চট্টগ্রামে অবৈধভাবে চলছে ১২ হাজার সিএনজি অটোরিকশা

চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রায় ২৫ হাজার সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে অনুমোদন আছে ১৩ হাজারের। বাকিগুলো অবৈধভাবে চলছে। এর মধ্যে চার হাজারের অনুমোদন চাওয়া হলেও গত ৯ বছরেও মেলেনি।

২০০১ সালের পর থেকে সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হয়নি। তবে অনুমোদন না মিললেও নগরীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার অবৈধ অটোরিকশা। এতে একদিকে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে অন্যদিকে ভেঙে পড়েছে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ও সড়ক নিরাপত্তা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম অটোরিকশা-অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. হারুনুর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরীতে অনুমোদিত সিএনজি অটোরিকশা আছে ১৩ হাজার। সিএনজি অটোরিকশা চলছে প্রায় ২৫ হাজারের মতো। চালক আছেন ৩৫ হাজারের বেশি। এ কারণে একটি সিএনজি দুই শিফটে ভাড়ায় চালান তারা। দৈনিক ভাড়া ৯০০ নেওয়ার কথা থাকলেও এক শিফটে নেওয়া হচ্ছে সাড়ে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা। চাহিদা থাকায় মালিকরা বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে আমরা প্রতিবাদ করেছি। কোনও কাজ হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‌‘২০১৩ সালের ১৩ এপ্রিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে মহানগরীতে চার হাজার অটোরিকশার অনুমোদন দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। অথচ গত ৯ বছরেও এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। ওই সময়ে খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করা হয়েছিল। গাড়িগুলো নিবন্ধন দেওয়ার জন্য আমরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি। উচ্চ আদালত ২০১৮ সালে অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেন। এরপরও নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি। এখন পুরাতন চট্টগ্রাম-মেট্রো সিএনজি অটোরিকশার নম্বর বিক্রি হচ্ছে ২০-২১ লাখ টাকা। চাহিদা বেশি থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ জেলা শহরে সিএনজি অটোরিকশা চার-পাঁচ লাখের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।’

২০০১ সালের পর থেকে সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হয়নি

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্র জানায়, ২০০১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হয়। এসব গাড়ির মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয় ১৫ বছর। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর সেগুলো ভেঙে নতুন করে তৈরি করা হয়।

অটোরিকশা-অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা জানিয়েছেন, মহানগরীতে ২০০১ সালের পর গত ২১ বছরে সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হয়নি। এরই মধ্যে মহানগরীর জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। গাড়ির চাহিদাও বেড়েছে। বেড়েছে চালকের সংখ্যা। ফলে অটোরিকশাও বেড়েছে। ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ সড়ক বিভাগের সম্মেলন কক্ষে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিআরটিএ’র তৎকালীন চেয়ারম্যান আ ল ম আবদুর রহমান নিবন্ধিত ১৩ হাজারের বাইরে আরও পাঁচ হাজার অটোরিকশা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। পরে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সভায় চার হাজার বরাদ্দ দিয়ে নিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা ১৭ হাজারে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়। বরাদ্দ নীতিমালা তৈরির জন্য বিআরটিএ চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওই বছরের ৯ এপ্রিল ‘সিএনজি-পেট্রোলচালিত ৪-স্ট্রোক থ্রি-হুইলার সার্ভিস নীতিমালা-২০০৭’ সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন জারির জন্য অনুরোধ জানিয়ে সড়ক বিভাগের সচিবকে চিঠি দেন বিআরটিএ চেয়ারম্যান। একইসঙ্গে একটি খসড়া প্রজ্ঞাপনও সড়ক বিভাগের সচিবকে দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ ৯ বছরেও ওই বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেনি সড়ক বিভাগ। যে কারণে ঝুলে আছে চার হাজার অটোরিকশার অনুমোদন।

অনুমোদন না মিললেও নগরীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার অবৈধ অটোরিকশা

