে। নতুন করে কাজ করতে হলে আমায় বলে করতে হবে। আমিই প্রয়োজনে এ কাজের প্রধান তদারক হিসেবে থাকবো।’

মসজিদের প্রাচীন ইট ফেলে দিয়ে মূল অবয়বে লাগানো হয়েছে নতুন ইটকাজ পরিদর্শনে আসা প্রকৌশলী ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘পুরনো কোনও ইটই খোলার কথা না। যেটি একটু খারাপ সেটি ফেলে দিয়ে ওই রকম সাইজের স্পেশাল ইট লাগাতে হবে।’

স্থানীয় আবু বকর তালুকদারের বাড়ির পাশেই মসজিদটি।  তিনি বলেন, ‘দিন কয়েক আগে বিকট শব্দ শুনে সেখানে গিয়ে দেখি কিছু লোক মসজিদের দেয়াল থেকে পুরনো ইটগুলো ফেলে দিচ্ছে। আমি তাদের ইট ভাঙতে নিষেধ করি। কিন্তু আমার কথা তো শোনেনি বরং সেখানে থেকে আমাকে তাড়িয়ে দেয়।’

চাঁদপুরে সুলতানি আমলের মসজিদ

স্থানীয় চেয়ারম্যান আল মামুন ডিজিকে বলেন, কাজটি কবে শুরু করা হয়েছে তা তাকে জানানো হয়নি। অথচ তার কার্যালয় থেকে মসজিদের দূরত্ব মাত্র ১০০ গজ।

মসজিদের প্রাচীন ইট ভেঙে ফেলা হয়েছে

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের শেষের দিকে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি একটি বই পড়ে সুলতানি আমলের মসজিদটির কথা জানতে পারেন। বিষয়টি এলাকার চেয়ারম্যানকে খোঁজ নিতে বলেন। চেয়ারম্যান খোঁজ নিতে গেলে স্থানীয় আজিজুর রহমান জানান, শেকড়ে মোড়ানো মসজিদটি তিনি দেখেছেন। ঘন ঝোপঝাড়ের কারণে মসজিদটি দৃশ্যমান করতে পারেননি। সেসময় চেয়ারম্যান শ্রমিক লাগিয়ে মসজিদটি উদ্ধার করেন। পরে  প্রত্নতাত্ত্বিকরা মসজিদটি সুলতানি আমলের বলে শনাক্ত করেন। এরপর  দীপু মনি মসজিদটি সংরক্ষণ ও ওই স্থানটিকে পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। গত বছরই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এটিকে প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ হিসেবে গেজেটভুক্ত করে সংরক্ষণের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়।