২০১৭ সালের ১৯ এপ্রিল সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, তৎকালীন সিএমপি কমিশনার মো. ইকবাল বাহার ও জেলা প্রশাসক মো. শামসুল আরেফিনের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সভায় নতুন চার হাজার অটোরিকশা রেজিস্ট্রেশনের অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। গত পাঁচ বছরেও সে সুপারিশও আমলে নেয়নি বিআরটিএ।

সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, বৈধ ১৩ হাজারের পাশাপাশি অবৈধভাবে চলছে দ্বিগুণ অটোরিকশা। নগরীর অলিগলিতে সিএনজিগুলো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সেগুলো। নগরজুড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্টেশন। যেগুলোর লাইন নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা।

নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকায় দেখা গেছে, নম্বরবিহীন ১৫-২০টি অটোরিকশা দাঁড়িয়ে আছে। বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও মূল সড়কে যাত্রী পরিবহন করছে সেগুলো। এছাড়া নগরীর বাকলিয়া, আকবরশাহ, পতেঙ্গা, চান্দগাঁও, পাহাড়তলী, ডবলমুরিং, কোতোয়ালি, ইপিজেড ও বন্দর থানা এলাকার অলিগলিতেও অবৈধ অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।

মহানগর অটোরিকশা-অটোটেম্পো মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক টিটু চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরীতে ১০ হাজারের বেশি অটোরিকশা অবৈধভাবে চলছে। অথচ এগুলোর নগরীতে চলাচলের অনুমোদন নেই। এমনকি অনেক গাড়ির নম্বর পর্যন্ত নেই। এরপরও প্রশাসনের চোখের সামনে কীভাবে এগুলো চলছে তা আমার জানা নেই। এসব অটোরিকশা বন্ধের জন্য একাধিকবার প্রশাসনকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানিয়েছি। কোনও কাজ হয়নি। নগরীর অলিগলিতে অবৈধ অটোরিকশার লাইন। এসব গাড়ি লোকাল এবং রিজার্ভে যাত্রী টানছে।’

তিনি বলেন, ‘গাড়ির চাহিদা আছে। যে চার হাজারের অনুমোদন ঝুলে আছে সেগুলোর অনুমোদন দেওয়া হোক। এর মধ্য দিয়ে সরকার প্রতি বছর অনেক টাকা রাজস্ব পাবে। এখন অবৈধভাবে নগরীতে চলাচলকারী ১০-১২ হাজার অটোরিকশার রাজস্ব পায় না সরকার।’

চট্টগ্রাম-মেট্রো সিএনজি অটোরিকশার নম্বর বিক্রি হচ্ছে ২০-২১ লাখ টাকা

অটোরিকশা-অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, ‘ঝুলে থাকা অটোরিকশার অনুমোদন দেওয়ার জন্য চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। আমরা এই দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছি। আশা করছি, চার হাজার অটোরিকশার অনুমোদন পাওয়া যাবে।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিআরটিএ’র বিভাগীয় পরিচালক শফিকুজ্জামান ভূঞা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ২০০১ সালে ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশার অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর গত ২১ বছরে অটোরিকশার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আগের সিএনজিগুলো নতুন করে তৈরি করা হয়। চট্টগ্রাম-মেট্রো এলাকায় চার হাজার অটোরিকশার অনুমোদনের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কোনও প্রজ্ঞাপন হাতে পাইনি। পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক-উত্তর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার জয়নাল আবেদীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কখনও কখনও ট্রাফিক এবং থানা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনুমোদনহীন অটোরিকশা নগরীতে চলাচলের চেষ্টা করে। তবে ট্রাফিক এবং থানা পুলিশের নজরে এলে এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। চার হাজার নতুন অটোরিকশার অনুমোদনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি আমার জানা নেই। কত হাজার অবৈধ অটোরিকশা নগরীতে চলছে তার সঠিক তথ্য আমার কাছে নেই।’